একটি প্রাণীকে দেখে আমরা তার আকৃতি, রং, চলাফেরা কিংবা বাসস্থান সম্পর্কে ধারণা করতে পারি। কিন্তু একই রকম দেখতে দুটি প্রাণী যে আসলে আলাদা প্রজাতির, সেটি সব সময় চোখে ধরা পড়ে না। কখনো কখনো সেই পার্থক্য খুঁজে পেতে হয় প্রাণীর জিনগত নকশার গভীরে।
পেঙ্গুইনের ক্ষেত্রেও তেমনই ঘটেছে। ১৯২১ সালের পর থেকে বিজ্ঞানীরা নতুন কোনো পেঙ্গুইন প্রজাতিকে আনুষ্ঠানিকভাবে শনাক্ত করতে পারেননি। এক শতাব্দীরও বেশি সময় পর এবার জেন্টু পেঙ্গুইন নিয়ে গবেষণায় মিলেছে নতুন প্রজাতির সন্ধান।
নতুন শনাক্ত হওয়া প্রজাতিটির বৈজ্ঞানিক নাম পাইগোসেলিস কেরগুয়েলেনসিস। এর প্রচলিত নাম সাউথইস্টার্ন জেন্টু পেঙ্গুইন।
পুরোনো পরিচয়ের আড়ালে নতুন প্রজাতি
চমকপ্রদ বিষয় হলো, এটি এমন কোনো প্রাণী নয়, যাকে বিজ্ঞানীরা আগে কখনো দেখেননি। বরং বহুদিন ধরেই এই পেঙ্গুইনগুলোকে জেন্টু পেঙ্গুইনের একটি বিস্তৃত প্রজাতির অংশ হিসেবে বিবেচনা করা হতো।
সমস্যাটি ছিল তাদের বাহ্যিক চেহারায় নয়, বরং বিবর্তনীয় ইতিহাসে।
জেন্টু পেঙ্গুইনদের একটি একক প্রজাতি হিসেবে বিবেচনা করা হবে, নাকি তাদের মধ্যে থাকা জিনগত পার্থক্যের ভিত্তিতে একাধিক প্রজাতি আলাদা করা হবে, এ নিয়ে দীর্ঘদিন ধরেই বৈজ্ঞানিক বিতর্ক ছিল।
এই প্রশ্নের উত্তর খুঁজতেই চিলি ও ইউনিভার্সিটি অব ক্যালিফোর্নিয়া, বার্কলির গবেষকদের নেতৃত্বে একটি দল জেন্টু পেঙ্গুইনদের জিনগত বৈশিষ্ট্য বিশ্লেষণ করেন।
গবেষণায় ১০টি প্রজনন কলোনি থেকে ৬৪টি পেঙ্গুইনের সম্পূর্ণ জিনোম বিশ্লেষণ করা হয়। অর্থাৎ শুধু একটি বা কয়েকটি নির্দিষ্ট জিন নয়, পেঙ্গুইনগুলোর সম্পূর্ণ জিনগত তথ্যের সঙ্গে তুলনা করা হয়েছে।
জিনোম খুলে দিল প্রজাতির রহস্য
সম্পূর্ণ জিনোম বিশ্লেষণের মাধ্যমে গবেষকেরা দেখতে পান, জেন্টু পেঙ্গুইনদের বিভিন্ন গোষ্ঠীর মধ্যে এমন জিনগত পার্থক্য রয়েছে, যা তাদের আলাদা বিবর্তনীয় বংশধারা হিসেবে চিহ্নিত করার পক্ষে গুরুত্বপূর্ণ।
গবেষণার ফল অনুযায়ী, প্রচলিত একটি জেন্টু পেঙ্গুইন প্রজাতির ধারণার পরিবর্তে তাদের চারটি পৃথক প্রজাতি হিসেবে বিবেচনা করা উচিত।
এই চারটির একটি হলো নতুন শনাক্ত হওয়া পাইগোসেলিস কেরগুয়েলেনসিস।
