ব্রয়লার মুরগির উৎপাদনে অ্যান্টিবায়োটিক, কৃত্রিম মেডিসিন, ভিটামিন ও গ্রোথ প্রমোটরের ব্যবহার কমিয়ে উদ্ভিদভিত্তিক বিকল্প ব্যবহারের প্রযুক্তি উদ্ভাবন করেছেন বাংলাদেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের (বাকৃবি) একদল গবেষক। প্লানটেইন ঘাস ও দেশীয় কয়েকটি ঔষধি ভেষজের সমন্বয়ে তৈরি ‘বাউ-প্লান্টিভ’ নামের ফাইটোজেনিক ফিড অ্যাডিটিভ ব্যবহার করে পুষ্টিগুণসমৃদ্ধ ও নিরাপদ ব্রয়লার মাংস উৎপাদনের সম্ভাবনা দেখিয়েছেন তারা।
গবেষকদলের নেতৃত্বে রয়েছেন বিশ্ববিদ্যালয়ের অ্যানিমেল নিউট্রিশন বিভাগের ড. মোহাম্মদ আল-মামুন। সহযোগী গবেষক হিসেবে রয়েছেন উদ্যানতত্ত্ব বিভাগের অধ্যাপক ড. তামান্না হক। এ গবেষণায় স্নাতকোত্তর ও পিএইচডি পর্যায়ের শিক্ষার্থীরাও যুক্ত ছিলেন।
গবেষকদের ভাষ্য, প্লানটেইনের অ্যান্টিঅক্সিডেন্ট ও ঔষধি বৈশিষ্ট্যকে কাজে লাগিয়ে তৈরি করা হয়েছে ‘বাউ-প্লান্টিভ’। অ্যান্টিবায়োটিকের বিকল্প হিসেবে এটি ব্যবহার করে ব্রয়লার উৎপাদনের পাশাপাশি গবাদি পশু মোটাতাজাকরণেও সম্ভাবনা রয়েছে। একই সঙ্গে দেশে প্লানটেইনের বীজ উৎপাদন, চাষ, প্রক্রিয়াজাতকরণ ও খামারে ব্যবহারের মাধ্যমে একটি দেশীয় সরবরাহব্যবস্থা গড়ে তোলার সুযোগ তৈরি হয়েছে।
বাংলাদেশ একাডেমি অব সায়েন্সেস-বিএএস ও যুক্তরাষ্ট্রের কৃষি বিভাগের অর্থায়নে পরিচালিত ‘সাসটেইনেবল কমার্শিয়ালাইজেশন অব প্লানটেইন অ্যান্ড সিড ভ্যালু চেইন ডেভেলপমেন্ট ফর সেফ অ্যান্ড ফাংশনাল ব্রয়লার মিট প্রোডাকশন’ প্রকল্পের আওতায় গবেষণাটি পরিচালিত হয়।
প্রধান গবেষক ড. মোহাম্মদ আল-মামুন বলেন, প্লানটেইন একটি ঔষধি উদ্ভিদ। এতে গ্লাইকোসাইড, ক্যাটালপলসহ বিভিন্ন ধরনের জৈব সক্রিয় যৌগ রয়েছে। পাশাপাশি উদ্ভিদটির শক্তিশালী অ্যান্টিঅক্সিডেন্ট বৈশিষ্ট্য রয়েছে। বাংলাদেশের আবহাওয়ায় অক্টোবর থেকে মে পর্যন্ত প্রায় আট মাস প্লানটেইন চাষ করা সম্ভব।
তিনি জানান, প্লানটেইন ও দেশীয় কয়েকটি ঔষধি ভেষজের সমন্বয়ে তৈরি হয়েছে ‘বাউ-প্লান্টিভ’। এ প্রযুক্তি নিয়ে করা গবেষণার ফলাফল বিভিন্ন আন্তর্জাতিক সাময়িকীতে প্রকাশিত হয়েছে। এর মধ্যে ‘পোলট্রি সায়েন্স জার্নাল’ ও ‘ইতালিয়ান জার্নাল অব অ্যানিমেল সায়েন্স’ উল্লেখযোগ্য। উদ্ভাবিত প্রযুক্তির পেটেন্টের জন্যও আবেদন করা হয়েছে।
