প্রচলিত কৃষিপণ্যের বাইরে সম্ভাবনাময় রপ্তানি খাত হিসেবে একসময় আলোচনায় এসেছিল দেশের নার্সারিতে উৎপাদিত গাছের চারা। মধ্যপ্রাচ্য থেকে ইউরোপ- বিভিন্ন দেশে তৈরি হয়েছিল বাংলাদেশের ফল, ফুল ও শোভাবর্ধনকারী গাছের চারার বাজার। কিন্তু হঠাৎ করেই এই খাতে নেমেছে বড় ধস। রপ্তানিকারকেরা বলছেন, জটিল রপ্তানি প্রক্রিয়া, উচ্চ পরিবহন ব্যয়, কোকোপিটের সংকট এবং সরকারি প্রণোদনার অভাবের কারণে আগ্রহ হারাচ্ছেন উদ্যোক্তারা।
রপ্তানি উন্নয়ন ব্যুরোর (ইপিবি) তথ্য অনুযায়ী, ২০২৩–২৪ অর্থবছরে প্রায় ১ লাখ ৩৪ হাজার ডলারের চারা রপ্তানি হয়েছিল। তবে ২০২৪–২৫ অর্থবছরে তা নেমে এসেছে মাত্র ১১ হাজার ৩৬৫ ডলারে। আগে যেখানে সাতটি দেশে বাংলাদেশের চারা রপ্তানি হতো, এখন তা সীমাবদ্ধ হয়ে পড়েছে কাতার ও ওমানে।
২০১৯ সালে সংযুক্ত আরব আমিরাতে আমগাছের চারা রপ্তানির মধ্য দিয়ে এ খাতের যাত্রা শুরু হয়। পরে কাতার, ওমান, মালদ্বীপ, জাপান, যুক্তরাজ্য ও যুক্তরাষ্ট্রেও রপ্তানি হয় বিভিন্ন প্রজাতির চারা। গত পাঁচ বছরে দেশের সাতটি প্রতিষ্ঠান গড়ে প্রতিবছর প্রায় ১৯ হাজার চারা রপ্তানি করেছে।
বাংলাদেশ থেকে আম, জাম, কাঁঠাল, পেয়ারা, লেবু, বরই, কামরাঙা, লিচু, ডালিমসহ নানা ফলের চারা রপ্তানি হয়। পাশাপাশি গন্ধরাজ, হাসনাহেনা, গোলাপ, জবা, কাঠগোলাপ ও পানগাছের চারারও বিদেশে চাহিদা রয়েছে।
চারা রপ্তানিকারকদের মতে, রপ্তানির প্রধান বাধা পরিবহন ব্যয়। বিমানপথে চারার ভাড়া তুলনামূলক বেশি। আবার সমুদ্রপথে পাঠাতে প্রয়োজন হয় কোকোপিট, যা নারকেলের ছোবড়া দিয়ে তৈরি। দেশে পর্যাপ্ত কোকোপিট না থাকায় ভারত থেকে আমদানি করতে হয়।
কুমিল্লার গ্রীন ওয়ার্ল্ড নার্সারির মালিক শামছুল আলম বলেন, ‘সরকার কৃষিপণ্য রপ্তানিতে ১০ শতাংশ প্রণোদনা দেয়। চারা কৃষিপণ্য হিসেবে প্রণোদনার তালিকায় অন্তর্ভুক্ত না হওয়ায় এ প্রণোদনা থেকে বঞ্চিত হচ্ছি আমরা। ফলে প্রতিযোগিতামূলক বাজারে বাংলাদেশের রপ্তানিকারকেরা পিছিয়ে পড়ছে।’
তিনি আরও বলেন, ‘কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর জানত না, কীভাবে এ সনদ দিতে হয়। পরে আমি আমার ক্রেতার কাছ থেকে এ সনদের নমুনা সংগ্রহ করে অধিদপ্তরে দিলে তারা সে অনুযায়ী একটি সনদ দেয়।’
রপ্তানিকারকেরা আরও অভিযোগ করেন, আন্তর্জাতিক বাণিজ্য মেলায় চারা অন্তর্ভুক্ত না থাকায় নতুন বাজার তৈরির সুযোগ কমে যাচ্ছে। এছাড়া শীতাতপনিয়ন্ত্রিত কনটেইনার না পাওয়ায় চারার মান নষ্ট হচ্ছে।
রপ্তানি উন্নয়ন ব্যুরোর পরিচালক (মেলা ও প্রদর্শনী) মোহাম্মদ ওয়ারেছ হোসেন বলেন, ‘রপ্তানিকারকেরা যদি আমাদের কাছে একটা আবেদন দেয়, তাহলে আমরা সেটা পণ্য প্রদর্শনীর তালিকায় যুক্ত করে নেব। আমরা চাই, বাংলাদেশের নতুন নতুন পণ্য পৃথিবীর বিভিন্ন দেশে যাক, বাজার তৈরি হোক।’
বিশ্বে গাছের চারা ও ফুল রপ্তানিতে শীর্ষে রয়েছে নেদারল্যান্ডস। দেশটি বছরে প্রায় ১ হাজার ১০০ কোটি ডলারের ফুল ও গাছের চারা রপ্তানি করে। সংশ্লিষ্ট ব্যবসায়ীদের মতে, বাংলাদেশেও এই খাতে বড় সম্ভাবনা রয়েছে। প্রয়োজন শুধু নীতিসহায়তা ও কার্যকর প্রণোদনা।