এখানেই এই আবিষ্কারের বৈজ্ঞানিক গুরুত্ব। নতুন প্রজাতি বলতে সব সময় এমন কোনো প্রাণীকে বোঝায় না, যাকে মানুষ আগে কখনো দেখেনি। অনেক সময় পরিচিত একটি প্রাণীর মধ্যেই দীর্ঘদিন ধরে লুকিয়ে থাকে পৃথক একটি বিবর্তনীয় বংশধারা। আধুনিক জিনগত বিশ্লেষণ সেই অদৃশ্য সীমারেখাটি শনাক্ত করতে পারে।
বিচ্ছিন্ন দ্বীপে আলাদা হয়ে গেল বংশধারা
পাইগোসেলিস কেরগুয়েলেনসিসের আবাসস্থলও এর বিবর্তনীয় ইতিহাস বোঝার ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ।
প্রজাতিটির বাস ভারত মহাসাগরের দুর্গম কেরগুয়েলেন দ্বীপপুঞ্জে। অ্যান্টার্কটিকার প্রায় ১ হাজার ২০০ মাইল উত্তরে অবস্থিত এই দ্বীপগুলো মূল ভূখণ্ড ও অন্যান্য দ্বীপপুঞ্জ থেকে বেশ বিচ্ছিন্ন।
বিবর্তনবিজ্ঞানে ভৌগোলিক বিচ্ছিন্নতা একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। কোনো প্রাণীর একটি জনগোষ্ঠী দীর্ঘ সময় ধরে অন্য জনগোষ্ঠী থেকে আলাদা হয়ে থাকলে তাদের মধ্যে জিনের আদান-প্রদান কমে যেতে পারে। সময়ের সঙ্গে জমতে পারে জিনগত পার্থক্য। দীর্ঘ বিবর্তনীয় সময়ে সেই পার্থক্য এতটাই গভীর হতে পারে যে একই পূর্বপুরুষ থেকে আসা জনগোষ্ঠীগুলো পৃথক প্রজাতিতে পরিণত হয়।
কেরগুয়েলেন দ্বীপপুঞ্জের মতো বিচ্ছিন্ন পরিবেশ তাই এই পেঙ্গুইনদের আলাদা বিবর্তনীয় পরিচয় গড়ে ওঠার সম্ভাব্য একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রেক্ষাপট।
চোখের সামনে থেকেও অচেনা
এই আবিষ্কার প্রজাতি শনাক্তকরণের একটি গুরুত্বপূর্ণ দিকও সামনে আনে। প্রকৃতিতে কোনো প্রাণীর পরিচয় নির্ধারণে শুধু তার বাহ্যিক বৈশিষ্ট্য সব সময় যথেষ্ট নয়।
একই ধরনের দেখতে প্রাণীদের মধ্যে লুকিয়ে থাকতে পারে গভীর জিনগত পার্থক্য। আবার বিপরীতভাবে, বাহ্যিক পার্থক্য থাকলেও তারা একই প্রজাতির সদস্য হতে পারে।
এ কারণে আধুনিক জীববিজ্ঞানে শারীরিক বৈশিষ্ট্যের পাশাপাশি জিনগত তথ্যও প্রজাতি শনাক্তকরণের গুরুত্বপূর্ণ হাতিয়ার হয়ে উঠেছে।
এক শতাব্দীর বেশি সময় পর নতুন পেঙ্গুইন প্রজাতির এই শনাক্তকরণ তাই শুধু পেঙ্গুইনের তালিকায় একটি নতুন নাম যোগ হওয়ার ঘটনা নয়। এটি দেখিয়ে দেয়, পৃথিবীর পরিচিত প্রাণীদের মধ্যেও এখনো কত বিবর্তনীয় রহস্য লুকিয়ে থাকতে পারে।
একটি প্রাণীকে দেখতে আমাদের চোখ যথেষ্ট নয়। কখনো কখনো তার প্রকৃত পরিচয় খুঁজে পেতে হয় তার ডিএনএর ভেতর।






