যেদিকে চোখ যায়, বিস্তীর্ণ মাঠজুড়ে সবুজের মায়া। কোথাও কোথাও পাকার অপেক্ষায় হলুদ-সোনালি রঙের ছোপ। এই সময়টাই কৃষকের চোখে থাকে বড় স্বপ্ন– আর সবচেয়ে বেশি ভয়ও। দিনশেষে মাঠের ফসল ঘরে তুলতে পারলেই স্বস্তি। তবে সেই ফসল নিয়ে কৃষক এখন তাকিয়ে আছেন আকাশ পানে।
হাওরাঞ্চলে এই ভয়টা একটু আলাদা। পানি নিয়ে তাদের অভ্যস্ততা আছে, কিন্তু এখন ভয় ‘পাথর’ নিয়ে। স্থানীয় ভাষায় শিলাবৃষ্টিকে বলা হয় ‘পাথর’। আকাশে মেঘ জমলেই তাই বুক কেঁপে ওঠে কৃষকের– এই বুঝি নেমে এলো ধ্বংস।
বাংলাদেশের কৃষির সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ সময় চলছে এখন। মাঠে দাঁড়িয়ে আছে বোরো ধান, রবি ফসলের উৎপাদনও ভালো, সামনে আসছে আম, লিচু ও কাঁঠালের মৌসুম। অথচ এই শুভ সময়েই একের পর এক প্রাকৃতিক দুর্যোগ আর ব্যবস্থাপনার দুর্বলতায় তৈরি হয়েছে বড় সংকট।
হাওরের ওপর ঝুলছে আগাম বন্যার শঙ্কা
সিলেট অঞ্চলের হাওরগুলোতে এখন সবচেয়ে বড় দুশ্চিন্তা পাহাড়ি ঢল। সাম্প্রতিক ভারী বৃষ্টিপাত এবং আগামী দিনগুলোতেও বৃষ্টি অব্যাহত থাকার পূর্বাভাসে কৃষকরা দিন গুনছেন আতঙ্কে। সুনামগঞ্জ, সিলেট, হবিগঞ্জ, মৌলভীবাজার, নেত্রকোনা, কিশোরগঞ্জ ও ব্রাহ্মণবাড়িয়া– এই সাতটি হাওর জেলায় দেশের মোট বোরো উৎপাদনের প্রায় ২০ শতাংশ হয়। চলতি মৌসুমে প্রায় ৯ লাখ ৬৩ হাজার হেক্টর জমিতে ধান চাষ হয়েছে। তবে সমস্যা হলো, ফসল এখনও পুরোপুরি পাকেনি। এর মধ্যেই মার্চে অস্বাভাবিক বৃষ্টিপাত শুরু হয়েছে। বিশ্লেষকরা বলছেন, এই আগাম বৃষ্টি আকস্মিক বন্যার ঝুঁকি অনেক বাড়িয়ে দিয়েছে।
বন্যা পূর্বাভাস ও সতর্কীকরণ কেন্দ্র জানিয়েছে, সুরমা-কুশিয়ারা ও ধনু-বাউলাই নদীর পানি বাড়ছে। যদিও এখনও বিপৎসীমার নিচে। তবে আরও বৃষ্টি হলে পরিস্থিতি দ্রুত বদলে যেতে পারে। প্রতিবছরের মতো এবারও ভারতের মেঘালয় ও আসাম থেকে নামা পাহাড়ি ঢল হাওর অঞ্চলের জন্য বড় হুমকি হয়ে উঠছে।
হাওরের কৃষকদের জন্য সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ প্রতিরক্ষা হলো ফসল রক্ষা বাঁধ। তবে সেই বাঁধ নির্মাণের কাজ এবারও নির্ধারিত সময়ের মধ্যে শেষ হয়নি। ফেব্রুয়ারির মধ্যে কাজ শেষ হওয়ার কথা থাকলেও অনেক এলাকায় এখনও দুরমুশ, স্লোপ কমপেকশন ও ঘাস লাগানোর কাজ বাকি। বৃষ্টি শুরু হয়ে যাওয়ায় এখন এই কাজ শেষ হলেও তার কার্যকারিতা নিয়ে সন্দেহ দেখা দিয়েছে।
স্থানীয়দের অভিযোগ, প্রতিবছরের মতো এবারও দেরি, অনিয়ম আর তদারকির অভাব রয়েছে। সুনামগঞ্জের তাহিরপুরের কৃষক আব্দুল মোতালেব বলেন, বাঁধের কাজ শেষ হওয়ার আগেই বৃষ্টি শুরু হয়ে গেছে। আগাম বন্যা এলে সব শেষ হয়ে যাবে।
হাওর বাঁচাও আন্দোলনের নেতা বিজন সেন রায় বলেন, বাঁধ নির্মাণে প্রতিবছরই দেরি হয়, এ বছরও এর ব্যতিক্রম নয়। অবহেলার কারণে যদি ফসল তলিয়ে যায়, তবে আমরা কৃষকদের নিয়ে প্রতিবাদ গড়ে তুলব, আইনি ব্যবস্থাও নেব।
বাংলাদেশ পানি উন্নয়ন বোর্ড জানিয়েছে, ৫৩টি হাওরে প্রায় ৬০২ কিলোমিটার বাঁধ নির্মাণে ১৪৮ কোটি টাকা বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে। তবে মাঠপর্যায়ের বাস্তবতা সেই বরাদ্দের কার্যকারিতা নিয়ে প্রশ্ন তুলছে। ২০১৭ ও ২০২২ সালের বিধ্বংসী বন্যার স্মৃতি এখনও তাজা। সেই অভিজ্ঞতা থেকেই কৃষকের ভয় আরও বেশি।
