সুপার এল নিনিওর ছোবলে বাড়ছে জলবায়ু বিপর্যয়, যেভাবে প্রস্তুতি নিচ্ছে বিশ্ব

পৃথিবীর জলবায়ুতে ক্রমেই স্পষ্ট হচ্ছে প্রকৃতির ধ্বংসাত্মক খামখেয়ালিপনা। সুপার এল নিনিওর প্রভাবে কোনো অঞ্চল পুড়ছে তীব্র তাপপ্রবাহে, কোথাও চলছে অতিবৃষ্টি। দক্ষিণ এশিয়া ও আফ্রিকায় দেখা দিয়েছে মারাত্মক খরার আশঙ্কা। আবার দক্ষিণ-পূর্ব আমেরিকায় হানা দিতে পারে অতিবৃষ্টি ও বন্যা।

এরই মধ্যে জাতিসংঘ সতর্ক করেছে, চলমান সুপার এল নিনিও অতীতের যেকোনো এল নিনিওর তুলনায় অনেক বেশি শক্তিশালী ও প্রলয়ংকর হতে পারে। এরই মধ্যে প্রশান্ত মহাসাগরের নিরক্ষীয় অঞ্চলে সমুদ্রপৃষ্ঠের তাপমাত্রা স্বাভাবিকের তুলনায় ৩ ডিগ্রি সেলসিয়াসের বেশি বেড়ে অতীতের সব রেকর্ড ভেঙে দিয়েছে। এটি ৪ ডিগ্রি সেলসিয়াসেও পৌঁছাতে পারে বলে সতর্ক করা হয়েছে।

বিশ্বজুড়ে এল নিনিওর প্রভাব অনুভূত হতে শুরু করায় পুরো পৃথিবী এখন ‘চরম প্রতিকূল আবহাওয়ার বিপজ্জনক অঞ্চলে’ প্রবেশ করেছে বলে সতর্ক করেছেন জাতিসংঘ মহাসচিব আন্তোনিও গুতেরেস।

এ ছাড়া সুপার এল নিনিওর প্রভাবে চলতি সেপ্টেম্বর থেকে আগামী বছরের ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত ছয় মাসে বিশ্বব্যাপী প্রায় সাড়ে চার লাখের বেশি মানুষের মৃত্যু ঘটতে পারে বলে সতর্ক করেছে যুক্তরাষ্ট্রের শিকাগো বিশ্ববিদ্যালয়ভিত্তিক গবেষণা প্রতিষ্ঠান ক্লাইমেট ইমপ্যাক্ট ল্যাব। এ সময়ে ভূমির গড় তাপমাত্রা স্বাভাবিকের চেয়ে প্রায় ১ দশমিক ২ ডিগ্রি সেলসিয়াস বেশি থাকতে পারে বলেও সতর্ক করেছে তারা।

সতর্ক করা হয়েছে এল নিনিওর প্রভাবে খরার কারণে খাদ্য সংকট নিয়েও। ক্লাইমেট ইমপ্যাক্ট ল্যাব বলছে, খরার কারণে প্রায় পাঁচ কোটি মানুষ মারাত্মক দুর্ভিক্ষের মুখোমুখি হতে পারে। বিশেষ করে নাইজেরিয়া, ইন্দোনেশিয়া, সুদান ও ভারতে এর নেতিবাচক প্রভাব বেশি পড়তে পারে।

এমন পরিস্থিতিতে আবহাওয়ার এই মারাত্মক খামখেয়ালিপনা মোকাবিলায় বিভিন্ন দেশ কী প্রস্তুতি নিচ্ছে, সে বিষয়ে একটি বিস্তারিত প্রতিবেদন প্রকাশ করেছে বিবিসি। আবহাওয়া নিয়ে কাজ করা বিবিসির ছয় সাংবাদিকের লেখা ওই প্রতিবেদনটি গত সেপ্টেম্বর প্রকাশিত হয়।

