অসুস্থ হলে নিজেদের চিকিৎসায় নানা ধরনের ঔষধি গাছ ব্যবহার করে আফ্রিকান হাতি। শুধু নিজেদের জন্য নয়, প্রয়োজন হলে শাবকদেরও নির্দিষ্ট উদ্ভিদের ঔষধি অংশ খাওয়ায় হাতিমায়েরা। কেনিয়ার মাউন্ট এলগন অঞ্চলে পরিচালিত এক গবেষণায় এমন তথ্য উঠে এসেছে।
গবেষণায় হাতিদের সঙ্গে কাজ করা স্থানীয় বন্যপ্রাণী পর্যবেক্ষক, প্রবীণ ব্যক্তি ও বাসিন্দাদের সাক্ষাৎকার নেওয়া হয়। তাদের দেওয়া তথ্য বিশ্লেষণ করে গবেষকেরা ৩৫ প্রজাতির উদ্ভিদের তালিকা পেয়েছেন, যার মধ্যে ২৫টির ঔষধি ব্যবহার স্থানীয়ভাবে পরিচিত।
সম্প্রতি সায়েন্টিফিক রিপোর্টস জার্নালে প্রকাশিত গবেষণাটি পরিচালনায় বিজ্ঞানীদের সঙ্গে কাজ করেছে সংরক্ষণবিষয়ক দাতব্য সংস্থা মাউন্ট এলগন ফাউন্ডেশন।
গবেষণার অন্যতম প্রধান গবেষক যুক্তরাষ্ট্রের ব্রাউন ইউনিভার্সিটির ড. এলোডি ফ্রেইম্যান বলেন, বনাঞ্চলের আবাসস্থল ধ্বংসের ফলে প্রাণী এমনকি মানুষও বেঁচে থাকার জন্য প্রয়োজনীয় সম্ভাব্য ঔষধি উপাদান থেকে বঞ্চিত হচ্ছে কি না, তা নিয়ে এই গবেষণা গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন তুলেছে।
শাবকদেরও খাওয়ায় ঔষধি উদ্ভিদ
গবেষণায় উঠে এসেছে, হাতিরা অসুস্থ বোধ করলে নির্দিষ্ট কিছু উদ্ভিদ বেছে নেয়। আবার হাতিমায়েরা শাবকদের অসুস্থতার ক্ষেত্রে উদ্ভিদের ঔষধি অংশ সংগ্রহ করে তাদের খাওয়ায়।

একজন বন্যপ্রাণী পর্যবেক্ষক গবেষকদের জানান, তিনি হাতিদের ‘অঙ্গুরউইট’ নামে পরিচিত একটি উদ্ভিদ শাবকদের ওষুধ হিসেবে দিতে দেখেছেন। পেটব্যথাসহ বিভিন্ন শারীরিক সমস্যার চিকিৎসায় স্থানীয়ভাবে উদ্ভিদটি ব্যবহার করা হয়।
ওই পর্যবেক্ষকের ভাষ্য অনুযায়ী, হাতিমায়েরা উদ্ভিদটির পাতা সরিয়ে শিকড়ের সঙ্গে চিবিয়ে মসৃণ করে নেয়। পরে সেই উদ্ভিদজাত উপাদান শাবকদের খাওয়ানো হয়। শাবকেরা সেটি চিবিয়ে খায় এবং শক্ত অংশ ফেলে দেয়।
তবে জাপানে অবস্থানরত নাগাসাকি ইউনিভার্সিটির প্রাইমেটোলজিস্ট অধ্যাপক মাইকেল হাফম্যান মনে করেন, ঘটনাটি অত্যন্ত কৌতূহলোদ্দীপক হলেও হাতিরা শাবকদের জন্য প্রয়োজন অনুযায়ী নির্দিষ্ট চিকিৎসা করেছে, এমন সিদ্ধান্তে পৌঁছাতে আরও তথ্য-প্রমাণ প্রয়োজন।
ক্যামেরায় নজরদারি
