পৃথিবীর মানচিত্র খুললে আমরা সাধারণত সাতটি মহাদেশের নামই দেখি- এশিয়া, আফ্রিকা, ইউরোপ, উত্তর আমেরিকা, দক্ষিণ আমেরিকা, অ্যান্টার্কটিকা ও অস্ট্রেলিয়া। কিন্তু ভূতাত্ত্বিকদের গবেষণা বলছে, এই তালিকায় আরও একটি মহাদেশের নাম যুক্ত করা যায় যেটা জেল্যান্ডিয়া (Zealandia)।
প্রায় ৫০ লাখ বর্গকিলোমিটার আয়তনের এই বিশাল মহাদেশীয় ভূখণ্ড দক্ষিণ-পশ্চিম প্রশান্ত মহাসাগরের তলদেশে ডুবে আছে। এর প্রায় ৯৪ শতাংশই সমুদ্রের নিচে। সমুদ্রপৃষ্ঠের ওপরে থাকা অংশের মধ্যে সবচেয়ে পরিচিত হলো নিউজিল্যান্ড ও নিউ ক্যালেডোনিয়া।
কেন জেল্যান্ডিয়াকে মহাদেশ বলা হচ্ছে?
সমুদ্রের নিচে অবস্থান করলেও জেল্যান্ডিয়ার ভূতাত্ত্বিক বৈশিষ্ট্য একে সাধারণ মহাসাগরীয় ভূত্বক থেকে আলাদা করে। এর শিলা, ভূত্বকের গঠন, পুরুত্ব ও বিস্তৃতি, সব মিলিয়ে এটি একটি স্বতন্ত্র মহাদেশীয় ভূখণ্ডের বৈশিষ্ট্য বহন করে।
তবে জেল্যান্ডিয়াকে মহাদেশ হিসেবে স্বীকৃতি দেওয়া নিয়ে দীর্ঘদিন ধরে বৈজ্ঞানিক বিতর্ক ছিল। কারণ প্রচলিত ধারণায় একটি মহাদেশকে দৃশ্যমান স্থলভাগ হিসেবে কল্পনা করা হয়। কিন্তু ভূতত্ত্বের দৃষ্টিতে কোনো ভূখণ্ডের মহাদেশীয় পরিচয় নির্ধারণে শুধু সেটি সমুদ্রের ওপরে আছে কি না, সেটিই একমাত্র বিষয় নয়।
২০১৭ সালে একদল ভূতাত্ত্বিক গবেষক জেল্যান্ডিয়াকে পৃথক মহাদেশ হিসেবে বিবেচনার পক্ষে শক্তিশালী বৈজ্ঞানিক যুক্তি তুলে ধরেন। গবেষণাটি প্রকাশের পর বিশ্বের বৈজ্ঞানিক মহলে জেল্যান্ডিয়াকে ‘অষ্টম মহাদেশ’ হিসেবে দেখার আলোচনা আরও জোরালো হয়।
সমুদ্রতলের নিচে তৈরি হয়েছে ভূতাত্ত্বিক মানচিত্র
জেল্যান্ডিয়ার অস্তিত্ব শুধু তাত্ত্বিক ধারণা নয়। সমুদ্রতল থেকে সংগ্রহ করা শিলার নমুনা, ভূকম্পনসংক্রান্ত তথ্য এবং চৌম্বকীয় জরিপসহ বিভিন্ন বৈজ্ঞানিক তথ্য বিশ্লেষণ করে গবেষকেরা এই বিশাল ভূখণ্ডের ভূতাত্ত্বিক কাঠামো সম্পর্কে বিস্তারিত ধারণা পেয়েছেন।
২০২৩ সালে গবেষকেরা জেল্যান্ডিয়ার ভূতাত্ত্বিক কাঠামো ও শিলার বৈশিষ্ট্য নিয়ে আরও বিস্তৃত গবেষণা প্রকাশ করেন। এর ফলে সমুদ্রের নিচে ডুবে থাকা এই মহাদেশের অতীত ও গঠন সম্পর্কে বিজ্ঞানীদের ধারণা আরও স্পষ্ট হয়।
একসময় জেল্যান্ডিয়া ছিল স্থলভাগ
আজকের জেল্যান্ডিয়া একসময় সমুদ্রের নিচে ছিল না। প্রায় ৮ কোটি ৩০ লাখ থেকে ৭ কোটি ৯০ লাখ বছর আগে প্রাচীন সুপারমহাদেশ গন্ডোয়ানা (Gondwana) থেকে জেল্যান্ডিয়া বিচ্ছিন্ন হতে শুরু করে।
ভূতাত্ত্বিক পরিবর্তনের দীর্ঘ প্রক্রিয়ায় ভূখণ্ডটি প্রসারিত ও পাতলা হয়ে যায়। এর ফলে মহাদেশীয় ভূত্বকের একটি বড় অংশ ধীরে ধীরে সমুদ্রপৃষ্ঠের নিচে চলে যায়। তবে ভূখণ্ডটি পুরোপুরি হারিয়ে যায়নি, সমুদ্রের নিচে আজও তার বিশাল অংশ অক্ষত রয়েছে।
পৃথিবীর মানচিত্রের অদৃশ্য অধ্যায়
জেল্যান্ডিয়ার গল্প আমাদের পৃথিবী সম্পর্কে প্রচলিত ধারণাকেও নতুন করে ভাবতে বাধ্য করে। আমরা যে মানচিত্র দেখি, তা মূলত সমুদ্রপৃষ্ঠের ওপরে থাকা পৃথিবীকে দেখায়। কিন্তু পৃথিবীর ভূতাত্ত্বিক বাস্তবতা তার চেয়ে অনেক বেশি বিস্তৃত।
সমুদ্রের গভীরে প্রায় ৫০ লাখ বর্গকিলোমিটারজুড়ে ছড়িয়ে থাকা জেল্যান্ডিয়া যেন সেই অদৃশ্য পৃথিবীরই একটি উদাহরণ।
নিউজিল্যান্ডের মতো কয়েকটি ভূখণ্ড তার সামান্য অংশকে দৃশ্যমান করে রেখেছে। আর বাকি বিশাল অংশ পড়ে আছে প্রশান্ত মহাসাগরের গভীরে- নীরবে, অদৃশ্য অবস্থায়।
পৃথিবীর মানচিত্রে যা দেখা যায়, সেটিই যে পৃথিবীর পুরো গল্প নয়, জেল্যান্ডিয়া তার অন্যতম বিস্ময়কর প্রমাণ।
সূত্র: দর্পণ






