যশোর সদর উপজেলার সাড়াপোল গ্রামের ষাটোর্ধ্ব আবদুল ওয়াহেদ সরদারের পরিচয় দিনমজুর। সাইকেলের পেছনে ঝুড়ি আর কোদাল নিয়ে প্রতিদিন বের হন মাটি কাটার কাজে। কিন্তু জীবিকার কঠোর সংগ্রামের মধ্যেও মানুষ, পশুপাখি ও পরিবেশের জন্য নিঃস্বার্থভাবে কাজ করে চলেছেন তিনি। নিজের উপার্জনের একটি অংশ ব্যয় করেন বেওয়ারিশ কুকুরের খাবার ও চিকিৎসায়। পাশাপাশি গ্রামের সড়কের পাশে রোপণ করেছেন শত শত আমগাছ।
বৃক্ষরোপণে বিশেষ অবদানের জন্য ওয়াহেদ সরদার ২০১৭ সালে ‘বঙ্গবন্ধু জাতীয় কৃষি পুরস্কার-১৪২১’ লাভ করেন। এ ছাড়া পরিবেশ অধিদপ্তরের সম্মাননা এবং তাইওয়ানভিত্তিক একটি আন্তর্জাতিক সংস্থার আর্থিক সহায়তা ও স্বীকৃতিও পেয়েছেন।
ওয়াহেদ সরদার প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষার সুযোগ পাননি। নিজের নামটুকু কষ্ট করে লিখতে পারেন। তাঁর পূর্বপুরুষ ভারত থেকে বাংলাদেশে এসেছিলেন। তিন ছেলে–মেয়ের মধ্যে এক ছেলে প্রবাসে থাকেন। তাঁর পাঠানো টাকায় সাড়াপোল গ্রামে একটি পাকা বাড়ি করেছেন ওয়াহেদ।
গত ৯ মার্চ তাঁর বাড়িতে গিয়ে দেখা যায়, বাড়ির সামনে জাল দিয়ে ঘেরা একটি ছোট আশ্রয়কেন্দ্র। সেখানে কয়েকটি কুকুরের বাচ্চা ও তাদের মা কুকুরটি রয়েছে। আরও কয়েকটি বড় কুকুরও আশ্রয় পেয়েছে সেখানে। কুকুরগুলোর যত্ন নিচ্ছিলেন ওয়াহেদ সরদার নিজেই।
ওয়াহেদ সরদার বলেন, ‘তাদের (কুকুরের বাচ্চা) মায়ের দুধে বাচ্চাগুলোর পেট ভরে না। তাই আটার জাও রান্না করে ও ভাতের মাড় খাওয়াতে হয় বাচ্চাগুলোকে। তাদের মা–সহ তিনটি বড় কুকুরকে খাওয়া ও চিকিৎসা দিতে হয়। কোথাও কোনো কুকুর–বিড়াল দুর্ঘটনায় আহত হলে খবর পেলেই সেখানে চলে যাই। আমার কাছে সিরিঞ্জ-ইনজেকশনসহ প্রয়োজনীয় ওষুধ সব সময় থাকে।’
তিনি প্রাণিসম্পদ হাসপাতাল থেকে কুকুর-বিড়ালের পরিচর্যা ও চিকিৎসাবিষয়ক প্রশিক্ষণও নিয়েছেন। আহত প্রাণীকে সুস্থ করে তোলার নানা অভিজ্ঞতা রয়েছে তাঁর। গত বছর চাচড়া এলাকায় গুরুতর আহত একটি কুকুরের চিকিৎসা করে সুস্থ করে তুলেছিলেন তিনি।
স্থানীয়দের ভাষ্য, ২০২৪ সালে ওয়াহেদ সরদার নিজের বাড়ির একটি খালি জায়গায় বেওয়ারিশ কুকুরের জন্য আশ্রয়কেন্দ্র গড়ে তুলেছিলেন। সেখানে প্রায় ৮০টি কুকুর ছিল। তবে দুর্গন্ধ ও নানা অভিযোগে স্থানীয়দের বাধার মুখে সেটি বন্ধ করতে বাধ্য হন তিনি। এরপর ছোট পরিসরে আবারও কুকুর পরিচর্যা শুরু করেন।
ওয়াহেদ সরদার বলেন, ‘স্থানীয় মোল্লা–হুজুরেরা ফতোয়া দিল–“কুকুর নাপাক। বাড়ির সামনে কুকুর থাকলে ফেরেশতা আসে না।” এরপর তাদের অনুসারীরা আমার কুকুরের আশ্রয়ে এসে বিক্ষোভ শুরু করে। তারপরও আমি কুকুরের সেবাযত্ন চালিয়ে যাই। পরে শত্রুতা করে কিছু লোক পানির মধ্যে বিষ মিশিয়ে দেয়। এতে আটটি কুকুর মারা যায়। সেই সঙ্গে আমার সবচেয়ে প্রিয় প্রশিক্ষিত কুকুরটিও মারা যায়। এরপর আস্তে আস্তে কুকুরের সংখ্যা কমিয়ে আনি। তবে আমি যে এলাকায় যায়, সেই এলাকার কুকুরদের পাইরুটি-বিস্কুট খেতে দিই। আমার গায়ের ঘ্রাণ পেলেই কুকুর ছুটে আসে। আমার সাইকেলের পেছন পেছন কুকুরগুলো দৌড়াতে থাকে।’
