প্রাকৃতিক দুর্যোগের ঝুঁকিতে বাংলাদেশ: কারণ, ক্ষতি ও প্রতিকার

প্রকৃতির দুটি রূপ—সৃষ্টি ও ধ্বংস। একদিকে প্রকৃতি মানুষের জীবনকে করে তোলে সুন্দর ও জীবন্ত, অন্যদিকে কখনো কখনো ভয়ংকর রূপ ধারণ করে তা ধ্বংস ডেকে আনে। পৃথিবীর বিভিন্ন অঞ্চলে ভূমিকম্প, ঘূর্ণিঝড়, দাবানল, তুষারঝড় কিংবা বন্যার মতো দুর্যোগ নিয়মিত দেখা যায়। বাংলাদেশও এর ব্যতিক্রম নয়। বরং ভৌগোলিক অবস্থানের কারণে বাংলাদেশ বিশ্বের অন্যতম দুর্যোগপ্রবণ দেশ হিসেবে পরিচিত।

বাংলাদেশ মৌসুমি জলবায়ুর দেশ। অসংখ্য নদ-নদী, বঙ্গোপসাগরের নিকটবর্তী অবস্থান এবং নিম্নভূমি হওয়ার কারণে এদেশে প্রায় প্রতি বছরই বিভিন্ন প্রাকৃতিক দুর্যোগ আঘাত হানে। বন্যা, ঘূর্ণিঝড়, জলোচ্ছ্বাস, কালবৈশাখী, নদীভাঙন, খরা ও লবণাক্ততা দেশের মানুষের জীবন ও অর্থনীতিতে বড় ধরনের প্রভাব ফেলে।

বাংলাদেশে সবচেয়ে বেশি সংঘটিত দুর্যোগগুলোর মধ্যে বন্যা অন্যতম। ঐতিহাসিকভাবে ১৯৮৮ ও ১৯৯৮ সালের বন্যা ছিল অত্যন্ত ভয়াবহ। বিশেষ করে ১৯৯৮ সালের দীর্ঘস্থায়ী বন্যায় দেশের অধিকাংশ এলাকা প্লাবিত হয় এবং কোটি কোটি মানুষ ক্ষতিগ্রস্ত হয়। বন্যার ফলে কৃষি, যোগাযোগ ব্যবস্থা ও জনজীবন মারাত্মকভাবে বিপর্যস্ত হয়ে পড়ে।

ঘূর্ণিঝড় ও জলোচ্ছ্বাস বাংলাদেশের উপকূলীয় অঞ্চলের মানুষের জন্য এক আতঙ্কের নাম। ১৯৭০ সালের প্রলয়ংকরী ঘূর্ণিঝড়ে কয়েক লাখ মানুষের মৃত্যু হয়েছিল। পরবর্তীতে ১৯৯১ সালের ঘূর্ণিঝড় এবং ২০০৭ সালের সিডর ব্যাপক প্রাণহানি ও সম্পদের ক্ষতি ঘটায়। ঘূর্ণিঝড়ের সময় সাগরের পানি উপকূলে আছড়ে পড়ে জলোচ্ছ্বাস সৃষ্টি করে, যা উপকূলীয় জনপদের জন্য অত্যন্ত ধ্বংসাত্মক।

বাংলাদেশে কালবৈশাখীও একটি সাধারণ দুর্যোগ। গ্রীষ্মকালে আকস্মিক এই ঝড়ে ঘরবাড়ি, গাছপালা ও ফসলের ব্যাপক ক্ষতি হয়। একই সঙ্গে বজ্রপাতেও প্রতিবছর বহু মানুষের মৃত্যু ঘটে।

খরা ও অতিবৃষ্টিও দেশের কৃষির জন্য বড় হুমকি। খরার কারণে মাটির আর্দ্রতা কমে যায়, ফসল শুকিয়ে যায় এবং ভূগর্ভস্থ পানির স্তর নেমে যায়। অন্যদিকে অতিবৃষ্টির ফলে জলাবদ্ধতা সৃষ্টি হয় এবং কৃষিজমি নষ্ট হয়।

নদীভাঙন বাংলাদেশের আরেকটি ভয়াবহ সমস্যা। প্রতি বছর নদীগর্ভে বিলীন হচ্ছে অসংখ্য ঘরবাড়ি, ফসলি জমি ও স্থাপনা। নদীতীরবর্তী মানুষ হারাচ্ছে তাদের বসতভিটা এবং অনেকেই হয়ে পড়ছে বাস্তুচ্যুত।

