একদিকে বিশ্বের কোটি কোটি মানুষ পর্যাপ্ত খাবার পাচ্ছে না, অন্যদিকে প্রতিদিন বিপুল পরিমাণ খাবার চলে যাচ্ছে ডাস্টবিনে। এটি শুধু খাবারের অপচয় নয়; এর সঙ্গে নষ্ট হচ্ছে পানি, কৃষিজমি, জ্বালানি, শ্রম ও অর্থ। বাড়ছে বর্জ্য ও গ্রিনহাউস গ্যাসের নিঃসরণ, তৈরি হচ্ছে পরিবেশের ওপর বাড়তি চাপ।
অর্থাৎ, একটি খাবার নষ্ট হওয়ার প্রভাব শেষ হয় ডাস্টবিনে নয়, এর প্রভাব পড়ে পুরো পরিবেশব্যবস্থায়।
খাবারের সঙ্গে নষ্ট হচ্ছে প্রাকৃতিক সম্পদ
একটি খাবার মানুষের প্লেটে পৌঁছানোর আগে উৎপাদন, সংগ্রহ, সংরক্ষণ, পরিবহন ও বাজারজাতকরণের দীর্ঘ পথ পাড়ি দেয়। প্রতিটি ধাপে ব্যবহৃত হয় পানি, জমি, জ্বালানি ও শ্রম।
সেই খাবার যদি শেষ পর্যন্ত খাওয়া না হয়, তাহলে এসব সম্পদেরও বড় একটি অংশ কার্যত অপচয় হয়। বিশেষ করে খাদ্য উৎপাদনে ব্যবহৃত পানি ও কৃষিজমির ওপর এর প্রভাব গুরুত্বপূর্ণ। উৎপাদন বাড়ানোর চাপের পাশাপাশি খাবার নষ্ট হতে থাকলে প্রাকৃতিক সম্পদের ওপর চাপ আরও বাড়ে।
প্রতিদিন নষ্ট হচ্ছে ১০০ কোটির বেশি বেলার খাবার
জাতিসংঘের পরিবেশবিষয়ক সংস্থা ও খাদ্য ও কৃষি সংস্থার সাম্প্রতিক তথ্য অনুযায়ী, বিশ্বে উৎপাদিত মোট খাদ্যের প্রায় এক-তৃতীয়াংশ কোনো না কোনো পর্যায়ে নষ্ট বা অপচয় হয়।
চূড়ান্ত ভোক্তার কাছে পৌঁছানোর পর বছরে প্রায় ১০৫ কোটি টন খাবার অপচয় হচ্ছে। এর মধ্যে ৬০ শতাংশ বা প্রায় ৬৩ কোটি ১০ লাখ টন আসে পরিবার থেকে। খাদ্য পরিবেশন খাত থেকে ২৮ শতাংশ এবং খুচরা বিক্রয় পর্যায় থেকে ১২ শতাংশ।
অর্থাৎ, প্রতিদিন বিশ্বে একশ কোটির বেশি বেলার খাবার মানুষের পেটে না গিয়ে বর্জ্যে পরিণত হচ্ছে।
অপচয়ের সঙ্গে বাড়ছে জলবায়ুর চাপ
খাদ্য উৎপাদন, পরিবহন ও সংরক্ষণে ব্যবহৃত জ্বালানি থেকে গ্রিনহাউস গ্যাসের নিঃসরণ হয়। আবার ফেলে দেওয়া খাবার বর্জ্য হিসেবে পচলেও পরিবেশে ক্ষতিকর গ্যাসের সৃষ্টি হতে পারে।
ফলে খাদ্য অপচয় জলবায়ু পরিবর্তনের সঙ্গেও সম্পর্কিত। একই সঙ্গে কৃষিজমি ও পানির বাড়তি ব্যবহার জীববৈচিত্র্য ও প্রাকৃতিক বাস্তুতন্ত্রের ওপর চাপ তৈরি করতে পারে।
খাবার যত বেশি অপচয় হবে, একই পরিমাণ খাদ্য চাহিদা পূরণে উৎপাদন ও সম্পদ ব্যবহারের প্রয়োজন তত বাড়বে।
বাংলাদেশেও অপচয় কমানোর সুযোগ আছে
বাংলাদেশে একজন মানুষ বছরে গড়ে প্রায় ৮২ কেজি খাবার অপচয় করেন। তবে ক্ষতি শুধু ভোক্তা পর্যায়ে নয়। ফসল সংগ্রহ, পরিবহন, সংরক্ষণ ও বাজারজাতকরণেও খাদ্য নষ্ট হয়।
অপর্যাপ্ত ঠান্ডা সংরক্ষণব্যবস্থা, পরিবহন ও বাজারজাতকরণে দুর্বলতা কমানো গেলে উৎপাদিত খাদ্যের একটি বড় অংশ রক্ষা করা সম্ভব।
আধুনিক শীতল সংরক্ষণ অবকাঠামো, মোবাইল খাদ্য প্রক্রিয়াজাতকরণ এবং ডিজিটাল প্ল্যাটফর্মের মাধ্যমে অতিরিক্ত খাবার দ্রুত মানুষের কাছে পৌঁছে দেওয়ার মতো উদ্যোগও এ ক্ষেত্রে ভূমিকা রাখতে পারে।
ক্ষুধার পৃথিবীতে অপচয়ের বৈপরীত্য
বিশ্বে খাদ্য অপচয়ের কারণে বছরে প্রায় ১ লাখ কোটি মার্কিন ডলারের অর্থনৈতিক ক্ষতি হয়। একই সময়ে ৭৮ কোটির বেশি মানুষ তীব্র খাদ্যনিরাপত্তাহীনতা বা ক্ষুধার সমস্যায় ভুগছেন।
এই বৈপরীত্য খাদ্য অপচয়কে শুধু অর্থনৈতিক বা নৈতিক সমস্যা নয়, বৈশ্বিক খাদ্যব্যবস্থার একটি বড় চ্যালেঞ্জ হিসেবে সামনে আনে।
টেকসই উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রার ১২.৩ সূচকে ২০৩০ সালের মধ্যে খুচরা ও ভোক্তা পর্যায়ে মাথাপিছু খাদ্য অপচয় অর্ধেকে নামিয়ে আনার লক্ষ্য রয়েছে।
খাবার বাঁচানো মানে পৃথিবীর সম্পদ বাঁচানো
খাদ্য অপচয় কমানো মানে শুধু ডাস্টবিনে কম খাবার যাওয়া নয়। এর অর্থ পানি, জমি, জ্বালানি ও শ্রমের অপচয় কমানো; একই সঙ্গে পরিবেশ ও জলবায়ুর ওপর চাপ কমানো।
প্রয়োজন অনুযায়ী খাবার নেওয়া, অবশিষ্ট খাবার সঠিকভাবে সংরক্ষণ করা, অতিরিক্ত খাবার ভাগ করে দেওয়া এবং উৎপাদন থেকে বাজার পর্যন্ত অপচয় কমানোর ব্যবস্থা করা, এসব পদক্ষেপই বড় পরিবর্তনের ভিত্তি হতে পারে।
কারণ, পৃথিবীর সম্পদ সীমিত। সেই সম্পদ ব্যবহার করে তৈরি খাবার নষ্ট না করাও পৃথিবীর ভারসাম্য রক্ষার একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ।






