সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ভাইরাল ভিডিওতে সামনে এলো জয়গাঁর পরিবেশ সংকট

গাঢ় ধূসর ধোঁয়া পাক খেয়ে উঠছে তোরসা নদীর তীরঘেঁষা এলাকা থেকে। ধোঁয়ার উৎস স্তুপ করে রাখা বর্জ্য। পশ্চিমবঙ্গের সীমান্ত শহর জয়গাঁর পাশ দিয়ে বয়ে যাওয়া তোরসা নদীর তলদেশজুড়ে ছড়িয়ে রয়েছে প্লাস্টিক, চিকিৎসা বর্জ্য, নির্মাণসামগ্রীর ধ্বংসাবশেষ ও গৃহস্থালির আবর্জনা। ময়লার স্তূপে খাবারের খোঁজে ঘুরে বেড়াচ্ছে গবাদিপশু ও কুকুরের দল।

ভারত-ভুটান সীমান্তঘেঁষা আলিপুরদুয়ার জেলার জয়গাঁ শহরের এই পরিস্থিতি নতুন করে আলোচনায় আসে জানুয়ারিতে প্রকাশিত একটি ইনস্টাগ্রাম রিলের মাধ্যমে। ভিডিওটি ধারণ করেন রক লামা নামে পরিচিত স্থানীয় এক তরুণ কনটেন্ট নির্মাতা। সেখানে আবর্জনার স্তুপের ওপর দাঁড়িয়ে তিনি পশ্চিমবঙ্গের মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের দৃষ্টি আকর্ষণ করে নদীর তীরে অবৈধভাবে বর্জ্য ফেলা বন্ধের দাবি জানান।

২৪ বছর বয়সী এই তরুণের ভিডিও দ্রুত সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ে। এর মাধ্যমে গ্রামীণ বর্জ্য ব্যবস্থাপনা, প্রশাসনিক ব্যর্থতা ও পরিবেশগত অবহেলার বিষয়টি সামনে আসে। একই সঙ্গে ছোট শহর ও পঞ্চায়েত এলাকায় দ্রুত বাড়তে থাকা বর্জ্য সংকট নিয়েও আলোচনা শুরু হয়।

বর্জ্যের চাপে বিপর্যস্ত সীমান্ত শহর

জয়গাঁ একটি ঘনবসতিপূর্ণ বাণিজ্যিক শহর, যেখানে প্রায় এক লাখ মানুষের বসবাস। ভারত ও ভুটানের মধ্যে এটি একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রবেশপথ হওয়ায় শহরটির বাজারগুলো সীমান্ত বাণিজ্য, পর্যটন ও পরিবহন কার্যক্রমে সবসময় ব্যস্ত থাকে। তবে দ্রুত নগরায়ণের ফলে তৈরি হওয়া বর্জ্য ব্যবস্থাপনার সংকট মোকাবিলায় প্রয়োজনীয় অবকাঠামো গড়ে ওঠেনি।

কেন্দ্রীয় দূষণ নিয়ন্ত্রণ পর্ষদের তথ্য অনুযায়ী, জয়গাঁর মতো ছোট ও মাঝারি শহরে প্রতিদিন ৩০ থেকে ৪০ টন কঠিন বর্জ্য উৎপন্ন হয়।

হিমালয়ের পূর্বাঞ্চলের চুম্বি উপত্যকা থেকে উৎপন্ন তোরসা নদী ভুটান হয়ে পশ্চিমবঙ্গে প্রবেশ করেছে। নদীর গুবাড়ি অংশে জমে থাকা প্লাস্টিক, নির্মাণসামগ্রীর ধ্বংসাবশেষ ও বিভিন্ন এলাকার মিশ্র বর্জ্য গত কয়েক মাস ধরে পরিস্থিতিকে আরও ভয়াবহ করে তুলেছে।

জয়গাঁ জয়েন্ট ফোরাম অব বিজনেস অ্যাসোসিয়েশনের আহ্বায়ক ও জয়গাঁ মার্চেন্ট অ্যাসোসিয়েশনের সহসভাপতি জয়ন্ত মুন্দ্রা বলেন, “আমাদের শহরটি আন্তর্জাতিক সীমান্ত ভাগ করে নিয়েছে এবং প্রতি বছর বিপুল পর্যটকের আনাগোনা এখানে। কঠিন বর্জ্য ব্যবস্থাপনা ও জয়গাঁর অন্যান্য সমস্যার সমাধানে আমরা পৌরসভার সুবিধা দাবি করছি।”

