রফিকুল ইসলাম, পটুয়াখালী
সমুদ্রের নোনা হাওয়া, সূর্যোদয়-সূর্যাস্তের মনোমুগ্ধকর দৃশ্য আর পর্যটকদের ভিড়, সব মিলিয়ে কুয়াকাটা সৈকত বরাবরই পর্যটকদের কাছে আকর্ষণীয়। সেই আনন্দঘন পরিবেশেই দেখা যায় ঘোড়ার পিঠে চড়ে বেড়ানোর দৃশ্য, যা অনেকের কাছে বিনোদনের অংশ। তবে এই আনন্দের আড়ালেই লুকিয়ে রয়েছে এক মর্মান্তিক বাস্তবতা।
সোমবার বিকেলে সৈকতে ঘটে যাওয়া একটি ঘটনা সেই চিত্রই সামনে নিয়ে আসে। একটি ঘোড়ার পিঠে চড়তে গিয়ে হঠাৎ ছিটকে পড়ে এক পর্যটক। ঘটনাটি দেখে আশপাশের লোকজন এগিয়ে এসে ঘোড়াটির অবস্থা খতিয়ে দেখেন। তখনই প্রকাশ পায় ভয়াবহ সত্য।
ঘোড়াটির পিঠে ছিল গভীর ক্ষত, যা একটি কম্বলের নিচে লুকানো ছিল। ক্ষত ঢাকতে ব্যবহার করা হয়েছিল শক্ত স্টিলের প্যাড, যাতে বাইরে থেকে স্বাভাবিক মনে হয়। কিন্তু প্রতিবার কোনো পর্যটক উঠলেই সেই ক্ষতস্থানে তীব্র চাপ পড়ে অসহনীয় যন্ত্রণা সৃষ্টি হচ্ছিল।
প্রত্যক্ষদর্শীরা জানান, এটি কোনো সাধারণ অবহেলা নয়, বরং স্পষ্ট প্রাণী নির্যাতনের উদাহরণ। আহত অবস্থায়ও ঘোড়াটিকে পর্যটকদের বিনোদনের জন্য ব্যবহার করা হচ্ছিল না ছিল চিকিৎসা, না ছিল পর্যাপ্ত বিশ্রাম।
এ ঘটনায় আরও উদ্বেগজনক বিষয় হলো, ঘোড়াগুলো পরিচালনার দায়িত্বে দেখা গেছে অপ্রাপ্তবয়স্ক শিশুদের। এতে যেমন প্রাণীর ওপর নির্যাতন বাড়ছে, তেমনি শিশুদের নিরাপত্তাও মারাত্মক ঝুঁকির মধ্যে পড়ছে।
স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে, কুয়াকাটা সৈকতে প্রায় ১৫টি ঘোড়া রয়েছে। এর মধ্যে মাত্র দুই থেকে তিনটি সুস্থ, বাকিগুলো হয় অল্পবয়সী, নয়তো অসুস্থ ও দুর্বল। সকাল থেকে সন্ধ্যা পর্যন্ত টানা কাজে লাগানো হয় এসব ঘোড়াকে, বিশ্রামের সুযোগ খুবই সীমিত।
প্রাণী অধিকারকর্মীরা জানান, বিষয়টি ইতোমধ্যে ট্যুরিস্ট পুলিশকে জানানো হয়েছে। ঘটনাস্থল থেকে ঘোড়ার পিঠে ব্যবহৃত লোহার স্যাডলবেল্ট জব্দ করে পুলিশ হেফাজতে রাখা হয়েছে।

এনিমেল লাভার অব পটুয়াখালী টিমের সদস্য কে এম বাচ্চু বলেন, “ঘোড়ার রাইডের ক্ষেত্রে নিয়মিত স্বাস্থ্য পরীক্ষা ও পর্যাপ্ত বিশ্রাম নিশ্চিত করা জরুরি। কোনো প্রাণী আহত হলে তাকে অবিলম্বে কাজ থেকে সরিয়ে চিকিৎসার ব্যবস্থা করা উচিত।”
কুয়াকাটা ট্যুরিস্ট পুলিশের সহকারী পুলিশ সুপার (এএসপি) মো. হাবিবুর রহমান জানান, অসুস্থ ঘোড়াটিকে সৈকতে ব্যবহার না করতে মালিকদের সতর্ক করা হয়েছে এবং অন্যান্য ঘোড়ার অবস্থাও পর্যবেক্ষণ করা হচ্ছে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, বিনোদনের নামে যদি এমন নিষ্ঠুরতা চলতে থাকে, তবে তা আর বিনোদন নয়, বরং সহিংসতার শামিল। কুয়াকাটার সেই বিকেলে যেমন ঢেউ থেমে থাকেনি, তেমনি থামেনি পর্যটকদের আনাগোনা, কেবল থামেনি এক অসহায় প্রাণীর নীরব যন্ত্রণা, যা অনেক সময় চোখের সামনে থাকলেও অদেখাই থেকে যায়।






