স্মার্ট বিন, আলাদা সংগ্রহ ও পুনর্ব্যবহারের মাধ্যমে ২০২৩ সালে দক্ষিণ কোরিয়ায় খাদ্য বর্জ্য পুনর্ব্যবহারের হার পৌঁছেছে প্রায় ৯৭ শতাংশে। দেশটির এই মডেল অনুসরণ করে খাদ্য বর্জ্য ব্যবস্থাপনায় নতুন উদ্যোগ নিয়েছে যুক্তরাষ্ট্রের নিউইয়র্ক সিটি।
খাদ্য বর্জ্য ব্যবস্থাপনায় দক্ষিণ কোরিয়ার সাফল্য এখন বিশ্বজুড়ে আলোচনার বিষয়। দেশটিতে গৃহস্থালির খাদ্য বর্জ্য ল্যান্ডফিলে যাওয়ার হার প্রায় শূন্যের কাছাকাছি নামিয়ে আনা হয়েছে। এর পেছনে রয়েছে খাদ্য বর্জ্য আলাদাভাবে সংগ্রহ, স্মার্ট প্রযুক্তির ব্যবহার এবং বর্জ্য থেকে জ্বালানি ও অন্যান্য সম্পদ উৎপাদনের সমন্বিত ব্যবস্থা।
এবার দক্ষিণ কোরিয়ার এই মডেল অনুসরণ করে খাদ্য বর্জ্য আলাদাভাবে সংগ্রহ ও পুনর্ব্যবহারের উদ্যোগ নিয়েছে যুক্তরাষ্ট্রের নিউইয়র্ক সিটি।
স্মার্ট বিনে বর্জ্য ফেললেই হিসাব
বিবিসির প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, দক্ষিণ কোরিয়ার রাজধানী সিউলের ইয়েওইদো এলাকায় বাসিন্দা সেউংহোয়ান হং প্রতি সপ্তাহের সবজির খোসা, পড়ে থাকা ভাত ও ফলের খোসা নিয়ে যান আবাসিক ভবনের নির্দিষ্ট খাদ্য বর্জ্যের স্মার্ট বিনে।
বিনটিতে কার্ড স্ক্যান করলেই খুলে যায় ঢাকনা। এরপর বর্জ্য ফেলার পর এর ওজন পর্দায় দেখা যায় এবং সেই অনুযায়ী বাসিন্দার হিসাবে নির্দিষ্ট ফি যোগ হয়। পুরো প্রক্রিয়াটি শেষ করতে সময় লাগে এক মিনিটেরও কম।
এই পদ্ধতিতে কে কত পরিমাণ খাদ্য বর্জ্য ফেলছেন, তার হিসাব রাখা সম্ভব হয়। একই সঙ্গে বর্জ্য আলাদাভাবে সংগ্রহ করায় তা পুনর্ব্যবহারের প্রক্রিয়াও সহজ হয়।
২.৬ শতাংশ থেকে ৯৭ শতাংশ
১৯৯০-এর দশক থেকেই খাদ্য বর্জ্য ব্যবস্থাপনায় বড় ধরনের পরিবর্তন আনে দক্ষিণ কোরিয়া। ১৯৯৬ সালে দেশটিতে খাদ্য বর্জ্য পুনর্ব্যবহারের হার ছিল মাত্র ২ দশমিক ৬ শতাংশ। ২০২৩ সালে তা বেড়ে প্রায় ৯৭ শতাংশে পৌঁছেছে।
এই পরিবর্তনের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ উপাদান হয়ে উঠেছে আরএফআইডি প্রযুক্তিনির্ভর স্মার্ট বিন। এসব বিনে খাদ্য বর্জ্যের পরিমাণ ও ওজন শনাক্ত করা হয় এবং সেই অনুযায়ী ফি নির্ধারণ করা যায়।
২০২৫ সালের সরকারি হিসাব অনুযায়ী, দক্ষিণ কোরিয়ায় প্রায় ১ লাখ ৫২ হাজার স্মার্ট বিন চালু রয়েছে। এগুলোর মাধ্যমে ৮৬ লাখের বেশি পরিবার খাদ্য বর্জ্য ব্যবস্থাপনা সেবার আওতায় রয়েছে।
