মধ্যপ্রদেশের ডিন্ডোরি ও অমরকণ্টকের শালবনে শাল বোরার পোকার আক্রমণ ভয়াবহ আকার ধারণ করেছে। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে দুই অঞ্চল মিলিয়ে ১ লাখ ৫৬ হাজার ৩১৯টি শালগাছ কাটার অনুমতি দেওয়া হয়েছে। এর মধ্যে ডিন্ডোরিতে ১ লাখ ৪৬ হাজার ৭৮৪টি এবং অমরকণ্টকে ৯ হাজার ৫৩৫টি গাছ রয়েছে।
ডিন্ডোরি বন দফতর চলতি বছরের ২২ জুলাই কেন্দ্রীয় সরকারের কাছে ১ লাখ ৪৭ হাজার ৩৮০টি আক্রান্ত শালগাছ কাটার অনুমতি চেয়েছিল। সেপ্টেম্বরে অনুমোদন মেলে। ডিন্ডোরিতে দ্রুত গাছ কাটার কাজ শুরু হওয়ার কথা রয়েছে। অমরকণ্টকে অক্টোবর থেকে কাজ শুরু হতে পারে।
গাছের ভিতরে ঢুকে ক্ষতি করছে পোকা
শাল বোরার পোকা গাছের ভিতরে ঢুকে কাঠের অংশে সুড়ঙ্গ তৈরি করে। ফলে বাইরে থেকে গাছটি স্বাভাবিক মনে হলেও ধীরে ধীরে ভিতরের কাঠামো দুর্বল হয়ে পড়ে। আক্রান্ত গাছের গোড়ার কাছে অনেক সময় করাতের গুঁড়োর মতো পদার্থ জমে থাকতে দেখা যায়।
ডিন্ডোরির করঞ্জিয়া বনাঞ্চল এই আক্রমণে সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। বন দফতরের তথ্য অনুযায়ী, জেলার আক্রান্ত শালগাছের প্রায় ৯০ শতাংশ এই এলাকার মধ্যে রয়েছে। ২০২৫ সালের শেষদিকে বিজ্ঞানীদের পর্যবেক্ষণেও কিছু এলাকায় ৩০ থেকে ৩৫ শতাংশ পর্যন্ত শালগাছ আক্রান্ত হওয়ার তথ্য উঠে এসেছিল।
পোকা ধরলেও মিলছে টাকা
শুধু আক্রান্ত গাছ কেটে ফেলার উদ্যোগ নয়, পোকা নিয়ন্ত্রণেও স্থানীয় মানুষকে যুক্ত করেছে বন দফতর। শাল বোরার একটি পোকা ধরে জমা দিলে মিলছে ২ টাকা।
২১ জুলাই পর্যন্ত ডিন্ডোরিতে ১৪ লাখ ১৭ হাজার ৯১৫টি পোকা সংগ্রহ করা হয়েছিল। সেপ্টেম্বরের মধ্যে সেই সংখ্যা বেড়ে দাঁড়িয়েছে ১৯ লাখ ২৫ হাজার ১১৮-তে। অর্থাৎ কয়েক মাসে আরও ৫ লাখের বেশি পোকা সংগ্রহ করা হয়েছে। প্রতি পোকা ২ টাকা হিসেবে এ পর্যন্ত খরচ হয়েছে প্রায় ৩৮ লাখ ৫০ হাজার টাকা।
এই কাজে স্থানীয় আদিবাসী বাসিন্দারাও অংশ নিচ্ছেন। অনেকে সংগ্রহ করা পোকা ১০০টি করে গেঁথে মালার মতো করে বন দফতরের সংগ্রহকেন্দ্রে জমা দিচ্ছেন। এতে পোকার সংখ্যা কমানোর পাশাপাশি স্থানীয় মানুষের সাময়িক আয়ের সুযোগও তৈরি হয়েছে।
ব্যবহার হচ্ছে ‘ট্র্যাপ ট্রি’ পদ্ধতি
পোকা নিয়ন্ত্রণে ‘ট্র্যাপ ট্রি’ পদ্ধতিও ব্যবহার করা হচ্ছে। এ পদ্ধতিতে নির্দিষ্ট শালগাছ কেটে এমনভাবে রাখা হয়, যাতে পোকা ওই গাছের দিকে আকৃষ্ট হয়। পরে সেখানে জমা হওয়া পোকা সংগ্রহ করা হয়।
ডিন্ডোরির পূর্ব করঞ্জিয়া, পশ্চিম করঞ্জিয়া ও দক্ষিণ সমনাপুর এলাকায় এ পদ্ধতি প্রয়োগ করা হয়েছে।
বহু পুরোনো সমস্যা
শাল বোরার পোকার আক্রমণ ডিন্ডোরিতে নতুন নয়। বন গবেষণার নথিতে মধ্যপ্রদেশে এই পোকার আক্রমণের উল্লেখ ১৯০৫ সাল থেকেই পাওয়া যায়। ১৯৯৭ থেকে ২০০০ সালের মধ্যে মধ্যপ্রদেশ ও ছত্তীসগঢ় মিলিয়ে প্রায় ১০ লাখ শালগাছ এ পোকার আক্রমণে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছিল বলে নথিতে উল্লেখ রয়েছে।
বন দফতরের বক্তব্য অনুযায়ী, শাল বোরারের আক্রমণের একটি দীর্ঘ প্রাকৃতিক চক্র রয়েছে, যা প্রায় ৩০ বছর পরপর তীব্র হতে পারে। বর্তমান পরিস্থিতিকেও সেই চক্রের সঙ্গে যুক্ত করা হচ্ছে।
অতিরিক্ত বৃষ্টি-আর্দ্রতায় বেড়েছে শঙ্কা
চলতি বছর অতিরিক্ত বৃষ্টি ও আর্দ্রতার কারণে পরিস্থিতি আরও জটিল হয়েছে বলে সংশ্লিষ্টরা মনে করছেন। বর্ষার পরিবেশ পোকার জীবনচক্রের জন্য অনুকূল হওয়ায় আক্রমণ দ্রুত ছড়িয়ে পড়ার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে।
তাই আক্রান্ত গাছ কেটে সরানোর পাশাপাশি দীর্ঘমেয়াদি নজরদারি, দ্রুত আক্রান্ত গাছ শনাক্ত করা এবং বৈজ্ঞানিক উপায়ে পোকার বিস্তার নিয়ন্ত্রণের ওপর জোর দেওয়া হচ্ছে।
এ সমস্যা নিয়ে ১৭ সেপ্টেম্বর অমরকণ্টকে একটি কর্মশালাও অনুষ্ঠিত হয়েছে। সেখানে বনকর্তা, বিজ্ঞানী, স্থানীয় প্রতিনিধি ও অন্যান্য বিশেষজ্ঞ ভবিষ্যৎ নিয়ন্ত্রণ কৌশল নিয়ে আলোচনা করেন।
সূত্র: বন প্রহরী






