PFAS-এর দূষণ: প্রকৃতির বুকে মানুষের তৈরি দীর্ঘস্থায়ী বিপদ

আধুনিক জীবনকে সহজ করতে তৈরি হয়েছে অসংখ্য কৃত্রিম রাসায়নিক। এর মধ্যে কিছু রাসায়নিক পরিবেশে সহজে ভাঙে না, বছরের পর বছর টিকে থাকে এবং পানি, খাদ্য ও দৈনন্দিন ব্যবহারের পণ্যের মাধ্যমে মানুষের শরীরে প্রবেশ করতে পারে। এ ধরনের রাসায়নিকের একটি বড় পরিবার হলো PFAS: Per- and Polyfluoroalkyl Substances, যা পরিচিত ‘ফরএভার কেমিক্যাল’ বা চিরস্থায়ী রাসায়নিক নামে।

ননস্টিক রান্নার পাত্র, পানি প্রতিরোধী পোশাক, দাগ প্রতিরোধী কার্পেট, কিছু প্রসাধনী, খাদ্য মোড়ানোর উপকরণ ও অগ্নিনির্বাপণ ফোমে বিভিন্ন ধরনের PFAS ব্যবহৃত হয়েছে। এসব রাসায়নিকের কিছু যৌগের কার্বন-ফ্লোরিন বন্ধন অত্যন্ত শক্তিশালী। ফলে প্রাকৃতিক পরিবেশে সেগুলো সহজে ভাঙে না। কিছু PFAS মানুষের শরীরেও দীর্ঘদিন অবস্থান করতে পারে।

দুই কোম্পানির বিতর্কিত ইতিহাস

PFAS নিয়ে আলোচনায় যুক্তরাষ্ট্রের দুটি প্রতিষ্ঠান- 3M ও DuPont-এর নাম বারবার উঠে আসে। এসব প্রতিষ্ঠানের তৈরি কিছু রাসায়নিকের ব্যবহার, পরিবেশদূষণ এবং সম্ভাব্য স্বাস্থ্যঝুঁকি নিয়ে দীর্ঘদিন ধরে গবেষণা ও আইনি লড়াই চলছে। বিশেষ করে DuPont-এর Washington Works কারখানার আশপাশে PFOA-দূষিত পানির ঘটনা ব্যাপক আলোচনার জন্ম দেয়।

তবে PFAS দূষণের জন্য শুধু দুটি কোম্পানিকে দায়ী করা যথাযথ নয়। এই রাসায়নিক পরিবারের সদস্য কয়েক হাজার এবং বিভিন্ন সময়ে বহু প্রতিষ্ঠান এগুলো উৎপাদন ও ব্যবহার করেছে। তাই সংকটটি বুঝতে হলে সামগ্রিক শিল্পব্যবস্থা, রাসায়নিকের ব্যবহার এবং বর্জ্য ব্যবস্থাপনার দিকে নজর দিতে হবে।

বাংলাদেশের নদীতেও মিলেছে ‘ফরএভার কেমিক্যাল’

PFAS দূষণ বাংলাদেশের জন্য কোনো দূরবর্তী দেশের সমস্যা নয়। দেশের নদী ও উপকূলীয় পরিবেশে এসব রাসায়নিকের উপস্থিতি নিয়ে ইতিমধ্যে গবেষণা হয়েছে। অর্থাৎ, মানুষের স্বাস্থ্যঝুঁকি নিয়ে চূড়ান্ত সিদ্ধান্তে পৌঁছানোর আগেই পরিবেশদূষণের বাস্তব প্রমাণকে গুরুত্ব দিতে হবে।

২০২৫ সালের ১৫ আগস্ট প্রকাশিত একটি গবেষণায় ঢাকার বুড়িগঙ্গা, তুরাগ ও শীতলক্ষ্যা নদীর পানি ও তলানিতে ১৫ ধরনের PFAS পরীক্ষা করা হয়। গবেষণায় তিনটি নদীর সব নমুনায় পরীক্ষাধীন রাসায়নিকগুলো শনাক্ত হয়। পানিতে মোট PFAS-এর ঘনত্ব ছিল প্রতি লিটারে ২৩.৯৬ থেকে ৮৯.৩৫ ন্যানোগ্রাম। তলানির নমুনাতেও এসব রাসায়নিক পাওয়া যায়। গবেষকেরা বুড়িগঙ্গায় তুলনামূলক বেশি দূষণ শনাক্ত করেন এবং শিল্পবর্জ্য নিয়ন্ত্রণ ও দীর্ঘমেয়াদি পর্যবেক্ষণের ওপর গুরুত্ব দেন।

