বান্দরবানের লামা উপজেলার দুর্গম পাহাড়ে গাছ টানার কাজে ব্যবহার করা হচ্ছে হাতি। বছরের পর বছর শিকলে বেঁধে এসব হাতিকে দিয়ে টানানো হচ্ছে ভারী গাছ। সম্প্রতি উপজেলার বিভিন্ন দুর্গম এলাকায় এমন আটটি হাতির সন্ধান পাওয়ার কথা জানা গেছে।
এর মধ্যে লামা সদর ইউনিয়নের ঘিলাপাড়ায় একটি, দোছড়ি এলাকায় দুটি, চিউনী খালের আগায় একটি, রূপসীপাড়া ইউনিয়নের লামা খালের আগায় দুটি এবং সরই ইউনিয়নের লেমুপালং ও লুলাইং এলাকায় দুটি হাতি রয়েছে।
সদর ইউনিয়নের ঘিলাপাড়ায় থাকা হাতিটির নাম বাহাদুর। বয়স প্রায় ৩৮ বছর। মাহুতের ভাষ্য অনুযায়ী, ২৪ বছরের বেশি সময় ধরে গাছ টানার কাজে ব্যবহৃত হচ্ছে হাতিটি। পাহাড়ের দুর্গম পথে ভারী গাছ টেনে নেওয়ার পর কাজ শেষে আবার শিকলে বেঁধে রাখা হয় তাকে।
সম্প্রতি ঘিলাপাড়ায় গিয়ে দেখা যায়, বাহাদুরের পায়ে শিকল বাঁধা। সারাদিন কাজ করার পর খাবারের জন্য কিছু সময় তাকে ছেড়ে দেওয়া হয়। এ সময় আশপাশের লতাপাতা খেয়েই সময় কাটায় হাতিটি।
মাহুতের কাছ থেকে জানা যায়, গাছ টানার কাজে ব্যবহারের জন্য প্রতিদিন ৬ হাজার টাকা ভাড়ায় হাতিটিকে দেওয়া হয়। একেক দিন একেক জায়গায় নিয়ে যাওয়া হয় তাকে।
বাহাদুরের মাহুত সিফার বলেন, হাতিটির মালিকের বাড়ি সিলেটে। লামা উপজেলায় গাছ টানার কাজে ব্যবহৃত হাতিগুলো সিলেট বন বিভাগের অধীনে লাইসেন্স করা। তবে লামায় হাতিটি কীভাবে এসেছে, সে বিষয়ে তিনি কিছু জানেন না। এ বিষয়ে মালিকই বলতে পারবেন বলে জানান তিনি।
স্থানীয় বাসিন্দাদের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, শুধু বাহাদুর নয়, লামার বিভিন্ন দুর্গম এলাকায় আরও সাতটি হাতি দিয়ে গাছ টানানোর কাজ করা হচ্ছে। স্থানীয়দের অভিযোগ, এসব হাতিকে দীর্ঘ সময় শিকল দিয়ে বেঁধে রাখা হয়।
সদর ইউনিয়নের পোপা হেডম্যান পাড়ার এক বাসিন্দা নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, বড় গাছ টানার সময় মাঝেমধ্যে হাতি দুর্ঘটনার শিকার হয়। গত বছর তাঁদের পাড়ার কিছুটা ওপরে একটি হাতি পাহাড় থেকে পড়ে গুরুতর আহত হয়েছিল। পরে চিকিৎসা না পেয়ে কয়েক দিন পর হাতিটি মারা যায় বলে দাবি করেন তিনি।
স্থানীয়দের আরও অভিযোগ, বন থেকে গাছ কেটে হাতির মাধ্যমে সেগুলো বিভিন্ন স্থানে টেনে নেওয়া হচ্ছে। তাঁদের ভাষ্য, লামার বন থেকে শত শত মাতৃবৃক্ষ ও বনজ ঔষধি গাছ কেটে হাতি দিয়ে টেনে নামানো হয়েছে। পরে এসব গাছ লামা পৌরসভা, লামা ইউনিয়ন ও সরই ইউনিয়নের বিভিন্ন ডিপোতে নেওয়া হয়।
গাছ পরিবহনের জন্য পাহাড় কেটে এবং ঝিরির পানির প্রবাহ বন্ধ করে ৩০ কিলোমিটারের বেশি রাস্তা তৈরির অভিযোগও করেছেন স্থানীয়রা।
ফলে একদিকে বন থেকে গাছ কাটার অভিযোগ, অন্যদিকে সেসব গাছ পরিবহনে হাতিকে দীর্ঘ সময় ধরে শ্রমে ব্যবহারের বিষয়টি সামনে এসেছে। এতে বন উজাড়ের পাশাপাশি হাতিগুলোর কল্যাণ ও নিরাপত্তা নিয়েও প্রশ্ন উঠছে।
লামা বন বিভাগের বিভাগীয় বন কর্মকর্তা মোস্তাফজুর রহমান বলেন, দুই বছর আগে লামা সদর ইউনিয়ন থেকে একটি হাতি ও তার মাহুতকে আটক করা হয়েছিল। তাঁদের বিরুদ্ধে বিভাগীয় মামলা দিয়ে আদালতে তোলা হয়। পরে বন আদালতে নিয়মিত মামলা হলে হাতিটিকে চকরিয়ার ডুলহাজারা সাফারি পার্কে নিয়ে যাওয়া হয়েছিল।
মোস্তাফজুর রহমান বলেন, যেসব এলাকায় হাতি থাকার তথ্য পাওয়া গেছে, সেসব জায়গায় শিগগিরই অভিযান চালানো হবে।
সূত্র: পাহাড় সমুদ্র