সুপার এল নিনিও কী

এল নিনিও মূলত প্রশান্ত মহাসাগরের ক্রান্তীয় অঞ্চলে সমুদ্রপৃষ্ঠের পানির অস্বাভাবিক উষ্ণ হয়ে ওঠার একটি জলবায়ুগত পর্যায়। এর ফলে স্বাভাবিক বায়ুপ্রবাহ ও সমুদ্রের তাপমাত্রার ভারসাম্যে পরিবর্তন ঘটে। সাধারণত ২ থেকে ৭ বছর পরপর এল নিনিও দেখা দেয় এবং এটি ৯ থেকে ১২ মাস পর্যন্ত স্থায়ী হতে পারে।

তবে এবারের এল নিনিওকে আখ্যা দেওয়া হয়েছে ‘সুপার’ হিসেবে। এটি জলবায়ু চক্রের এমন শক্তিশালী ও তীব্র রূপ, যখন নিরক্ষীয় প্রশান্ত মহাসাগরীয় অঞ্চলে সমুদ্রপৃষ্ঠের গড় তাপমাত্রা স্বাভাবিকের তুলনায় ২ ডিগ্রি সেলসিয়াস বা তার বেশি বেড়ে যায়।

এর প্রভাবে খরা, তাপপ্রবাহ, অতিবৃষ্টি ও ঘূর্ণিঝড়ের কারণে ফসলের ব্যাপক ক্ষতি এবং খাদ্য উৎপাদনে নেতিবাচক প্রভাব পড়ার আশঙ্কা থাকে। পাশাপাশি অতিরিক্ত তাপমাত্রা ও জলবায়ুর চরম পরিবর্তনের ফলে জনজীবন ও স্বাস্থ্যের ওপরও মারাত্মক ঝুঁকি তৈরি হতে পারে।

বিশ্ব আবহাওয়া সংস্থার (ডব্লিউএমও) বরাতে বিবিসির প্রতিবেদনে বলা হয়, চলতি বছরের জুন মাসে সুপার এল নিনিও শুরু হয়। এটি আগামী নভেম্বর বা ডিসেম্বর থেকে প্রবল হয়ে ২০২৭ সালের ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত বজায় থাকতে পারে।

মোকাবিলায় কী ব্যবস্থা নিচ্ছে দেশগুলো

সুপার এল নিনিওর প্রভাবে মৃত্যু, বাস্তুচ্যুতি ও পরিবেশগত ক্ষতি কমাতে বিশ্বজুড়ে কী কী পদক্ষেপ নেওয়া হচ্ছে, তা নিয়ে বিভিন্ন দেশের সরকার ও বিজ্ঞানীদের সঙ্গে কথা বলেছে বিবিসি।

প্রত্যেক দেশই বলছে, পূর্ব সতর্কীকরণ ব্যবস্থা জোরদার করা হয়েছে এবং আগাম চিকিৎসা সহায়তা পাঠানোর প্রস্তুতি নেওয়া হয়েছে।

তারপরও এবারের প্রাকৃতিক দুর্যোগের ভয়াবহতা, বিশেষ করে ঝুঁকিপূর্ণ জনগোষ্ঠীর সুরক্ষা নিয়ে গভীর উদ্বেগ তৈরি করেছে। জাতিসংঘের অঙ্গপ্রতিষ্ঠান ডব্লিউএমও বলেছে, এল নিনিও সম্পর্কিত চরম আবহাওয়ার পূর্বাভাস যত সম্ভব বেশি মানুষের কাছে পৌঁছে দিতে তারা একটি ‘ব্যাপক সর্বাত্মক উদ্যোগ’ হাতে নিয়েছে।

প্রতিবেদনে বলা হচ্ছে, এরই মধ্যে প্রশান্ত মহাসাগরের তলদেশে তাপমাত্রা আরও অস্বাভাবিক রূপ নিয়েছে। কিছু এলাকায় তা স্বাভাবিকের চেয়ে ৮ ডিগ্রি সেলসিয়াসেরও বেশি বেড়েছে।

ভারত মহাসাগর, ক্রান্তীয় আটলান্টিক ও অস্ট্রেলিয়া উপকূলের আশপাশের এলাকাসহ বিশ্বের অন্যান্য অংশেও সমুদ্রের তাপমাত্রা স্বাভাবিকের চেয়ে অনেক বেশি থাকার আশঙ্কা করা হচ্ছে। বিশেষ করে সামুদ্রিক জীববৈচিত্র্যে সমৃদ্ধ হওয়ায় মহাসাগরের এই তাপমাত্রা বৃদ্ধি অস্ট্রেলিয়ার জন্য বিশেষ উদ্বেগের কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে।

