গাছেরা কি সত্যিই একে অপরের সঙ্গে যোগাযোগ করে?

গভীর জঙ্গলের ভেতর হাঁটছেন আপনি। চারপাশে বিশাল বিশাল গাছ। মাথার ওপর ঘন পাতার ছাউনি। বাতাসে পাতার মর্মর শব্দ ছাড়া যেন আর কিছুই নেই। দূরে হয়তো কোনো পাখির ডাক, কোথাও শুকনো পাতার ওপর ছোট কোনো প্রাণীর চলার শব্দ।

সব মিলিয়ে মনে হতে পারে, বন যেন নিঃশব্দ।

কিন্তু সত্যিই কি তাই?

আপনার পায়ের নিচে, মাটির গভীরে তখন হয়তো চলছে এক অদৃশ্য যোগাযোগ ব্যবস্থা, যার অনেকটাই এখনো মানুষের চোখের আড়ালে।

গাছপালা মানুষের মতো মুখোমুখি বসে কথা বলে না। তাদের কোনো শব্দভাণ্ডারও নেই। কিন্তু গবেষণায় দেখা গেছে, উদ্ভিদ বিভিন্ন রাসায়নিক সংকেতের মাধ্যমে পরিবেশের পরিবর্তনের প্রতিক্রিয়া জানাতে পারে এবং কিছু ক্ষেত্রে আশপাশের উদ্ভিদের ওপরও প্রভাব ফেলতে পারে।

এ যোগাযোগের একটি অংশ ঘটে মাটির ওপর দিয়ে, বাতাসে ছড়িয়ে পড়া রাসায়নিক সংকেতের মাধ্যমে।

ধরা যাক, কোনো গাছ পোকামাকড়ের আক্রমণের শিকার হলো। কিছু উদ্ভিদ তখন বিশেষ ধরনের উদ্বায়ী রাসায়নিক পদার্থ বাতাসে ছড়িয়ে দিতে পারে। এসব সংকেত আশপাশের উদ্ভিদের প্রতিরক্ষা-প্রক্রিয়াকে প্রভাবিত করতে পারে।

অর্থাৎ, বনের নীরবতার আড়ালে এমন কিছু সংকেত ছড়িয়ে পড়তে পারে, যা মানুষের কানে শোনা যায় না, কিন্তু উদ্ভিদের জন্য গুরুত্বপূর্ণ।

তবে গল্পটা আরও রহস্যময় হয়ে ওঠে মাটির নিচে নামলে।

গাছের শিকড়ের সঙ্গে বিভিন্ন ধরনের ছত্রাকের সম্পর্ক রয়েছে। বিশেষ করে মাইকোরাইজাল ছত্রাক গাছের শিকড়ের সঙ্গে পারস্পরিক সম্পর্ক তৈরি করে। এই সম্পর্কের মাধ্যমে ছত্রাক মাটি থেকে পানি ও পুষ্টি সংগ্রহে গাছকে সহায়তা করতে পারে। বিনিময়ে ছত্রাক গাছের কাছ থেকে কার্বনজাতীয় উপাদান পেতে পারে।

ছত্রাকের দেহের সূক্ষ্ম সুতার মতো অংশকে বলা হয় মাইসেলিয়াম। মাটির নিচে এই মাইসেলিয়াম ছড়িয়ে থাকতে পারে অনেক দূর পর্যন্ত। কোথাও কোথাও তা বিভিন্ন উদ্ভিদের শিকড়ের সঙ্গে সম্পর্ক তৈরি করে।

এই কারণেই জনপ্রিয় লেখালেখিতে এমন ভূগর্ভস্থ সংযোগকে বলা হয় ‘উড ওয়াইড ওয়েব’ইন্টারনেটের সঙ্গে তুলনা করে তৈরি একটি আকর্ষণীয় নাম।

বিভিন্ন গবেষণায় মাইকোরাইজাল নেটওয়ার্কের মাধ্যমে কার্বনসহ কিছু উপাদান এক উদ্ভিদ থেকে অন্য উদ্ভিদে স্থানান্তরের প্রমাণ পাওয়া গেছে। তবে এই প্রক্রিয়া কতটা ব্যাপক, কোন পরিস্থিতিতে ঘটে এবং এর পরিবেশগত গুরুত্ব কতটা, এসব নিয়ে এখনো গবেষণা চলছে।

অর্থাৎ, মাটির নিচে ছত্রাকের নেটওয়ার্ক আছে বলেই যে বনজুড়ে সব গাছ একটি নির্দিষ্ট ‘যোগাযোগ নেটওয়ার্কে’ যুক্ত এবং তারা পরিকল্পিতভাবে একে অপরকে বার্তা পাঠাচ্ছে, এমন সিদ্ধান্তে পৌঁছানো ঠিক হবে না।

‘গাছেরা কথা বলে’এই বাক্যটি শুনতে যতটা রোমাঞ্চকর, বৈজ্ঞানিক বাস্তবতা তার চেয়ে অনেক বেশি জটিল।

