রাজধানীর বনশ্রী এলাকায় পথকুকুরকে খাবার দিতে গিয়ে সুমাইয়া রহমান নামে এক তরুণী মারধর ও হেনস্তার শিকার হয়েছেন বলে অভিযোগ উঠেছে। তাঁর অভিযোগ, মঙ্গলবার রাতে বনশ্রীর এফ ব্লকের ৮/৩ নম্বর সড়কের লালমিয়া গলিতে কুকুরকে খাবার দেওয়ার সময় প্রথমে একটি দোকানের লোকজনের সঙ্গে তাঁর কথা-কাটাকাটি হয়। পরে আরও লোকজন জড়ো হয়ে তাঁকে মারধর করেন।
বুধবার সন্ধ্যায় বনশ্রীতে এই প্রতিবেদকের সঙ্গে আলাপের সময় সুমাইয়া তাঁর শরীরের বিভিন্ন স্থানে আঘাতের চিহ্ন দেখান। তাঁর চোখের নিচে ও মুখে আঘাতের দাগ দেখা যায়। আঘাতের কারণে হাতের কয়েকটি জায়গাও কালচে হয়ে আছে।
বেসরকারি প্রতিষ্ঠানে চাকরিজীবী সুমাইয়া বলেন, ‘কুকুরগুলো আমাকে অনেক পছন্দ করে। যখনই রাস্তা দিয়ে হেঁটে যাই, ওরা আমার পিছু নেয়। কারণ ওদের আমি নিয়মিত খাওয়াই। গতকালও ওই গলিতে খাওয়াতে গেলে স্থানীয় কিছু মানুষের সঙ্গে কথাকাটাকাটি হয়। একপর্যায়ে তাঁরা আমাকে কিল, ঘুষি, লাথি মারে।’
তিনি আরও বলেন, ‘তারা আমাকে বাজেভাবে আঘাত করেছে। সবচেয়ে বেশি মেরেছে পিঠের ওপর। প্রাণ বাঁচাতে কোনো রকমে আমি তখন ওই এলাকা থেকে পালিয়ে আসি।’
কী ঘটেছিল
সুমাইয়া রহমান জানান, অন্যদিনের মতো মঙ্গলবার রাত আনুমানিক ১০টার দিকে তিনি বনশ্রীর এফ ব্লকের ৮/৩ নম্বর সড়কের লালমিয়া গলিতে কয়েকটি পথকুকুরকে খাবার দিতে যান। গলির মাঝামাঝি একটি কাপড়ের দোকানের সামনে তিনি কুকুরগুলোকে খাবার দিচ্ছিলেন। এ সময় কয়েকটি কুকুর দোকানের সিঁড়িতে উঠে যায়।
সুমাইয়ার অভিযোগ, দোকানে থাকা ১০ থেকে ১২ বছর বয়সী এক কিশোর তাঁকে সরে যেতে বলেন। কিছুটা দেরি হওয়ায় দোকানের ভেতরে থাকা মালিকও তাঁর ওপর চড়াও হন।
সুমাইয়া বলেন, ‘তখন আমি ওই কিশোরকে বলি, তুমি আমার সঙ্গে বেয়াদবি করছ কেন? আমি তো তোমার বয়সে বড়। এই কথা বলাইতেই ভেতর থেকে ২০ থেকে ২২ বছর বয়সী আরেক তরুণ এসে আমাকে প্রথমে মুখের ওপর ঘুষি মারে।’
তাঁর ভাষ্য, ঘুষি মারার পর ওই যুবক আশপাশের আরও অন্তত ৫০ থেকে ৬০ জন লোককে জড়ো করেন। পরে তাঁরা এসে তাঁকে মারধর ও গালমন্দ করেন। প্রায় আধা ঘণ্টা ধরে এভাবে তাঁকে হেনস্তা করা হয় বলে অভিযোগ করেন সুমাইয়া।
সঙ্গে ছিলেন আরেক কুকুরপ্রেমী
ঘটনার সময় সুমাইয়ার সঙ্গে ছিলেন আসিফ ইমতিয়াজ। তিনি পেশায় ক্ষুদ্র উদ্যোক্তা এবং বনশ্রী এলাকায় নিয়মিত পথকুকুরকে খাবার দেন।
আসিফ ইমতিয়াজ বলেন, ‘সুমাইয়া যখন কুকুরকে খাওয়াচ্ছিলেন, তখন কাপড়ের দোকানের কিশোর বয়সী একজন এসে প্রথমে সরতে বলে। তখন আমরা তাঁদের অনুরোধ করি যে, আমরা দুই মিনিটের মধ্যে চলে যাবো। কিন্তু তাঁরা কোনো কথা না শুনে তাৎক্ষণিকভাবে স্থান ত্যাগ করতে বলেন। আমরা তবু জোর করে কুকুরকে খাওয়াতে গেলে তাঁরা প্রথমে চড়াও হন। পরে সুমাইয়াকে মারধর করেন।’