অস্ট্রেলিয়ার বিজ্ঞান সংস্থার প্রধান গবেষক ড. অ্যালিস্টার হবডে বিবিসিকে বলেন, “এল নিনিও একটি প্রাকৃতিক ঘটনা হলেও এটি এমন চরম তাপপ্রবাহ নিয়ে আসে; যা প্রাকৃতিক বিপর্যয়গুলোকে ত্বরান্বিত করে।”

বিবিসি বলছে, অস্ট্রেলিয়া সম্প্রতি সামুদ্রিক সংকটের জন্য আগাম সতর্কীকরণ ব্যবস্থা চালু করেছে। এর মধ্যে মৎস্য খাতের জন্য আর্থিক সহায়তা নিশ্চিত করা, বিপন্ন প্রজাতিগুলোকে নিরাপদ স্থানে সরিয়ে নেওয়া এবং প্রবাল পর্যবেক্ষণ বাড়ানোর মতো উদ্যোগ রয়েছে।

এল নিনিওর মারাত্মক প্রভাবে দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়া, মধ্য আমেরিকা ও দক্ষিণ আমেরিকার উত্তরাঞ্চলের বড় একটি অংশজুড়ে স্বাভাবিকের চেয়ে অনেক শুষ্ক আবহাওয়ার পূর্বাভাস দেওয়া হয়েছে। এতে তীব্র খরা ও দাবানলের ঝুঁকি বাড়ছে। আবার বৃষ্টিপাত কমার পূর্বাভাসের কারণে পানামা খালের মধ্য দিয়ে জাহাজ চলাচলের সংখ্যা ১০ শতাংশের বেশি কমানো হচ্ছে।

চলতি শুষ্ক মৌসুমে ইন্দোনেশিয়া দেশজুড়ে বিভিন্ন স্থানে দাবানল নিয়ন্ত্রণে লড়াই করছে। এরই মধ্যে দাবানলে ১ লাখ ৭ হাজার হেক্টরের বেশি জমির ফসল ও গাছপালা পুড়ে গেছে। দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার অন্যান্য অংশের মতো ইন্দোনেশিয়াকেও এ বছর দীর্ঘমেয়াদি খরার মুখোমুখি হতে হচ্ছে বলে মনে করছেন বিশেষজ্ঞরা।

দেশটির সরকার বলেছে, দাবানলের আগুন নেভাতে কৃত্রিম বৃষ্টির জন্য ‘ক্লাউড সিডিং’ বিমান পাঠানো হচ্ছে। আগুন নিয়ন্ত্রণে প্রয়োজনীয় সম্পদের পর্যাপ্ত সরবরাহের প্রতিশ্রুতিও দিয়েছে তারা। একই সঙ্গে অবৈধভাবে জমি পরিষ্কারের জন্য আগুন লাগানোর অভিযোগে বহু মানুষকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে।

লাতিন আমেরিকার দেশ পেরুও এল নিনিওর কারণে বিশেষভাবে ঝুঁকিপূর্ণ। কারণ, দেশটির দীর্ঘ উপকূলীয় সীমান্ত পূর্ব প্রশান্ত মহাসাগরের সঙ্গে যুক্ত। ইকুয়েডর ও ব্রাজিলের কিছু অংশের পাশাপাশি পেরুর বিভিন্ন অঞ্চলে আগে থেকেই ভারী বৃষ্টিপাত দেখা গেছে। এতে হঠাৎ বন্যা ও ভূমিধসের সৃষ্টি হচ্ছে।

যুক্তরাষ্ট্র গত মাসের শেষের দিকে ঘোষণা করেছে, এল নিনিও আরও মারাত্মক রূপ নেওয়ার আগেই অতিরিক্ত চিকিৎসা সহায়তা ও প্রযুক্তিগত সরঞ্জাম সরবরাহ করতে পেরুর উপকূলে বিশেষ জাহাজ পাঠানো হচ্ছে।

