পাহাড় ও সংরক্ষিত বনাঞ্চলঘেরা মৌলভীবাজারে একের পর এক গড়ে উঠেছে করাতকল। বন বিভাগের তথ্য অনুযায়ী, চলতি বছরের আগস্ট পর্যন্ত জেলায় মোট ১৯৩টি করাতকল রয়েছে। এর মধ্যে ১৪২টি লাইসেন্সধারী হলেও ১৩টি করাতকলের কোনো লাইসেন্স নেই। আরও ৪০টি করাতকল উচ্চ আদালতে রিট ও স্বত্ব মামলার কারণে চলমান রয়েছে।
জেলার গুরুত্বপূর্ণ সংরক্ষিত বনাঞ্চল ও বনঘেঁষা এলাকাগুলোর আশপাশে এসব করাতকলের অবস্থান নিয়ে উদ্বেগ তৈরি হয়েছে। বিশেষ করে লাউয়াছড়া জাতীয় উদ্যানসহ সংরক্ষিত বনাঞ্চলের কাছাকাছি করাতকল স্থাপন ও কার্যক্রম বন সংরক্ষণে নতুন চাপ তৈরি করছে বলে মনে করছেন পরিবেশকর্মীরা।
কমলগঞ্জ, রাজনগর, কুলাউড়া, বড়লেখা ও শ্রীমঙ্গল উপজেলার বিভিন্ন এলাকা ঘুরে দেখা গেছে, বন ও সড়কের কাছাকাছি বেশ কিছু করাতকল স্থাপন করা হয়েছে। কোনো কোনো করাতকলের আশপাশে বিভিন্ন ধরনের কাঠ মজুত করে রাখা হয়েছে।
বন থেকে কাঠ, করাতকলে চেরাই?
স্থানীয়দের অভিযোগ, কিছু করাতকলে দিনের পাশাপাশি রাতেও কাঠ চেরাই করা হয়। বন, সড়কের পাশ কিংবা চা-বাগান থেকে সংগ্রহ করা কাঠের একটি অংশ এসব করাতকলে আসছে বলেও অভিযোগ রয়েছে। তবে এসব কাঠের উৎস সম্পর্কে স্বাধীনভাবে সব অভিযোগ যাচাই করা সম্ভব হয়নি।
কাঠ ব্যবসার সঙ্গে জড়িত কয়েকজন জানান, বৈধ কাঠের সঙ্গে কোনো কোনো ক্ষেত্রে অবৈধভাবে সংগ্রহ করা কাঠও করাতকলে আসে। কাঠ চেরাইয়ের পর এর উৎস শনাক্ত করা কঠিন হওয়ায় অবৈধ কাঠ বৈধ কাঠের সঙ্গে মিশে যাওয়ার সুযোগ থাকে।
পরিবেশকর্মীদের আশঙ্কা, অবৈধ করাতকলের কার্যক্রম নিয়ন্ত্রণ করা না গেলে বনাঞ্চল থেকে গাছ কাটার প্রবণতা আরও বাড়তে পারে। ফলে সংরক্ষিত বনাঞ্চলের আশপাশে থাকা করাতকলগুলোর কার্যক্রম এবং সেখানে আসা কাঠের বৈধতা নিয়মিত যাচাই করা জরুরি।
নজরদারি বাড়ানোর দাবি
পরিবেশকর্মী নাজমুল ইসলাম বলেন, অবৈধ করাতকল বন্ধে কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়া জরুরি। বনাঞ্চল থেকে কাঠ চুরি বন্ধের পাশাপাশি করাতকলগুলোতে কাঠের বৈধতার বিষয়টি নিয়মিত যাচাই করা প্রয়োজন।
আজকের সিলেট পত্রিকার কথা বলেছে মৌলভীবাজার পরিবেশ অধিদপ্তরের সহকারী পরিচালক মো. মাঈদুল ইসলাম এর সঙ্গে, তিনি বলেন, জনবল সংকটের কারণে নিয়মিত অভিযান পরিচালনা করা কঠিন। পরিবেশ অধিদপ্তর থেকে ছাড়পত্র দেওয়া হলেও করাতকলের লাইসেন্স দেওয়ার বিষয়টি বন বিভাগের আওতাধীন।
সিলেট বিভাগীয় বন কর্মকর্তা মো. আবদুর রহমান বলেন, গত কয়েক বছরে মৌলভীবাজারে বেশ কয়েকটি লাইসেন্সবিহীন করাতকল বন্ধ করা হয়েছে। সম্প্রতি কমলগঞ্জে একটি অবৈধ করাতকলও বন্ধ করা হয়েছে।
তিনি বলেন, লাইসেন্স না থাকা করাতকলের বিরুদ্ধে আইন অনুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়া হবে। কোনো করাতকলে চোরাই কাঠ বিক্রি বা চেরাইয়ের প্রমাণ পাওয়া গেলে সংশ্লিষ্টদের বিরুদ্ধেও আইনি ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
বন রক্ষায় বড় প্রশ্ন
মৌলভীবাজারের লাউয়াছড়া জাতীয় উদ্যানসহ সংরক্ষিত বনাঞ্চলগুলো দেশের গুরুত্বপূর্ণ প্রাকৃতিক সম্পদ। এসব বনাঞ্চলের আশপাশে ১৯৩টি করাতকলের উপস্থিতি, এর মধ্যে লাইসেন্সবিহীন ১৩টি এবং আদালতে মামলা চলমান থাকা আরও ৪০টি করাতকল, বন সংরক্ষণ ও কাঠের উৎস নিয়ন্ত্রণে প্রশাসনিক নজরদারির প্রয়োজনীয়তাকে সামনে নিয়ে এসেছে।