এছাড়া বর্তমানে জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাবে উপকূলীয় অঞ্চলে লবণাক্ততা বৃদ্ধি পাচ্ছে। এর ফলে কৃষি উৎপাদন কমে যাচ্ছে এবং সুপেয় পানির সংকট তৈরি হচ্ছে। শিল্পাঞ্চলে পরিবেশ দূষণের কারণে এসিড বৃষ্টির আশঙ্কাও বাড়ছে।

প্রাকৃতিক দুর্যোগ পুরোপুরি প্রতিরোধ করা সম্ভব না হলেও এর ক্ষতি অনেকাংশে কমানো যায়। এজন্য পরিবেশ সংরক্ষণ ও ব্যাপক বৃক্ষরোপণ জরুরি। উপকূলীয় অঞ্চলে আরও বেশি ঘূর্ণিঝড় আশ্রয়কেন্দ্র নির্মাণ করতে হবে। নদীর নাব্যতা রক্ষায় নিয়মিত ড্রেজিং করতে হবে এবং অপরিকল্পিত নগরায়ণ বন্ধ করতে হবে। একই সঙ্গে কার্যকর বন্যা নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থা গড়ে তোলা এবং জনগণের মধ্যে সচেতনতা বৃদ্ধি করাও অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।

বাংলাদেশের মানুষ বহু প্রতিকূলতার মধ্যেও ঘুরে দাঁড়ানোর শক্তি রাখে। তাই প্রাকৃতিক দুর্যোগে ভয় না পেয়ে বিজ্ঞানভিত্তিক পরিকল্পনা, পরিবেশ সংরক্ষণ এবং সমন্বিত উদ্যোগের মাধ্যমে দুর্যোগ মোকাবিলার প্রস্তুতি নিতে হবে। তাহলেই ক্ষয়ক্ষতি কমিয়ে একটি নিরাপদ ও টেকসই বাংলাদেশ গড়ে তোলা সম্ভব হবে।

আরও পড়ুন

দুর্যোগ মোকাবিলায় প্রতিটি ঘরকে কেন্দ্রবিন্দু করার আহ্বান রাষ্ট্রপতির

দুর্যোগের আগে সচেতনতা বাড়ানোর আহ্বান জানিয়ে রাষ্ট্রপতি মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর বলেছেন, দুর্যোগের পর আবার মাথা উঁচু করে দাঁড়াতে হলে আগাম প্রস্তুতি নিতে হবে।...
জাতীয়
0
minutes

নেপালে আবারো হড়পা বানে ভেসে গেল বাড়িঘর ও সেতু, নিখোঁজ ৪

নেপালে আবারো হড়পা বানের আঘাত। দেশটির গোর্খা জেলার উত্তরে বুড়ি গণ্ডকী নদীতে হঠাৎ পানি বেড়ে বন্যা দেখা দিয়েছে। এতে বেশ কয়েকটি বাড়িঘর ও দুটি...
জাতীয়
0
minutes

সুপার এল নিনিওর ছোবলে বাড়ছে জলবায়ু বিপর্যয়, যেভাবে প্রস্তুতি নিচ্ছে বিশ্ব

পৃথিবীর জলবায়ুতে ক্রমেই স্পষ্ট হচ্ছে প্রকৃতির ধ্বংসাত্মক খামখেয়ালিপনা। সুপার এল নিনিওর প্রভাবে কোনো অঞ্চল পুড়ছে তীব্র তাপপ্রবাহে, কোথাও চলছে অতিবৃষ্টি। দক্ষিণ এশিয়া ও আফ্রিকায়...
জাতীয়
0
minutes

টানা পাঁচ দিন বৃষ্টির আভাস, ভারি বর্ষণ হতে পারে ৩ বিভাগে

আগামী পাঁচ দিন দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে বৃষ্টি ও বজ্রসহ বৃষ্টির প্রবণতা অব্যাহত থাকতে পারে। এর মধ্যে বরিশাল, চট্টগ্রাম ও সিলেট বিভাগের কোথাও কোথাও মাঝারি...
জাতীয়
0
minutes
spot_imgspot_img