এর আগেও বাংলাদেশের উপকূলীয় পানিতে ও তলানিতে PFAS শনাক্ত হয়েছিল। ২০১৬ সালে প্রকাশিত একটি গবেষণায় চট্টগ্রাম ও কক্সবাজার উপকূলে তুলনামূলক বেশি দূষণের প্রমাণ পাওয়া যায়। শিল্পবর্জ্য, পৌরবর্জ্য, জাহাজভাঙা কার্যক্রম ও বন্দরসংশ্লিষ্ট কর্মকাণ্ডকে সম্ভাব্য উৎস হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছিল।

তৈরি পোশাকশিল্পের আশপাশের পানিও উদ্বেগের কারণ। ESDO ও আন্তর্জাতিক পরিবেশবাদী নেটওয়ার্ক IPEN-এর গবেষণার ভিত্তিতে ২০২৪ সালে প্রকাশিত প্রতিবেদনে ঢাকার পোশাক কারখানার কাছাকাছি নদী, লেক ও কলের পানির ২৭টি নমুনায় PFAS শনাক্ত হওয়ার কথা জানানো হয়। নমুনার ৬৭ শতাংশে অন্তত একটি আন্তর্জাতিকভাবে নিষিদ্ধ PFAS পাওয়া গিয়েছিল। কর্ণতলী নদীর একটি নমুনায় বিশেষভাবে উচ্চ মাত্রা শনাক্ত হয়। তবে এই নমুনাগুলো নির্দিষ্ট এলাকার; এগুলো দিয়ে পুরো বাংলাদেশের পানির অবস্থা নির্ধারণ করা যাবে না।

এই তথ্যগুলো একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন সামনে আনে: শিল্পোন্নয়ন ও রপ্তানি আয়ের পাশাপাশি পরিবেশের যে মূল্য দিতে হচ্ছে, তার হিসাব কে রাখছে? নদীর পানি কৃষি, মাছ, জীববৈচিত্র্য এবং মানুষের জীবনযাত্রার সঙ্গে সরাসরি যুক্ত। ফলে নদীতে দীর্ঘস্থায়ী রাসায়নিক জমা হওয়া শুধু পরিবেশের সমস্যা নয়; এটি জনস্বাস্থ্য ও ভবিষ্যৎ প্রজন্মের নিরাপত্তার প্রশ্নও।

মানুষের শরীরে কী প্রভাব ফেলতে পারে?

বিভিন্ন গবেষণায় নির্দিষ্ট কিছু PFAS-এর সংস্পর্শের সঙ্গে কোলেস্টেরল বৃদ্ধি, রোগপ্রতিরোধ ব্যবস্থার কিছু কার্যক্রমে পরিবর্তন এবং কিডনি ও অণ্ডকোষের ক্যানসারের ঝুঁকির সম্পর্ক পাওয়া গেছে। প্রজনন ও ভ্রূণের বিকাশের ওপর সম্ভাব্য প্রভাব নিয়েও গবেষণা চলছে।

তবে বাংলাদেশে সাধারণ মানুষের রক্তে PFAS-এর উপস্থিতি ও মাত্রা নির্ধারণে জাতীয় পর্যায়ের পর্যাপ্ত তথ্য নেই। নদীর পানিতে রাসায়নিক শনাক্ত হওয়া আর মানুষের রক্তে তার মাত্রা নির্ধারণ এক বিষয় নয়। তাই মানুষের শরীরে কতটা PFAS প্রবেশ করছে এবং তার স্বাস্থ্যগত প্রভাব কী, তা জানতে পৃথক ও বিস্তৃত গবেষণা প্রয়োজন।

বাংলাদেশের এখনই কী করা প্রয়োজন?

বাংলাদেশের জন্য সবচেয়ে জরুরি কাজ হলো PFAS দূষণকে নিয়মিত পরিবেশ পর্যবেক্ষণের আওতায় আনা। শিল্পাঞ্চল, নদী, ভূগর্ভস্থ পানি, পানীয় জলের উৎস, মাছ ও অন্যান্য খাদ্যপণ্যে ঝুঁকিভিত্তিক পরীক্ষা চালাতে হবে। পাশাপাশি মানুষের শরীরে এসব রাসায়নিকের উপস্থিতি ও স্বাস্থ্যগত প্রভাব নিরূপণে গবেষণা বাড়ানো প্রয়োজন।

২০২৫ সালের গবেষণায় উল্লেখ করা হয়েছে, বাংলাদেশে PFAS নিয়ন্ত্রণে নির্দিষ্ট জাতীয় বিধিবিধানের ঘাটতি রয়েছে। বাংলাদেশ আন্তর্জাতিক স্টকহোম কনভেনশনের অধীনে নির্দিষ্ট কিছু PFAS নিয়ন্ত্রণের অঙ্গীকার করলেও উৎপাদন, ব্যবহার ও বর্জ্য ব্যবস্থাপনার সব দিক নিয়ে কার্যকর জাতীয় কাঠামো প্রয়োজন।

