কখনো কখনো একজন মানুষের ব্যক্তিগত উদ্যোগ সমাজ ও পরিবেশে সুদূরপ্রসারী প্রভাব ফেলে। বাংলাদেশের উত্তরাঞ্চলের সিরাজগঞ্জ জেলার ৩৪ বছর বয়সী মাহবুবুল ইসলাম পলাশ তেমনই একজন মানুষ। নিজ এলাকায় তিনি বৃক্ষপ্রেমী হিসেবে পরিচিত। তবে তার সাম্প্রতিক উদ্যোগ শুধু গাছ লাগানোর মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়; এটি একটি বিলুপ্তপ্রায় প্রজাতিকে টিকিয়ে রাখার সংগ্রাম।
২০২৬ সালের ২৩ জানুয়ারি, নিজ এলাকা থেকে প্রায় ৬০০ কিলোমিটার দূরে কক্সবাজারের টেকনাফে যান পলাশ। উদ্দেশ্য ছিল একটি বৈলাম গাছের চারা রোপণ করা। এর মাধ্যমে দেশের ৬৪তম জেলায় বিপন্ন এই গাছের উপস্থিতি নিশ্চিত করেন তিনি।
ডিপ্টেরোকার্প (Anisoptera scaphula) প্রজাতির বৈলাম একসময় দেশের বনাঞ্চলে পরিচিত গাছ ছিল। বর্তমানে এটি প্রায় বিলুপ্তির পথে। বড় আকৃতির এই বৃক্ষে সাধারণত চিল, শকুনসহ বড় পাখিরা বাসা বাঁধে। শক্ত ও টেকসই কাঠের জন্যও গাছটির বিশেষ গুরুত্ব রয়েছে।
পলাশ ২০২৪ সালের ৫ জুন বিশ্ব পরিবেশ দিবসে রাজশাহী থেকে বৈলাম রোপণ কর্মসূচি শুরু করেন। এরপর একে একে দেশের ৬৩টি জেলায় চারা রোপণ শেষে কক্সবাজারে শেষ গাছটি লাগান।
মঙ্গাবে-কে তিনি বলেন, “একটি প্রজাতিই হোক না কেন, আমি এটিকে সারা দেশে ছড়িয়ে দিতে চেয়েছিলাম।”
ব্যর্থতা পেরিয়ে সফলতা
২০১৯ সালে পার্বত্য চট্টগ্রাম থেকে বৈলাম বীজ সংগ্রহ করে চারা উৎপাদনের পরিকল্পনা করেন পলাশ। কিন্তু প্রথম দিকে বীজ অঙ্কুরোদ্গমে ব্যর্থ হন। তবুও তিনি চেষ্টা চালিয়ে যান।
চার বছর পর, ২০২৩ সালে বান্দরবান ও খাগড়াছড়ির পাহাড়ি এলাকা থেকে ২ হাজার বীজ সংগ্রহ করেন তিনি। এর মধ্যে মাত্র ৭৪টি বীজ অঙ্কুরিত হয়। পরে সিরাজগঞ্জে নিজ বাড়ির পাশে ছোট একটি জমিতে এক বছর ধরে চারা পরিচর্যা করেন। চারাগুলোর উচ্চতা ৩০ থেকে ৪৫ সেন্টিমিটার হলে সেগুলো দেশের বিভিন্ন জেলায় রোপণ করা হয়।
এই পুরো উদ্যোগ বাস্তবায়নে তার সময় লেগেছে ৫৯৭ দিন। ব্যয় হয়েছে প্রায় ২ লাখ ৪৬ হাজার টাকা, যা পুরোপুরি নিজের অর্থে বহন করেছেন তিনি।
কেন গুরুত্বপূর্ণ বৈলাম
বৈলাম একটি বড় বহুবর্ষজীবী বৃক্ষ, যার উচ্চতা ৩০ থেকে ৪৫ মিটার পর্যন্ত হতে পারে। এটি সাধারণত আধা-চিরসবুজ ও চিরসবুজ পাহাড়ি বনে জন্মে এবং উচ্চ আর্দ্রতা সহ্য করতে পারে।
বাংলাদেশ ন্যাশনাল হারবারিয়াম (বিএনএইচ) বৈলামকে দেশের ৪৪৬টি হুমকির মুখে থাকা উদ্ভিদের একটি হিসেবে তালিকাভুক্ত করেছে। বন উজাড় ও জ্বালানি কাঠ সংগ্রহকে এর প্রধান হুমকি হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে।
বিএনএইচ-এর প্রধান বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তা সরদার নাসির উদ্দিন বলেন, “বিপন্ন বৈলাম গাছ সংরক্ষণ নৈতিক দৃষ্টিকোণ থেকেও গুরুত্বপূর্ণ, কারণ প্রতিটি প্রজাতিরই বেঁচে থাকার অধিকার আছে।”