স্থানীয় বন্যপ্রাণী বিশেষজ্ঞদের হাতে ক্যামেরা তুলে দিয়েছেন গবেষকেরা। এসব ক্যামেরার মাধ্যমে হাতিদের আচরণ পর্যবেক্ষণ করা হচ্ছে। বিশেষ করে অসুস্থতা বা শারীরিক সমস্যার সময় হাতিরা নির্দিষ্ট কোনো উদ্ভিদ বেছে নেয় কি না, তা জানার চেষ্টা করছেন তারা।
গবেষণাটির আরেক প্রধান গবেষক জার্মানির হ্যামবার্গের বের্নহার্ড নখট ইনস্টিটিউট ফর ট্রপিক্যাল মেডিসিনের ড. ফাবিয়েন শুলৎজ বলেন, স্থানীয় জ্ঞান গবেষকদের জন্য একটি মানচিত্র তৈরি করে দিয়েছে। এখন হাতিদের অনুসরণ করে নির্দিষ্ট স্বাস্থ্যগত পরিস্থিতিতে তারা নির্দিষ্ট কোনো উদ্ভিদ বেছে নেয় কি না এবং ওই উদ্ভিদের জৈবিক কার্যকারিতা রয়েছে কি না, তা খুঁজে দেখা হচ্ছে।
গুহায় গিয়ে সংগ্রহ করে খনিজ
আফ্রিকান হাতিদের এমন আচরণ বিজ্ঞানীদের কাছে নতুন নয়। কেনিয়ার মাউন্ট এলগন অঞ্চলের হাতিদের ‘লবণ-খননকারী হাতি’ও বলা হয়। তারা গুহার ভেতরে গিয়ে দাঁত দিয়ে পাথর ঘষে প্রয়োজনীয় খনিজ সংগ্রহ করে খায়।
গবেষণার সঙ্গে যুক্ত না থাকা অধ্যাপক হাফম্যান বলেন, মশা, ড্রোসোফিলা, মৌমাছি এবং বিভিন্ন প্রজাতির গ্রেট এপও নিজেদের চিকিৎসার জন্য প্রাকৃতিক উপাদান ব্যবহার করে।
হাতির স্ব-চিকিৎসা নিয়ে প্রাচীনতম বৈজ্ঞানিক বর্ণনার একটি পাওয়া যায় খ্রিস্টীয় তৃতীয় শতকের শুরুতে। রোমান লেখক ক্লডিয়াস এলিয়ানের দে ন্যাচুরা এনিমালিয়াম গ্রন্থে বর্শা ও তীরের আঘাতে আহত একটি হাতির জলপাই গাছের ফুল ও তেল খাওয়ার বর্ণনা রয়েছে।
বন যেন প্রাকৃতিক ওষুধের ভাণ্ডার
গবেষকদের মতে, বন্যপ্রাণীর স্ব-চিকিৎসার আচরণ থেকে উদ্ভিদের সম্ভাব্য ঔষধি গুণ সম্পর্কে নতুন ধারণা পাওয়া যেতে পারে। হাতিরা যেসব উদ্ভিদ ব্যবহার করে, সেগুলো থেকে ভবিষ্যতে নতুন কোনো ওষুধের উপাদান পাওয়া যায় কি না, সেটিও খতিয়ে দেখছেন তারা।
ড. ফ্রেইম্যান বলেন, মানুষের ব্যবহৃত অনেক ওষুধই গাছ, শৈবাল, ছত্রাক ও প্রবালপ্রাচীর থেকে পাওয়া যৌগের ভিত্তিতে তৈরি হয়েছে। তাই বনাঞ্চল রক্ষা করা শুধু জীববৈচিত্র্য সংরক্ষণের জন্য নয়, ভবিষ্যতের সম্ভাব্য প্রাকৃতিক ওষুধের উৎস টিকিয়ে রাখার জন্যও গুরুত্বপূর্ণ।
এই গবেষণা দেখাচ্ছে, বনাঞ্চলের উদ্ভিদ সম্পর্কে মানুষের অজানা বহু তথ্য হয়তো সেখানে বসবাসকারী প্রাণীদের আচরণের মধ্যেই লুকিয়ে আছে।
সূত্র: বিবিসি