তেঁতুলিয়া গ্রামের বাসিন্দা গোলাম রব্বানি বলেন, ‘গত বছর তাঁর (ওয়াহেদ সরদার) কাছে ৮০টির মতো কুকুর ছিল। তখন আমি গিয়েছিলাম। এতগুলো কুকুর থাকত এক জায়গায়। খাবারের কারণে দুর্গন্ধ হতো। এতে স্থানীয় লোকজন অতিষ্ঠ হয়ে খামারটি বন্ধ করে দেয়। তবে এখন আবার কিছু কুকুর তিনি পরিচর্যা করছেন।’
শুধু প্রাণীসেবা নয়, পরিবেশ রক্ষাতেও দীর্ঘদিন ধরে কাজ করছেন ওয়াহেদ সরদার। ২০১৭ সালে রূপদিয়া-খড়িচাডাঙ্গা-সুতিঘাটা আঞ্চলিক সড়কের প্রায় আট কিলোমিটারজুড়ে দুই পাশে ৩৮৪টি বিভিন্ন জাতের আমগাছ রোপণ করেন তিনি। বর্তমানে অধিকাংশ গাছই বড় হয়েছে এবং এ বছর প্রচুর মুকুল ধরেছে।
সড়কের দুই পাশে সারি সারি আমগাছ এখন স্থানীয়দের ছায়া ও ফলের চাহিদা পূরণ করছে। স্থানীয় বাসিন্দারা জানান, গ্রামের মানুষ এসব গাছের কাঁচা-পাকা আম খেয়ে থাকেন।
রূপদিয়া গ্রামের গণেশ মল্লিক বলেন, ‘তালগাছ ও আমের চারা রোপণ করেছিলেন সাড়াপোল গ্রামের ওয়াহেদ সাহেব। তালের গাছ হয়নি। আমের গাছ হয়েছে। গ্রামের আশপাশের লোকেরা পাড়ে-মাড়ে কাচা-পাকা গড়ে খাই। অনেকে পাইড়েও বাড়ি নিয়ে যায়।’
এ বিষয়ে ওয়াহেদ সরদার বলেন, ‘আমগাছের অক্সিজেন বিশুদ্ধ-ভালো। কিন্তু মেহগনিগাছের অক্সিজেন বিশুদ্ধ নয়। এ জন্য আমের চারা রোপণ করেছি। পুষ্টির কথা ভেবে, পরিবেশের কথা ভেবে ও পাখপাখালির কথা ভেবে ২০১৭ সালে নিজের টাকায় ৩৮৪টি বিভিন্ন জাতের আমের চারা রোপণ করেছিলাম। কিছু গাছ মানুষ নষ্ট করে ফেলেছে। তবে অধিকাংশ চারা বেচে আছে। নিজের সন্তানদের মাংস-ভাত তুলে না দিয়ে ২০০৩ সাল থেকে আমি বিভিন্ন সড়কের পাশে ও সরকারি জায়গায় তাল ও ফলের গাছ রোপণ করছি।’
গাছ রক্ষায়ও ব্যতিক্রমী উদ্যোগ নিয়েছেন তিনি। ২০১৮ সাল থেকে গাছের গায়ে লাগানো পেরেক, তারকাঁটা, ব্যানার ও সাইনবোর্ড অপসারণের কাজ করছেন। সাইকেলে চড়ে যশোর, খুলনা, সাতক্ষীরা, মেহেরপুরসহ দেশের বিভিন্ন জেলায় ঘুরে হাজারো গাছ থেকে পেরেক খুলেছেন তিনি। এ কাজের স্বীকৃতি হিসেবে পেয়েছেন রাষ্ট্রীয় পুরস্কারও।
অবসরপ্রাপ্ত অধ্যাপক ও পরিবেশবিদ সোলজার রহমান বলেন, ‘ওয়াহেদ সরদার পরিবেশের জন্য নিবেদিত প্রাণ একজন কর্মী। তাঁর বৃক্ষরোপণ কর্মসূচিতে আমি দুই–একবার গিয়েছি। কর্মবীর ওয়াহেদ মাটি কাটার মতো কঠোর পরিশ্রমের কাজ করেন। নিজের পকেটের টাকা দিয়ে ও শ্রম দিয়ে পশুপাখি, পরিবেশ ও মানুষের জন্যে যেভাবে তিনি কাজ করে যাচ্ছেন তা বিরল। সমাজের মানুষের জন্য ওয়াহেদ সরদার বড় দৃষ্টান্ত। তাঁকে আমাদের অনুসরণ করা উচিত।’
সূত্র: প্রথম আলো