বর্জ্য থেকে বিদ্যুৎ ও জ্বালানি
সংগৃহীত খাদ্য বর্জ্যের একটি বড় অংশ পাঠানো হয় বায়োএনার্জি কেন্দ্রে। সেখানে খাদ্য বর্জ্য প্রক্রিয়াজাত করে বিদ্যুৎ ও জ্বালানি উৎপাদন করা হয়।
মধ্যাঞ্চলের দেজন বায়োএনার্জি সেন্টার গ্রহণ করা খাদ্য বর্জ্যের প্রায় ৭০ থেকে ৭৫ শতাংশ পর্যন্ত পুনর্ব্যবহার করে। কেন্দ্রটি যে বিদ্যুৎ উৎপাদন করে, তা প্রায় ৬ হাজার পরিবারের দৈনন্দিন চাহিদা পূরণ করতে পারে।
অর্থাৎ খাদ্য বর্জ্যকে শুধু ফেলে দেওয়ার বস্তু হিসেবে না দেখে তা থেকে শক্তি উৎপাদনের উপকরণ হিসেবেও ব্যবহার করছে দক্ষিণ কোরিয়া।
নিউইয়র্কেও বাধ্যতামূলক আলাদা সংগ্রহ
দক্ষিণ কোরিয়ার এই মডেল থেকে অনুপ্রাণিত হয়ে নিউইয়র্ক সিটিও খাদ্য বর্জ্য ব্যবস্থাপনায় বড় কর্মসূচি নিয়েছে। ২০২৪ সালের অক্টোবর থেকে শহরের বাসিন্দাদের খাদ্য বর্জ্য আলাদাভাবে রাখার নিয়ম বাধ্যতামূলক করা হয়েছে।
এই কর্মসূচির আওতায় রয়েছে প্রায় ৩৪ লাখ পরিবার। এটিকে যুক্তরাষ্ট্রের সবচেয়ে বড় অর্গানিক বর্জ্য পুনরুদ্ধার উদ্যোগ হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে।
তবে নিউইয়র্কে বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে বাসিন্দাদের অংশগ্রহণ নিশ্চিত করা। নিয়ম না মানায় ইতোমধ্যে ৬৩ হাজারের বেশি নোটিশ দেওয়া হয়েছে। পাশাপাশি শহরের বিভিন্ন এলাকায় ৪০০টির বেশি স্মার্ট কম্পোস্টিং বিন স্থাপন করা হয়েছে।
এখনো অনেক পিছিয়ে নিউইয়র্ক
২০২৫ সালে নিউইয়র্কের আবাসিক এলাকা থেকে প্রায় ১ লাখ ৪০ হাজার টন অর্গানিক বর্জ্য ব্যবস্থাপনার আওতায় আনা হয়েছে। তবে শহরে বছরে যে পরিমাণ আবাসিক খাদ্য বর্জ্য উৎপন্ন হয়, তার তুলনায় এই পরিমাণ মাত্র ৯ শতাংশ।
অর্থাৎ দক্ষিণ কোরিয়ার প্রায় ৯৭ শতাংশ পুনর্ব্যবহারের পর্যায়ে পৌঁছাতে নিউইয়র্ককে এখনো দীর্ঘ পথ পাড়ি দিতে হবে।
দক্ষিণ কোরিয়ার অভিজ্ঞতা দেখাচ্ছে, খাদ্য বর্জ্য ব্যবস্থাপনায় শুধু বর্জ্য সংগ্রহ করাই যথেষ্ট নয়। বর্জ্য আলাদা করা, পরিমাণ অনুযায়ী ফি নির্ধারণ, প্রযুক্তির ব্যবহার এবং সংগৃহীত বর্জ্য থেকে পুনরায় সম্পদ ও জ্বালানি তৈরির সমন্বিত ব্যবস্থাই বড় পরিবর্তন আনতে পারে। নিউইয়র্কের নতুন উদ্যোগ সেই মডেলকে ভিন্ন বাস্তবতায় প্রয়োগের একটি বড় উদাহরণ হয়ে উঠছে।
সূত্র: বিবিসি






