অন্যের মর্মান্তিক দুর্যোগ কীভাবে মুহূর্তেই অন্য কারও কাছে উৎসবে পরিণত হতে পারে, তিব্বত-নেপাল সীমান্তের সাম্প্রতিক ভয়াবহ বন্যা তারই এক করুণ উদাহরণ। আকস্মিক পাহাড়ি ফ্ল্যাশ ফ্লাডে উজান থেকে বিপুল ধ্বংসস্তূপ নেমে আসার পর একদিকে যেমন প্রাণহানি ও নিখোঁজের ঘটনা ঘটেছে, তেমনি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া বিভিন্ন ভিডিওতে ধ্বংসস্তূপ থেকে লাশের গয়না খুলে নেওয়া কিংবা ভেসে আসা গ্যাস সিলিন্ডার দখলের দৃশ্যও দেখা গেছে বলে দাবি করা হচ্ছে।
তবে এর পাশাপাশি নিম্নাঞ্চলে দেখা গেছে আরেক অদ্ভুত দৃশ্য, বন্যার পানিতে ভেসে আসা বড় বড় মাছ ধরতে মানুষের ভিড়। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া ভিডিওগুলোতে একে অনেকে ‘ফিশ সার্জ’ হিসেবে অভিহিত করছেন।
দাবি করা হচ্ছে, উজানের উচ্চভূমির গভীর নদীখাদ বা ‘কুম’-এ দীর্ঘদিন ধরে বসবাস করা বিভিন্ন বড় ও বিরল মাছ আকস্মিক ঢলের স্রোতে আবাসস্থল থেকে বিচ্যুত হয়ে নেপালের নদীতে ভেসে এসেছে। এর মধ্যে মহাশোল, বাঘাইড় ও বামুসের (ইল) মতো মাছও রয়েছে বলে ভিডিও ও পোস্টগুলোতে দাবি করা হয়েছে। এসব মাছের কিছু প্রজাতি বিরল এবং কোথাও কোথাও সংরক্ষিত হওয়ায় শিকার নিষিদ্ধ।
সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া ছবিতে কয়েকটি অস্বাভাবিক বড় আকারের মাছও দেখা গেছে। কোনো কোনো মাছের ওজন ৩-৪ মণ এবং মহাশোলের ওজন ২০-৩০ কেজি পর্যন্ত বলে দাবি করা হচ্ছে। এত বড় মাছ সাধারণত মানুষের জালে সহজে ধরা পড়ে না। ফলে আকস্মিক বন্যার পর সেগুলো নদীর অগভীর অংশে চলে আসায় স্থানীয়দের মধ্যে মাছ ধরার ব্যাপক আগ্রহ তৈরি হয়েছে।
একদিকে পাহাড়ি এলাকার মানুষ স্বজন, ঘরবাড়ি ও জীবিকার ক্ষতি নিয়ে বিপর্যস্ত; অন্যদিকে নিচের দিকে নদীপাড়ে ভেসে আসা মাছ ধরাকে ঘিরে তৈরি হয়েছে উৎসবমুখর পরিবেশ। চাহিদার অতিরিক্ত মাছ পাওয়ায় সেগুলো শুঁটকি করে সংরক্ষণেরও তোড়জোড় চলছে বলে বিভিন্ন ভিডিওতে দেখা গেছে।
প্রকৃতির এই নির্মম পরিহাস মানুষের সামনে একটি কঠিন বাস্তবতাও তুলে ধরে—কারও কাছে যে ঘটনা মুহূর্তের আনন্দ বা প্রাপ্তির কারণ, অন্য কারও কাছে সেটিই হতে পারে জীবনভর বয়ে বেড়ানোর মতো ক্ষতি। ‘কারও পৌষ মাস, কারও সর্বনাশ’, এই প্রবাদের বাস্তব প্রতিচ্ছবিই যেন দেখা যাচ্ছে তিব্বত-নেপাল সীমান্তের এই বিপর্যয়ে।
তবে বন্যার পানিতে ভেসে আসা বিরল ও সংরক্ষিত মাছ শিকার প্রকৃতির জন্য নতুন আরেকটি সংকট তৈরি করতে পারে। আকস্মিক দুর্যোগে আবাসস্থল থেকে বিচ্যুত প্রাণীদের রক্ষা করা এবং সংরক্ষিত প্রজাতি শিকার বন্ধে স্থানীয় প্রশাসন ও সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের নজরদারি জরুরি।
সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ভাইরাল হওয়া বিভিন্ন ভিডিও ও ছবিতে উঠে আসা এসব দৃশ্য কেবল বিরল কিছু মাছের ছবি নয়; এগুলো একই সঙ্গে একটি ভয়াবহ প্রাকৃতিক দুর্যোগের অভিঘাত এবং মানুষের ভিন্ন ভিন্ন প্রতিক্রিয়ার নির্মম চিত্র। আজ যে বিপর্যয় অন্যের জীবনে নেমে এসেছে, প্রকৃতির অনিশ্চয়তায় তা যে কোনো সময় অন্য কারও জীবনেও আঘাত হানতে পারে।
সূত্র: Bappy Express থেকে সংগৃহীত