তার মতে, পাহাড়ি বন গঠনে বৈলাম গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে এবং এর কাঠের অর্থনৈতিক মূল্যও অনেক বেশি।
গবেষণা ও সংরক্ষণ প্রচেষ্টা
১৯৯৪ সালে চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের বন ও পরিবেশ বিজ্ঞান ইনস্টিটিউটের অধ্যাপক এম. কামালউদ্দিন সতর্ক করেছিলেন, বৈলাম একদিন বিলুপ্ত হয়ে যেতে পারে। পরে তিনি হাজারিখিল এলাকা থেকে বীজ সংগ্রহ করে বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাসে চারা রোপণ করেন।
২০০৫ সালে এক দুর্ঘটনায় তার মৃত্যু হলেও ক্যাম্পাসে রোপণ করা কয়েকটি গাছ এখনো টিকে আছে। এর একটি প্রতি বছর ফল দেয়।
পরে একই প্রতিষ্ঠানের অধ্যাপক মো. আক্তার হোসেন আবার বৈলাম সংরক্ষণ কার্যক্রম শুরু করেন। তিনি দেশের বিভিন্ন স্থানে জরিপ চালিয়ে কক্সবাজারের উখিয়ায় একটি ফুলধরা গাছ খুঁজে পান।
পরে সংগৃহীত বীজ দিয়ে চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের নার্সারিতে কয়েক হাজার চারা উৎপাদন করা হয়। সেগুলো সিলেট, মৌলভীবাজার, হবিগঞ্জ, কুমিল্লা, পার্বত্য চট্টগ্রাম ও কক্সবাজারে বিতরণ করা হয়।
আক্তার হোসেন বলেন, “আমি যে কাজ শুরু করেছিলাম, পলাশ সেটিকে এগিয়ে নিয়ে যাচ্ছে।”
তিনি জানান, বৈলাম বীজের জীবনীশক্তি খুব কম। বীজ সংগ্রহের দুই থেকে তিন দিনের মধ্যেই বপন করতে হয়। সাত দিন পার হলে বীজ থেকে আর চারা জন্মায় না।
২০২৪ সালের এক গবেষণায় দেখা গেছে, বীজ ১২ ঘণ্টা পানিতে ভিজিয়ে এবং পরে ১২ ঘণ্টা বাতাসে শুকিয়ে বপন করলে সর্বোচ্চ অঙ্কুরোদ্গম ঘটে।
বৈশ্বিক প্রেক্ষাপট
আইইউসিএনের তথ্য অনুযায়ী, বৈলাম বাংলাদেশ, লাওস, মালয়েশিয়া, মিয়ানমার ও থাইল্যান্ডে স্বাভাবিকভাবে জন্মে। ২০১৭ সালে প্রজাতিটিকে ‘বিপন্ন’ হিসেবে তালিকাভুক্ত করা হয়।
মালয়েশিয়ার ফরেস্ট রিসার্চ ইনস্টিটিউটের সাবেক বিভাগীয় পরিচালক ও জীববৈচিত্র্য বিশেষজ্ঞ লেং গুয়ান সাও বলেন, দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ায় বৈলাম সংরক্ষণে উল্লেখযোগ্য উদ্যোগ খুব কম দেখা গেছে।
এই প্রেক্ষাপটে বাংলাদেশি বৃক্ষপ্রেমীদের উদ্যোগকে তিনি আশাব্যঞ্জক বলে মনে করেন।
অধ্যাপক আক্তার হোসেনের মতে, বর্তমানে বাংলাদেশ বৈলাম সংরক্ষণের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ কেন্দ্র হয়ে উঠতে পারে। তিনি জানান, শুধু চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাসেই এখন প্রায় দুই হাজার বৈলাম গাছ রয়েছে।
তার ভাষায়, “এখন আমাদের কাছে এই প্রজাতিটিকে বৈশ্বিকভাবে ছড়িয়ে দেওয়ার সম্ভাবনা তৈরি হয়েছে।”
সূত্র: মঙ্গাবে