শক্তিশালী ঘূর্ণিঝড় ও ভূমিধসের ঝুঁকি

চীনে এ বছরই অন্তত সাতটি টাইফুন বা ঘূর্ণিঝড় আঘাত হানতে পারে বলে সতর্ক করেছেন দেশটির বিশেষজ্ঞরা। এর সঙ্গে সুপার এল নিনিওর প্রভাবের সম্পর্ক রয়েছে বলেও মনে করছেন তারা।

এর আগে কেবল জুলাই মাসেই চীন ‘বাভি’, ‘নাউল’ ও ‘মেসাক’ নামে অন্তত তিনটি শক্তিশালী ঘূর্ণিঝড়ের মুখোমুখি হয়। এতে ডজনখানেক মানুষের মৃত্যু হয়েছিল। সেই ধাক্কা কাটতে না কাটতেই আগস্টে ঘূর্ণিঝড় ‘ডলফিন’-এর আঘাতে ভারী বৃষ্টি ও প্রচণ্ড ঝড়ো হাওয়ার কারণে চীনে ১০ লাখের বেশি মানুষ বাস্তুচ্যুত হয়।

একইভাবে পূর্ব আফ্রিকা, দক্ষিণ ব্রাজিল ও দক্ষিণ যুক্তরাষ্ট্রে স্বাভাবিকের চেয়ে বেশি বৃষ্টির আশঙ্কা করা হচ্ছে। এতে মারাত্মক বন্যার সম্ভাবনা বাড়ছে।

ডব্লিউএমও মহাসচিব সেলেস্তে সাওলো বলেন, “আমরা ইতিমধ্যেই খরা এবং বন্যার কারণে নানা ধরনের ধ্বংসলীলা দেখতে পাচ্ছি। এল নিনিও যত তীব্র হবে, এই প্রভাবগুলো তত বাড়বে বলেই আমাদের আশঙ্কা।”

আরও পড়ুন

প্লাস্টিক বর্জ্য ও দূষণ নিয়ন্ত্রণে সহযোগিতা বাড়াবে ইউএনডিপি

পরিবেশ, বন ও জলবায়ু পরিবর্তন মন্ত্রী আবদুল আউয়াল মিন্টুর সঙ্গে সাক্ষাৎ করেছেন বাংলাদেশে নিযুক্ত জাতিসংঘ উন্নয়ন কর্মসূচির (ইউএনডিপি) আবাসিক প্রতিনিধি স্টিফেন রড্রিকস। বৃহস্পতিবার (৮ অক্টোবর)...
জাতীয়
0
minutes

ওষুধ তৈরির গুরুত্বপূর্ণ গবেষণায় রসায়নে নোবেল পেলেন কাগান ও সোয়াই

২০২৬ সালের রসায়নে নোবেল পুরস্কার পেয়েছেন ফ্রান্সের বিজ্ঞানী হেনরি বি. কাগান ও জাপানের বিজ্ঞানী কেনসো সোয়াই। অসমমিত জৈব সংশ্লেষণে নন-লিনিয়ার প্রভাব ও অটোক্যাটালাইসিস আবিষ্কারের...
জাতীয়
0
minutes

লালবাগে ১৩ বাসে পরিবেশ অধিদপ্তরের অভিযান, জরিমানা ১০ হাজার ৯০০ টাকা

রাজধানীর লালবাগে পরিবেশ অধিদপ্তরের মোবাইল কোর্ট অভিযানে অতিরিক্ত গ্যাসীয় নিঃসরণ ও হাইড্রলিক হর্ন ব্যবহারের দায়ে ছয়টি মামলায় মোট ১০ হাজার ৯০০ টাকা জরিমানা আদায়...
জাতীয়
0
minutes

বাকৃবির গবেষণায় নতুন প্রযুক্তি: মিলবে পুষ্টিগুণসমৃদ্ধ ব্রয়লার মাংস

ব্রয়লার মুরগির উৎপাদনে অ্যান্টিবায়োটিক, কৃত্রিম মেডিসিন, ভিটামিন ও গ্রোথ প্রমোটরের ব্যবহার কমিয়ে উদ্ভিদভিত্তিক বিকল্প ব্যবহারের প্রযুক্তি উদ্ভাবন করেছেন বাংলাদেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের (বাকৃবি) একদল গবেষক।...
কৃষি, কৃষক ও নিরাপদ খাবার
0
minutes
spot_imgspot_img