বনের কোনো এক কোণে হয়তো একটি কাঠবিড়ালি ছুটে বেড়াচ্ছে। মুখে একটি বাদাম কিংবা কোনো বীজ। নিরাপদ জায়গা খুঁজে সেটি মাটির নিচে পুঁতে ফেলল। উদ্দেশ্য একটাই, প্রয়োজনে পরে খাবার হিসেবে তা খুঁজে বের করা।
কিন্তু প্রকৃতির গল্পে সবকিছু সব সময় পরিকল্পনামতো ঘটে না। কাঠবিড়ালি তার লুকিয়ে রাখা সব খাবার শেষ পর্যন্ত খুঁজে পায় না। মাটির নিচে থেকে যায় কিছু বাদাম ও বীজ। আর সেই ভুলে যাওয়া বীজই একসময় হয়ে উঠতে পারে নতুন একটি গাছের শুরু।
খাবার লুকাতেই বীজ ছড়ানো
কাঠবিড়ালির স্বভাবের একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ হলো খাবার সংগ্রহ করে বিভিন্ন জায়গায় লুকিয়ে রাখা। বিশেষ করে বাদাম ও বীজ তারা মাটিতে পুঁতে রাখে, যাতে খাদ্যের সংকটের সময় সেগুলো ব্যবহার করতে পারে।
কিন্তু সব লুকানো খাবারের অবস্থান তাদের মনে থাকে না। কোনোটি হয়তো অন্য প্রাণী নিয়ে যায়, কোনোটি মাটির গভীরে হারিয়ে যায়, আবার কোনোটি পড়ে থাকে সেখানেই।
যেসব বীজ উপযুক্ত পরিবেশ পায়, সেগুলোর কিছু অঙ্কুরিত হতে পারে। সেখান থেকে ধীরে ধীরে জন্ম নিতে পারে নতুন গাছ।
এভাবেই একটি ছোট প্রাণীর খাবার সংরক্ষণের স্বাভাবিক আচরণ প্রকৃতির বীজ বিস্তারের প্রক্রিয়ায় ভূমিকা রাখে।
কাঠবিড়ালি কি সত্যিই গাছ লাগায়?
অবশ্যই কাঠবিড়ালি মানুষের মতো পরিকল্পনা করে গাছ লাগায় না। তাদের উদ্দেশ্যও বন তৈরি করা নয়। তারা খাবার সংরক্ষণের জন্য বীজ লুকিয়ে রাখে।
তবু এই আচরণের একটি অনিচ্ছাকৃত ফল হলো, বীজ এক জায়গা থেকে অন্য জায়গায় ছড়িয়ে পড়ে এবং মাটির নিচে পৌঁছে যায়। কোনো কোনো ক্ষেত্রে সেই বীজের অঙ্কুরোদ্গমের সুযোগ তৈরি হয়।
এই কারণেই কাঠবিড়ালিকে রূপক অর্থে প্রকৃতির ‘ছোট্ট বনরোপণকারী’ বলা যায়।
একটি ভুলে যাওয়া বাদাম, একটি নতুন গাছ
ভাবুন, একটি কাঠবিড়ালি একটি বাদাম মাটিতে পুঁতে রাখল। কয়েক দিন বা কয়েক সপ্তাহ পর সে হয়তো সেই জায়গাটি আর খুঁজে পেল না। সময়ের সঙ্গে বাদামটি মাটির আর্দ্রতা, তাপমাত্রা ও অন্যান্য প্রাকৃতিক পরিস্থিতির প্রভাবে অঙ্কুরোদ্গমের উপযোগী অবস্থায় পৌঁছাতে পারে।
যদি বীজটি জীবন্ত থাকে এবং পরিবেশ অনুকূল হয়, তাহলে সেখান থেকে জন্ম নিতে পারে একটি চারা। সেই চারা বড় হয়ে একদিন পরিণত হতে পারে একটি গাছে।
অর্থাৎ, কাঠবিড়ালির কাছে এটি ছিল খাবার জমিয়ে রাখার কাজ; কিন্তু প্রকৃতির কাছে সেটিই হয়ে উঠতে পারে বীজ ছড়িয়ে দেওয়ার একটি উপায়।
শুধু কাঠবিড়ালি নয়
প্রকৃতিতে বীজ ছড়িয়ে দেওয়ার কাজে শুধু কাঠবিড়ালিরাই ভূমিকা রাখে না। পাখি, বাদুড়, বানরসহ নানা প্রাণী বিভিন্নভাবে বীজ এক স্থান থেকে অন্য স্থানে নিয়ে যায়।
কখনো প্রাণীরা ফল খেয়ে বীজ অন্য জায়গায় ফেলে দেয়। আবার কখনো প্রাণীর শরীরের মাধ্যমে বীজ দূরবর্তী স্থানে পৌঁছে যায়। কাঠবিড়ালির ক্ষেত্রে মাটিতে বীজ পুঁতে রাখার আচরণটি বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ।
ফলে বন ও বন্যপ্রাণীর সম্পর্ক আসলে একমুখী নয়। প্রাণীরা যেমন গাছ থেকে খাবার পায়, তেমনি তাদের বিভিন্ন আচরণও গাছের বিস্তারে ভূমিকা রাখতে পারে।
তবে বীজ সংগ্রহ, বহন ও মাটিতে পুঁতে রাখার মাধ্যমে কাঠবিড়ালি যে বীজ বিস্তারে ভূমিকা রাখে, তা প্রকৃতির পারস্পরিক নির্ভরতার একটি চমৎকার উদাহরণ।
প্রকৃতির বড় কোনো পরিবর্তনের জন্য সব সময় বড় কোনো প্রাণীর প্রয়োজন হয় না। কখনো কখনো ছোট্ট একটি প্রাণীর দৈনন্দিন জীবনযাপনও পরিবেশের ওপর দীর্ঘমেয়াদি প্রভাব ফেলতে পারে।
একটি কাঠবিড়ালি হয়তো শুধু আগামী দিনের খাবারের কথা ভেবেই বাদামটি মাটিতে লুকিয়েছিল। কিন্তু সেই বাদাম যদি আর খুঁজে না পাওয়া যায়, প্রকৃতি সেটিকে অন্য এক সম্ভাবনায় পরিণত করতে পারে।
হয়তো সেখান থেকেই জন্ম নেবে একটি গাছ। আর সেই গাছ একদিন ছায়া দেবে, ফুল-ফল দেবে, পাখিদের আশ্রয় দেবে, এবং তৈরি করবে নতুন এক জীবনের গল্প।
প্রকৃতির কাছে তাই কাঠবিড়ালির ভুলে যাওয়া খাবারও কখনো কখনো ভবিষ্যতের একটি বন হয়ে ওঠার সম্ভাবনা বহন করে।