সরকারের পরিবেশ অধিদপ্তর, সংশ্লিষ্ট গবেষণাপ্রতিষ্ঠান ও শিল্প নিয়ন্ত্রক সংস্থাগুলোর সমন্বয়ে নিয়মিত পরীক্ষা, দূষণের উৎস শনাক্তকরণ এবং ফলাফল জনসমক্ষে প্রকাশ করা জরুরি। যেসব শিল্পে PFAS ব্যবহারের আশঙ্কা রয়েছে, সেখানে বর্জ্য পরিশোধন ও রাসায়নিক ব্যবহারের স্বচ্ছতা নিশ্চিত করতে হবে। দূষণ শনাক্ত হলে দায় নির্ধারণ ও প্রতিকারের ব্যবস্থাও থাকতে হবে।

উন্নয়নের মূল্য যেন না হয় মানুষের স্বাস্থ্য

‘ফরএভার কেমিক্যাল’ সংকট আমাদের মনে করিয়ে দেয়, কোনো রাসায়নিকের তাৎক্ষণিক সুবিধার পাশাপাশি তার দীর্ঘমেয়াদি পরিবেশগত মূল্যও বিবেচনা করা জরুরি। বাংলাদেশের নদীতে PFAS শনাক্ত হওয়ার গবেষণাগুলো সতর্কবার্তা দিচ্ছে, এখনই নিয়মিত নজরদারি ও কার্যকর নিয়ন্ত্রণ জোরদার না করলে ভবিষ্যতে সমস্যার ব্যাপ্তি নিরূপণ ও মোকাবিলা আরও কঠিন হতে পারে।

আমাদের নদী শুধু পানি বহন করে না; বহন করে খাদ্য, জীববৈচিত্র্য ও মানুষের জীবন। সেই নদীতে দীর্ঘস্থায়ী রাসায়নিক জমতে থাকলে তার ঝুঁকি উপেক্ষা করার সুযোগ নেই। উন্নয়ন যেমন প্রয়োজন, তেমনি প্রয়োজন মানুষের স্বাস্থ্য ও প্রকৃতিকে সুরক্ষিত রাখা।

আরও পড়ুন

কালো ধোঁয়া নিয়ন্ত্রণে রাজধানীতে অভিযান, জরিমানা ৯ হাজার টাকা

রাজধানীর আজিমপুরে নির্ধারিত মাত্রার চেয়ে বেশি কালো ধোঁয়া নির্গমনের দায়ে পাঁচটি যানবাহনকে মোট ৯ হাজার টাকা জরিমানা করেছে পরিবেশ অধিদপ্তর। বৃহস্পতিবার (১৫ অক্টোবর) পরিবেশ অধিদপ্তরের...
দূষণ ও দখল
0
minutes

নদী দখল-দূষণমুক্ত করতে কঠোর পদক্ষেপ নেওয়া হচ্ছে: প্রতিমন্ত্রী

নদী, খাল ও জলাশয় খননের পর পুনরায় দখল ও ভরাট ঠেকাতে বিশেষ টাস্কফোর্স গঠন করেছে পানিসম্পদ মন্ত্রণালয়। টাস্কফোর্সের সদস্যরা প্রতি ১৫ দিন পরপর প্রকল্প...
দূষণ ও দখল
0
minutes

বায়ুদূষণ রোধে আজিমপুরে পরিবেশ অধিদপ্তরের অভিযান, জরিমানা ১২ হাজার টাকা

রাজধানীর আজিমপুরে নির্ধারিত মাত্রার চেয়ে বেশি কালো ধোঁয়া নির্গমনের দায়ে ছয়টি ডিজেলচালিত যানবাহনকে মোট ১২ হাজার টাকা জরিমানা করেছে পরিবেশ অধিদপ্তর। সোমবার (১২ অক্টোবর) পরিবেশ...
দূষণ ও দখল
0
minutes

হাতির শোক: মৃত শাবককে বয়ে বেড়ায় হাতিটি, যে ছবি নাড়া দিয়েছে...

নামিবিয়ার শুষ্ক মরুভূমির একটি নদীখাত ধরে এগিয়ে যাচ্ছিল একদল হাতি। তাদের অনুসরণ করছিলেন বন্য প্রাণীর আলোকচিত্রী ফেদেরিকো ভেরোনেসি। ২০২৫ সালের সেপ্টেম্বরের একদিন তাঁর চোখে...
প্রকৃতি ও জীববৈচিত্র্য
0
minutes
spot_imgspot_img