গবেষক ড. আল-মামুন বলেন, প্রচলিত ব্রয়লার উৎপাদনে ব্যবহৃত কৃত্রিম মেডিসিন, ভিটামিন ও গ্রোথ প্রমোটরের বিকল্প খুঁজতেই প্লানটেইন নিয়ে গবেষণা শুরু করা হয়। পরীক্ষায় ‘বাউ-প্লান্টিভ’ খাওয়ানো মুরগির হাড়ের গঠন তুলনামূলকভাবে শক্তিশালী হয়েছে। হাড়ে ক্যালসিয়াম, ফসফরাস ও আয়রনের পরিমাণও বেড়েছে। মুরগির দৈহিক তৎপরতা বৃদ্ধি পাওয়ার পাশাপাশি পালক হয়েছে ঘন ও উজ্জ্বল।
গবেষণার আরও একটি গুরুত্বপূর্ণ ফল হলো, ‘বাউ-প্লান্টিভ’ খাওয়ানো মুরগির মাংসে স্বাস্থ্যকর ওমেগা-৩ ফ্যাটি অ্যাসিডের পরিমাণ প্রায় ৮ শতাংশ বেড়েছে। একই সঙ্গে মাংসের অ্যান্টিঅক্সিডেন্ট বৈশিষ্ট্য বৃদ্ধি পেয়েছে। গরমের সময় মুরগির হিট স্ট্রেস মোকাবিলার সক্ষমতাও উন্নত হয়েছে বলে গবেষণায় দেখা গেছে।
গবেষকরা জানান, প্রতিটি পরীক্ষায় প্রায় ৪৫০টি করে ব্রয়লার মুরগি নিয়ে ৩৫ দিন পর্যবেক্ষণ করা হয়েছে। তিনটি পৃথক পর্যায়ে এভাবে তথ্য-উপাত্ত সংগ্রহ ও বিশ্লেষণ করা হয়।
শুধু মুরগির খাদ্য হিসেবে ব্যবহার নয়, বাংলাদেশে বাণিজ্যিকভাবে প্লানটেইন চাষের সম্ভাবনাও যাচাই করেছেন গবেষকরা। ময়মনসিংহ ও মানিকগঞ্জে খোলা মাঠের পাশাপাশি শীতাতপ নিয়ন্ত্রিত ও সাধারণ গ্রিনহাউজে প্লানটেইন চাষ করা হয়। এতে দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে বাণিজ্যিকভাবে এ উদ্ভিদ উৎপাদনের সম্ভাবনা পাওয়া গেছে।
তবে উদ্ভাবিত প্রযুক্তিকে বড় পরিসরে কাজে লাগাতে উৎপাদন ও বাজারজাতকরণকে বড় চ্যালেঞ্জ হিসেবে দেখছেন গবেষকরা। ড. আল-মামুন বলেন, প্লানটেইনকে বাণিজ্যিকভাবে বাজারে নিতে সরকার, গবেষণা প্রতিষ্ঠান, বীজ কোম্পানি, ফিড মিল, পোলট্রি শিল্প, এনজিও ও বাজার ব্যবস্থাপনার সঙ্গে সমন্বিত উদ্যোগ প্রয়োজন।
এ ছাড়া প্লানটেইন সংরক্ষণ ও প্রক্রিয়াজাতকরণের জন্য আধুনিক ব্যবস্থা, ব্লাস্ট ফ্রিজিং এবং কোল্ড-চেইন অবকাঠামো গড়ে তোলার ওপরও গুরুত্ব দিয়েছেন তিনি। এসব উদ্যোগ বাস্তবায়ন করা গেলে আমদানিনির্ভরতা কমিয়ে দেশে প্লানটেইনভিত্তিক পশুখাদ্য ও পোলট্রি উৎপাদনের একটি নতুন সম্ভাবনাময় খাত তৈরি হতে পারে।