শিলাবৃষ্টির আঘাতে দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে ক্ষতি
হাওরের বাইরে দেশের বিভিন্ন জেলাতেও শিলাবৃষ্টি ভয়াবহ ক্ষতি ডেকে এনেছে। গাইবান্ধার সুন্দরগঞ্জে শিলাবৃষ্টিতে ভুট্টা, মরিচ, বেগুনসহ বিভিন্ন ফসল মাটিতে লুটিয়ে পড়েছে। আম ও লিচুর মুকুল ঝরে গেছে। ভুট্টাচাষি শাহজাহান মিয়া বলেন, বৃষ্টি শুরু হওয়ার আধাঘণ্টা আগেও আকাশ পরিষ্কার ছিল। হঠাৎ শিলা পড়তে শুরু করল। জমিতে গিয়ে দেখি প্রায় সব গাছ পড়ে গেছে।
একদিনেই প্রায় তিন হাজার ৮৬৪ হেক্টর বোরোধান ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। সবচেয়ে বেশি ক্ষতি হয়েছে কিশোরগঞ্জের মিঠামইনে–প্রায় দুই হাজার ৫০০ হেক্টর জমিতে। অনেক জায়গায় শিলার আঘাতে জমি সাদা হয়ে গেছে– যেন বরফে ঢেকে আছে। এখানে বড় আকারের শিলায় গম, ভুট্টা, আলু, পেঁয়াজসহ নানা ফসল ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। কৃষকরা বলছেন, এবারের শিলার আকার আগের তুলনায় অনেক বড়। এক কৃষক জানান, প্রতি বিঘায় ৩৫-৪০ হাজার টাকা খরচ করেছি। এখন সব শেষ। ঋণ শোধ করতে পারব না। কালবৈশাখী ও বৃষ্টিতে জেলার সাত উপজেলার অন্তত এক হাজার ১৬৫ কৃষক পরিবার ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। প্রায় ২৩৬ হেক্টর জমির ফসল আক্রান্ত হয়েছে।
সুনামগঞ্জের হাওরাঞ্চলে শিলাবৃষ্টির সঙ্গে জলাবদ্ধতাও যুক্ত হয়েছে। পানি নিষ্কাশনের ব্যবস্থা দুর্বল থাকায় বৃষ্টির পানি জমে ফসলি জমি ডুবে যাচ্ছে। এতে ধান পচে যাওয়ার শঙ্কা দেখা দিয়েছে। জেলা কৃষি বিভাগের তথ্য অনুযায়ী, এ বছর দুই লাখ ২৩ হাজার হেক্টর জমিতে বোরো চাষ হয়েছে। সম্ভাব্য উৎপাদন ১৪ লাখ টন, যার বাজারমূল্য প্রায় পাঁচ হাজার ৫০ কোটি টাকা। এই বিপুল উৎপাদন এখন ঝুঁকির মুখে। কৃষক আলাউদ্দিন বলেন, ধান নষ্ট হচ্ছে, আমরা দুশ্চিন্তায় আছি। আরেক কৃষক আবিদ মিয়ার অভিযোগ, কৃষি বিভাগের কেউ মাঠে আসেনি, পানি নামানোর ব্যবস্থা নেই।
কৃষি বিভাগ বলছে, ক্ষয়ক্ষতির হিসাব করার পাশাপাশি কৃষকদের পরামর্শ দেওয়া হচ্ছে। ক্ষতিগ্রস্তদের তালিকা তৈরি করে প্রণোদনা দেওয়ার প্রস্তুতিও চলছে।
কৃষি সচিব রফিকুল ই মোহামেদ বলেন, ফসলের তিন মৌসুমে ক্ষতি হলে সরকারের পক্ষ থেকে প্রণোদনা, পুনর্বাসনসহ নানা উদ্যোগ নেওয়া হয়। শিলাবৃষ্টির কারণে মাঠের ফসলের কী পরিমাণ ক্ষতি হয়েছে, তা নিরূপণের কাজ চলছে। কাজটা শেষ হলে ক্ষতির পরিমাণ জানা যাবে।
আবহাওয়া অধিদপ্তরের পরিচালক মো. মমিনুল ইসলাম বলেন, প্রতিবছর ১৫ মার্চ থেকে ১৫ অক্টোবর পর্যন্ত প্রায় সাত মাস সময়কে উপকূলীয় অঞ্চলের জন্য ঝুঁকিপূর্ণ সময় হিসেবে বিবেচনা
করা হয়। উপকূলের ভাষায়, একে বলা হয় ‘বিপদসংকুল সময়’ বা ‘ডেঞ্জার পিরিয়ড’। এ সময় আবহাওয়া ও ভৌগোলিক বিভিন্ন কারণে উপকূলজুড়ে ঘূর্ণিঝড়, জলোচ্ছ্বাস, কালবৈশাখী, অতিবৃষ্টি, বেড়িবাঁধ ভাঙন এবং লবণাক্ততার মতো নানা দুর্যোগের শঙ্কা থাকে বলেই এ সময়টা তাদের জন্য বিপৎকাল। ফলে এই সাত মাস উপকূলবাসীকে থাকতে হয় বাড়তি সতর্কতায়। ডেঞ্জার পিরিয়ডের শুরুতেই উপকূলীয় এলাকায় আসে কালবৈশাখীর ঝাপটা। সাধারণত ১৫ মার্চ থেকে মে মাসের মাঝামাঝি পর্যন্ত এই ঝড়ের শঙ্কা বেশি থাকে। হঠাৎ সৃষ্ট তীব্র বজ্রঝড়, দমকা হাওয়া ও বজ্রপাত এ সময় উপকূলীয় অঞ্চলে বড় ধরনের ঝুঁকি তৈরি করে।






