নিজের সম্মতি ছাড়া জন্ম দেওয়ার অভিযোগে জন্মদাতা মা-বাবার বিরুদ্ধে আদালতে মামলা করার পরিকল্পনা করেছেন ভারতের ২৭ বছর বয়সী এক তরুণ। ভারতীয় তরুণ রাফায়েল স্যামুয়েলের ভাবনাটি ব্যক্তিগত জীবনের প্রশ্ন হলেও এর সঙ্গে পৃথিবীর জীববৈচিত্র্য ও পরিবেশের একটি বড় বিতর্কও জড়িয়ে আছে।
রাফায়েলের যুক্তি, মানুষের অস্তিত্বই যদি পৃথিবীতে না থাকত, তাহলে এই গ্রহ হয়তো আরও সুন্দর ও প্রাণবৈচিত্র্যে সমৃদ্ধ থাকত। তার এই চিন্তা মূলত ‘অ্যান্টি-ন্যাটালিজম’ বা ‘জন্মবিরোধিতা’ দর্শনের সঙ্গে সম্পর্কিত। এই দর্শনের কিছু অনুসারী মনে করেন, নতুন মানুষের জন্ম বন্ধ হলে দীর্ঘমেয়াদে মানুষের কারণে সৃষ্ট পরিবেশগত চাপও কমবে।
মানুষের বিস্তার, প্রকৃতির সংকোচন
পৃথিবীর জীববৈচিত্র্যের ওপর মানুষের প্রভাব নিয়ে দীর্ঘদিন ধরেই আলোচনা রয়েছে। জনসংখ্যা বৃদ্ধি, নগরায়ণ, কৃষিজমির সম্প্রসারণ, বন উজাড়, অতিরিক্ত সম্পদ আহরণ, দূষণ এবং জলবায়ু পরিবর্তনের মতো কর্মকাণ্ড বহু প্রাণী ও উদ্ভিদের আবাসস্থল সংকুচিত করেছে।
একসময় যেখানে বিস্তীর্ণ বন, জলাভূমি বা তৃণভূমি ছিল, সেখানে এখন গড়ে উঠেছে শহর, সড়ক, শিল্পাঞ্চল ও কৃষিজমি। ফলে অনেক প্রাণী তাদের স্বাভাবিক আবাস হারিয়েছে। খাদ্য ও পানির উৎস কমেছে, বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়েছে বিভিন্ন প্রাণীর আবাসস্থল।
এই জায়গা থেকেই রাফায়েলের প্রশ্নটি পরিবেশগত আলোচনায় নতুন মাত্রা পায়, মানুষের সংখ্যা যত বাড়বে, প্রকৃতির ওপর চাপও কি তত বাড়বে?
তবে শুধু মানুষের সংখ্যা কমলেই কি জীববৈচিত্র্য ফিরবে?
বিষয়টি এত সরল নয়।
মানুষ পৃথিবীর জীববৈচিত্র্যের ওপর বড় ধরনের চাপ সৃষ্টি করলেও একই মানুষ আবার বহু প্রজাতি ও বাস্তুতন্ত্র রক্ষার উদ্যোগও নিয়েছে। বন সংরক্ষণ, বন্যপ্রাণীর অভয়ারণ্য, জলাভূমি রক্ষা, বিপন্ন প্রজাতির প্রজনন কর্মসূচি এবং পুনঃবনায়নের মতো কার্যক্রমের মাধ্যমে মানুষ অনেক ক্ষেত্রেই ক্ষতিগ্রস্ত প্রকৃতিকে পুনরুদ্ধারের চেষ্টা করছে।
তাই জীববৈচিত্র্যের সংকটকে শুধু মানুষের জন্মের সঙ্গে যুক্ত করলে সমস্যাটির অন্যান্য কারণ আড়ালে থেকে যেতে পারে। মানুষ কীভাবে জমি ব্যবহার করছে, কতটা সম্পদ ব্যবহার করছে, কী ধরনের জ্বালানি ব্যবহার করছে এবং প্রকৃতির সঙ্গে কী ধরনের সম্পর্ক তৈরি করছে, এসব বিষয়ও অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
কম মানুষ নয়, প্রকৃতির সঙ্গে ভিন্ন সম্পর্ক?
এই দৃষ্টিকোণ থেকে রাফায়েলের প্রশ্নকে আরও বিস্তৃতভাবে দেখা যায়।
প্রশ্নটি শুধু ‘মানুষ জন্মাবে কি না’, এমন নয়। বরং মানুষ জন্মানোর পর সে পৃথিবীর সঙ্গে কেমন আচরণ করবে, সেটিও গুরুত্বপূর্ণ।
একজন মানুষ একই সঙ্গে বন ধ্বংসের কারণ হতে পারেন, আবার বন রক্ষার কর্মীও হতে পারেন। একটি শিল্পপ্রতিষ্ঠান নদী দূষিত করতে পারে, আবার কোনো বিজ্ঞানী সেই নদীর জীববৈচিত্র্য রক্ষার প্রযুক্তি উদ্ভাবন করতে পারেন।
অর্থাৎ মানুষের অস্তিত্ব এবং জীববৈচিত্র্যের ভবিষ্যৎ, এই দুটিকে সরাসরি পরস্পরের বিপরীত হিসেবে দেখার বদলে মানুষের জীবনযাপন ও পরিবেশগত আচরণকেও আলোচনায় আনতে হয়।
পৃথিবীর ভবিষ্যৎ নিয়ে বড় প্রশ্ন
রাফায়েল স্যামুয়েলের অবস্থান তাই শুধু ব্যক্তিগত বা পারিবারিক বিতর্কে সীমাবদ্ধ নয়। এটি মানুষের অস্তিত্ব, নৈতিকতা, জনসংখ্যা, প্রাকৃতিক সম্পদ এবং পৃথিবীর ভবিষ্যৎ নিয়ে একটি বড় দার্শনিক প্রশ্ন সামনে আনে।
মানুষ কি পৃথিবীর জন্য বোঝা, নাকি প্রকৃতিরই একটি অংশ? মানুষের সংখ্যা কমানোই কি জীববৈচিত্র্য রক্ষার পথ, নাকি মানুষের ভোগের ধরন ও প্রকৃতির প্রতি আচরণ পরিবর্তন করাই মূল বিষয়?
এর একক কোনো উত্তর নেই। তবে একটি বিষয় স্পষ্ট, পৃথিবীর জীববৈচিত্র্য রক্ষার প্রশ্নে মানুষের অস্তিত্বের পাশাপাশি মানুষ কীভাবে পৃথিবীতে বেঁচে থাকতে চায়, সেই প্রশ্নটিও সমান গুরুত্বপূর্ণ।