তিনি বলেন, বর্ষাকালে এসব বর্জ্যের বড় অংশ পাহাড়ি নদীর স্রোতে ভেসে লোকালয়ে প্রবেশ করে এবং বন্যার সময় পরিস্থিতি আরও ভয়াবহ হয়ে ওঠে।

স্থানীয় ব্যবসায়ীদের আশঙ্কা, এ দূষণ জয়গাঁর ভাবমূর্তি ক্ষতিগ্রস্ত করছে। পরিবেশকর্মীদের মতে, খোলা জায়গায় বর্জ্য পোড়ানোর ফলে বিষাক্ত ধোঁয়া ও ক্ষতিকর রাসায়নিক বাতাসে ছড়িয়ে পড়ছে।

স্বাস্থ্যঝুঁকিতে স্থানীয় বাসিন্দারা

তোরসা নদীর কাছাকাছি বসবাসকারী ৩৪ বছর বয়সী ফাতিমা খাতুন বলেন, “আবর্জনার দুর্গন্ধে থাকা খুবই কষ্টকর। কখনও কখনও আমরা অসুস্থ হয়ে পড়ি, বমি বমি ভাব হয়, সর্দি লাগে এবং মাথাব্যথা লেগেই থাকে। ছোট বাচ্চারা আরও বেশি ভুগছে।”

স্থানীয়দের অভিযোগ, বর্জ্য ফেলা ও পোড়ানোর কারণে বাতাস ও পানির মান খারাপ হয়ে গেছে। এতে দৈনন্দিন জীবনযাপন ব্যাহত হচ্ছে। অনেকে দীর্ঘস্থায়ী কাশি, চোখ জ্বালা, শ্বাসকষ্ট, জ্বর, ত্বকের সংক্রমণ ও পেটের সমস্যার কথা জানিয়েছেন।

দেড় বছরের শিশুসন্তানের মা জয়কাম বিবি বলেন, “আমার সন্তান বারবার অসুস্থ হয়ে পড়ে। বমি, কাশি ও বমি বমি ভাব সহজে ভালো হয় না। তাই প্রায়ই চিকিৎসকের কাছে নিতে হয়।”

জয়গাঁ জনস্বাস্থ্য কেন্দ্রের চিকিৎসক ড. নম্রতা বিশ্বাস জানান, তাদের কাছে যক্ষ্মা, ডায়রিয়া, পাকস্থলীর সংক্রমণ, ত্বকের রোগ ও শ্বাসকষ্টের রোগীর সংখ্যা বাড়ছে। তিনি বলেন, “দীর্ঘদিন দূষিত পরিবেশে থাকলে বিভিন্ন স্বাস্থ্য সমস্যা আরও প্রকট হয়ে ওঠে।”

প্রশাসনিক সীমাবদ্ধতা ও আইনি প্রশ্ন

বন্যাপ্রবণ নিম্নাঞ্চল দিয়ে প্রবাহিত তোরসা নদী জলদাপাড়া ন্যাশনাল পার্কের সঙ্গেও যুক্ত। এই উদ্যান এক শিংওয়ালা ভারতীয় গণ্ডার, হাতি ও নানা প্রজাতির পরিযায়ী পাখির আবাসস্থল।

কেন্দ্রীয় দূষণ নিয়ন্ত্রণ পর্ষদের সাবেক অতিরিক্ত পরিচালক দীপঙ্কর সাহা বলেন, “নদীর জীবন নির্ভর করে প্রবাহ, পলি ও পানির অক্সিজেন মাত্রার ওপর। তারপরও আমরা নদী দূষিত করছি। নদী ব্যবস্থাকে রক্ষা না করলে নদীও আমাদের রক্ষা করতে পারবে না।”

কলকাতা হাইকোর্টের জ্যেষ্ঠ আইনজীবী সব্যসাচী চট্টোপাধ্যায় বলেন, “নদীর তীরে আবর্জনা ফেলা সরাসরি পানি আইন ১৯৭৪ এবং পরিবেশ সুরক্ষা আইন ১৯৮৬-এর লঙ্ঘন। ভৌগোলিক অবস্থান যাই হোক, পানি দূষণ ঘটলে তা অপরাধ হিসেবে বিবেচিত হবে।”