গাছের মধ্যে রাসায়নিক সংকেতের আদান-প্রদান, শিকড় ও ছত্রাকের পারস্পরিক সম্পর্ক এবং মাটির নিচে উপাদান স্থানান্তরের মতো ঘটনা বৈজ্ঞানিকভাবে পর্যবেক্ষণ করা হয়েছে। কিন্তু এগুলোকে মানুষের কথোপকথনের সঙ্গে সরাসরি তুলনা করা ঠিক নয়।

বিশেষ করে ‘একটি গাছ ইচ্ছা করে পাশের গাছকে বিপদ সম্পর্কে সতর্ক করছে’এমন ব্যাখ্যা সব ক্ষেত্রে বৈজ্ঞানিকভাবে প্রতিষ্ঠিত নয়।

গাছের এই জটিল যোগাযোগব্যবস্থা কীভাবে কাজ করে, এর সীমা কোথায় এবং বনভূমির পরিবেশগত ভারসাম্যে এর ভূমিকা কতটা, এসব প্রশ্নের উত্তর খুঁজতেই চলছে নতুন নতুন গবেষণা।

যে বনকে আমরা নিঃশব্দ ভাবি…

আবার সেই জঙ্গলে ফিরে আসা যাক।

চারপাশে তখনও কোনো মানুষের কথাবার্তা নেই। নেই কোনো মোবাইল ফোনের শব্দ, নেই কোনো বার্তা আদান-প্রদানের দৃশ্যমান ব্যবস্থা।

শুধু গাছ, মাটি, শিকড়, ছত্রাক আর অসংখ্য অদৃশ্য রাসায়নিক সংকেত।

হয়তো এই কারণেই বনকে নতুন করে দেখার প্রয়োজন হয়। কারণ, প্রকৃতির নীরবতা মানেই সেখানে কিছু ঘটছে না, এমন নয়।

আমরা যে বনকে নিঃশব্দ ভাবি, সেই বনের মাটির নিচে হয়তো চলছে জটিল সব রাসায়নিক ও জৈবিক মিথস্ক্রিয়া।

আর সেই অদৃশ্য জগতের কতটুকু আমরা এখনো বুঝতে পেরেছি?

হয়তো ভবিষ্যতের গবেষণাই আরও অনেক রহস্যের দরজা খুলে দেবে।

ততদিন জঙ্গলের ভেতর দাঁড়িয়ে একটি প্রশ্ন করাই যায়—

আমরা যে বনকে নিঃশব্দ ভাবি, সেই বন কি আসলে আমাদের অজানা এক ভাষায় সারাক্ষণ ‘কথা’ বলছে?

বিজ্ঞান এখনো সব রহস্যের উত্তর দেয়নি, মাটির নিচের এই অদৃশ্য নেটওয়ার্কের গল্প তাই এখনো অসম্পূর্ণ।

আরও পড়ুন

কার্বনের ছয় রং: পরিবেশ ও জলবায়ুর ওপর কী প্রভাব ফেলে?

জলবায়ু পরিবর্তন ও পরিবেশ নিয়ে আলোচনায় ‘কার্বন’ শব্দটি বহুল ব্যবহৃত। তবে কার্বন সব সময় একই রূপে থাকে না, আর এর সব ধরন পরিবেশের ওপর...
প্রকৃতি ও জীববৈচিত্র্য
0
minutes

উটের চোখের পানিতে ২৬ সাপের বিষের প্রতিষেধক, দাবিটি কতটা সত্য?

উটের চোখের পানিতে এমন অ্যান্টিবডি রয়েছে, যা দুই ডজনেরও বেশি প্রজাতির বিষধর সাপের বিষ নিষ্ক্রিয় করতে পারে, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া এমন দাবি কৌতূহল...
জাতীয়
0
minutes

ডাইনোসর বিলুপ্ত, তবু টিকে গেল কুমির: রহস্য উন্মোচন

পৃথিবী থেকে একসময় হারিয়ে গেছে বিশালাকার ডাইনোসর। প্রায় ৬ কোটি ৬০ লাখ বছর আগে এক গ্রহাণুর আঘাতে পৃথিবীর প্রায় ৭৫ শতাংশ প্রজাতি বিলুপ্ত হয়ে...
প্রকৃতি ও জীববৈচিত্র্য
0
minutes

মিঠাপানির প্রবাহ কমায় বদলে যাচ্ছে সুন্দরবনের উদ্ভিদসমাজ, বাড়ছে কাঁকড়া গাছ

বিশ্বের বৃহত্তম ম্যানগ্রোভ বন সুন্দরবনে এক দশকের ব্যবধানে বীজ থেকে চারা জন্মানোর হার কমেছে। ২০১০ থেকে ২০২০ সালের তথ্য বিশ্লেষণে দেখা গেছে, এ সময়ে...
প্রকৃতি ও জীববৈচিত্র্য
0
minutes
spot_imgspot_img