তিনি জানান, সুমাইয়ার সঙ্গে বাকবিতণ্ডার সময় তিনি কাছেই পূর্বপরিচিত একজনের সহায়তা নিতে যান। তবে তাঁর কাছ থেকে সহায়তা না পেয়ে ফিরে এসে সুমাইয়াকে নিয়ে দ্রুত স্থান ত্যাগ করেন।
আসিফ বলেন, ‘লোকগুলো আমাকেও মারধর করতো। আমি তখন নিরাপত্তার স্বার্থে দ্রুত স্থান ত্যাগ করি।’
স্থানীয়দের বক্তব্য
বুধবার বিকেলে লালমিয়া গলিতে গিয়ে দেখা যায়, যে কাপড়ের দোকানের সামনে ঘটনাটি ঘটেছে, সেটি বন্ধ। আশপাশের অন্য দোকানও বন্ধ ছিল।
ঘটনার বিষয়ে জানতে চাইলে স্থানীয় বেশির ভাগ মানুষ কথা বলতে রাজি হননি। তবে স্থানীয় নূর হোসেন জানান, মঙ্গলবার রাত ১০টার দিকে একটি মেয়েকে মারধর করা হয়েছে।
নূর হোসেনের দাবি, কুকুরকে খাবার দিতে গিয়ে সুমাইয়া রহমান দোকান নোংরা করে ফেলছিলেন। তাঁকে বাধা দেওয়ায় তিনি দোকানের মালিককে খারাপ ভাষায় গালি দেন। তবে দোকানের মালিকের নাম বা পরিচয় সম্পর্কে কোনো তথ্য দিতে চাননি তিনি।
নাম প্রকাশ না করার শর্তে স্থানীয় আরেক ব্যক্তি দাবি করেন, সুমাইয়াকে প্রথম যে আঘাত করেছিলেন, তাঁর নাম শুভ। তিনি স্থানীয় প্রভাবশালী মাঈনুল ও হালিম নামে দুই ভাইয়ের সহযোগী। শুভ হালিমের শালা এবং কাপড়ের দোকানটি মূলত তিনিই পরিচালনা করেন বলে দাবি করেন ওই ব্যক্তি।
তাঁর ভাষ্য, শুভ আশপাশের আরও ৫০ থেকে ৬০ জনকে জড়ো করে অন্তত ৩০ মিনিট ধরে সুমাইয়াকে হেনস্তা, মারধর ও লাঞ্ছিত করেন।
চিকিৎসা নিয়েছেন সুমাইয়া, থানায় অভিযোগ
মারধরের পর বুধবার সকালে রাজধানীর মুগদা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে চিকিৎসা নেন সুমাইয়া রহমান। তাঁর ভাষ্য, চোয়ালে বেশি আঘাত লেগেছে। চিকিৎসক প্রাথমিক চিকিৎসা দেওয়ার পর এক্স-রে করতে দিয়েছেন। প্রতিবেদন পাওয়ার পর আঘাতের গভীরতা জানা যাবে বলে জানান তিনি।
এ ঘটনায় বুধবার রাজধানীর খিলগাঁও থানায় অভিযোগও করেন সুমাইয়া। অভিযোগের পর বিকেলে পুলিশের একটি দল লালমিয়া গলি পরিদর্শন করে।
পুলিশের দলের সঙ্গে থাকা সাব-ইন্সপেক্টর (এসআই) আজহারুল ইসলাম মুঠোফোনে প্রথম আলোকে বলেন, ‘আমরা ভোক্তভোগীকে সঙ্গে নিয়ে ওই এলাকা পরিদর্শন করেছি। কিন্তু কারা তাঁর ওপর হামলা করেছে, ভুক্তভোগী তাঁদের শনাক্ত করতে পারেনি।’
ঘটনা সম্পর্কে পুলিশ কী জানতে পেরেছে জানতে চাইলে আজহারুল ইসলাম বলেন, ‘ভুক্তভোগী মারধরের শিকার হয়েছেন। তবে কারা জড়িত সেটা এখনও বোঝা যাচ্ছে না। স্থানীয়রা কেউ ঘটনা স্বীকার করছে না। আমরা এখনো ঘটনা তদন্ত করছি। প্রকৃত ঘটনা বোঝার চেষ্টা করছি। আগামীকাল অভিযুক্ত ও ভুক্তভোগীদের নিয়ে আবার বসার কথা রয়েছে। সেখানে প্রকৃত ঘটনা উঠে আসতে পারে।’
সূত্র: প্রথম আলো