তিনি আরও বলেন, “পৌরসভার অন্তর্ভুক্ত না হলেও বিশেষ অনুমতি সাপেক্ষেও দূষণ সৃষ্টিকারী কার্যক্রম চালানো যাবে না। পরিচ্ছন্ন পরিবেশে বেঁচে থাকা মৌলিক অধিকারের অংশ।”

পরিবেশ ও আইন বিশেষজ্ঞদের মতে, দ্রুত নগরায়ণের তুলনায় জলবায়ু-সহনশীল অবকাঠামো গড়ে না ওঠায় এ ধরনের সংকট বাড়ছে। তাদের মতে, নীতিমালার ঘাটতির চেয়ে বড় সমস্যা হলো বাস্তবায়নের অভাব।

সামাজিক উদ্যোগে পরিচ্ছন্নতা অভিযান

রক লামার ভিডিও ভাইরাল হওয়ার পর স্থানীয়দের মধ্যে নতুন করে সচেতনতা তৈরি হয়েছে। তিনি বলেন, “স্থানীয়ভাবে অনেক চেষ্টা করা হলেও কেউ আমাদের কথা শুনছিল না। তাই ভিডিওর মাধ্যমে মুখ্যমন্ত্রীর দৃষ্টি আকর্ষণের চেষ্টা করি।”

এরপর স্থানীয় কনটেন্ট নির্মাতা, শিক্ষার্থী, ব্যবসায়ী ও সাধারণ মানুষকে নিয়ে শহরে পরিচ্ছন্নতা অভিযান শুরু হয়। জয়গাঁর বাসিন্দা ও কনটেন্ট নির্মাতা ভূমিকা বিশ্বকর্মা বলেন, “প্রতি রোববার আমরা শহরের বিভিন্ন এলাকা পরিষ্কার করছি। প্রশাসন যখন অবহেলা করছে, তখন অন্তত সচেতনতা তৈরির চেষ্টা করছি।”

তবে স্থানীয়দের প্রশ্ন, পরিস্থিতির ভয়াবহতা সামনে আসার পরও প্রশাসন কি কার্যকর ও দীর্ঘমেয়াদি নীতিগত পদক্ষেপ নেবে?

আরও পড়ুন

প্রকৃতির নীরব পরিচ্ছন্নতাকর্মী: কাকেরা কি চলে গেছে, নাকি হারিয়েছি আমরাই?

একসময় ভোরের শহর মানেই ছিল কাকের ডাক। ছাদের কার্নিশে, বৈদ্যুতিক তারে কিংবা বাড়ির পাশের ডাস্টবিনে দেখা মিলত তাদের। গ্রীষ্মের অলস দুপুরেও জানালার বাইরে থেকে...
জাতীয়
0
minutes

আসিয়ান অঞ্চলে ধোঁয়াশার সর্বোচ্চ সতর্কতা, দূষণে শীর্ষে সিঙ্গাপুর

দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার আসিয়ান অঞ্চলে ধোঁয়াশার সতর্কতা সর্বোচ্চ পর্যায়ে উন্নীত করা হয়েছে। টানা দুই দিন বা তার বেশি সময় ধরে বিভিন্ন স্থানে মাঝারি থেকে ঘন...
দূষণ ও দখল
0
minutes

পরিবেশ অধিদপ্তরের গণশুনানিতে দূষণ রোধে নানা বিষয়ে আলোচনা

পরিবেশদূষণ রোধ, অবৈধ ইটভাটা বন্ধ এবং শিল্পকারখানার বর্জ্য ব্যবস্থাপনা নিয়ে বিভিন্ন ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠানের প্রতিনিধিদের অংশগ্রহণে গণশুনানি করেছে পরিবেশ অধিদপ্তর। বৃহস্পতিবার (১৫ অক্টোবর) পরিবেশ অধিদপ্তরের...
দূষণ ও দখল
0
minutes

রাঙ্গুনিয়ায় অবৈধ স্থাপনা উচ্ছেদ করতে গিয়ে হামলার শিকার কর্মকর্তাসহ বনকর্মীরা

চট্টগ্রামের রাঙ্গুনিয়ায় সরকারি বনভূমি দখলমুক্ত করতে গিয়ে হামলার শিকার হয়েছেন বন বিভাগের কর্মকর্তারা। এ ঘটনায় রাঙ্গুনিয়া রেঞ্জ কর্মকর্তা মেহরাজ উদ্দীনসহ বন বিভাগের একাধিক কর্মকর্তা-কর্মচারী...
দূষণ ও দখল
0
minutes
spot_imgspot_img