ডেস্ক রিপোর্ট, সিরাজগঞ্জ
সিরাজগঞ্জের কাজিপুর উপজেলার চালিতাডাঙ্গা ইউনিয়নের মাথাইলচাপড় হাট। দীর্ঘদিন ধরে এখানকার ব্যস্ত জনপদের পাশে দাঁড়িয়ে আছে কয়েকটি শতবর্ষী বটগাছ। প্রজন্মের পর প্রজন্ম ধরে এসব গাছ পথচারী ও স্থানীয় মানুষের ছায়ার আশ্রয় হয়ে আছে। গরমের দিনে স্বস্তি দেয়, বাতাসকে করে নির্মল। একই সঙ্গে গাছগুলো হয়ে উঠেছে স্থানীয় মানুষের স্মৃতি ও ঐতিহ্যের অংশ।
কিন্তু সেই ঐতিহ্যের গাছগুলোতেই সম্প্রতি পড়েছে কাটার দাগ। গাছের বড় বড় ডাল ও গুরুত্বপূর্ণ কিছু অংশ কেটে ফেলার ঘটনায় স্থানীয়দের মধ্যে তৈরি হয়েছে উদ্বেগ। তাদের অভিযোগ, কয়েকজন কাঠ ব্যবসায়ী ঝুঁকিপূর্ণ অংশ অপসারণের কথা বলে শতবর্ষী বটগাছের প্রয়োজনীয় ও গুরুত্বপূর্ণ অংশও কেটে ফেলছেন।
স্থানীয়দের আশঙ্কা, এভাবে গাছের বড় অংশ কেটে ফেললে শতবর্ষী এসব গাছ ধীরে ধীরে দুর্বল হয়ে পড়তে পারে। দীর্ঘদিনের ঐতিহ্য বহন করা গাছগুলো একসময় মৃত্যুঝুঁকিতেও পড়তে পারে।
শুধু গাছ নয়, একটি জীবন্ত ঐতিহ্য
মাথাইলচাপড় হাটের এসব বটগাছ স্থানীয় মানুষের কাছে নিছক গাছ নয়। দীর্ঘ সময় ধরে হাট ও আশপাশের জনপদের সঙ্গে জড়িয়ে থাকা গাছগুলো স্থানীয় পরিবেশেরও গুরুত্বপূর্ণ অংশ।
গাছের ডালে আশ্রয় নেয় নানা প্রজাতির পাখি। গাছ ও এর আশপাশে বসবাস করে বিভিন্ন কীটপতঙ্গ ও ছোট প্রাণী। ফলে এসব শতবর্ষী গাছকে ঘিরে তৈরি হয়েছে ক্ষুদ্র একটি জীববৈচিত্র্যের আবাসস্থল।
স্থানীয়দের মতে, গাছের নির্বিচার ডালপালা কেটে ফেলা হলে শুধু গাছের ক্ষতি হবে না, এর ওপর নির্ভরশীল পাখি, কীটপতঙ্গসহ নানা প্রাণীর আবাসস্থলও ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে।
ঝুঁকিপূর্ণ অংশ অপসারণের কথা প্রশাসনের
গাছ কাটার ঘটনায় উপজেলা প্রশাসনের সহযোগিতার অভিযোগ উঠলেও প্রশাসনের পক্ষ থেকে বলা হচ্ছে, বিষয়টি ঝুঁকিপূর্ণ অংশ অপসারণের সঙ্গে সম্পর্কিত।
উপজেলা প্রশাসনের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে, জননিরাপত্তার বিষয়টি বিবেচনায় নিয়ে মাসিক আইনশৃঙ্খলা সভায় আলোচনা ও সিদ্ধান্তের পর গাছের ঝুঁকিপূর্ণ অংশ অপসারণের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।
প্রশাসনের এই বক্তব্যের পরও স্থানীয়দের উদ্বেগ কাটছে না। তাদের প্রশ্ন, জননিরাপত্তার জন্য যদি ঝুঁকিপূর্ণ ডাল অপসারণের প্রয়োজন হয়, তাহলে গাছের সুস্থ ও গুরুত্বপূর্ণ অংশ অপ্রয়োজনে কেটে ফেলা হচ্ছে কি না, সেটি কীভাবে নিশ্চিত করা হবে?
‘নিরাপত্তা চাই, গাছও বাঁচাতে হবে’
স্থানীয় সচেতন মহলের দাবি, শতবর্ষী এসব বটগাছ রক্ষায় তাড়াহুড়ো করে সিদ্ধান্ত না নিয়ে বিশেষজ্ঞদের পরামর্শ নেওয়া প্রয়োজন।
তাদের প্রস্তাব, উদ্ভিদ ও বৃক্ষ বিশেষজ্ঞদের সমন্বয়ে একটি দল গঠন করে প্রতিটি গাছের স্বাস্থ্য, বয়স ও ঝুঁকি নিরূপণ করা হোক। যেসব ডাল সত্যিই ঝুঁকিপূর্ণ, কেবল সেগুলোই বৈজ্ঞানিক পদ্ধতিতে অপসারণ করা হোক। পাশাপাশি গাছের সুস্থ ও গুরুত্বপূর্ণ অংশ সংরক্ষণের ব্যবস্থা করা হোক।
কারণ, একটি শতবর্ষী গাছ তৈরি হতে যে দীর্ঘ সময় লাগে, তা নতুন করে পূরণ করা সহজ নয়। আজ যে গাছটি কেটে ফেলা হবে, সেটির জায়গায় নতুন চারা রোপণ করলেও সেই ছায়া, পরিবেশগত ভূমিকা কিংবা শত বছরের স্মৃতি ফিরে আসবে না।
ঐতিহ্য রক্ষার সঙ্গে জননিরাপত্তার সমন্বয় জরুরি
স্থানীয়রা মনে করেন, গাছের ঝুঁকিপূর্ণ অংশ অপসারণের প্রয়োজন থাকলে অবশ্যই তা করা উচিত। তবে সেই কাজ যেন গাছ কাটার সুযোগে পরিণত না হয়, সেটিও নিশ্চিত করা জরুরি।
মাথাইলচাপড় হাটের শতবর্ষী বটগাছগুলো শুধু প্রকৃতির সৌন্দর্য নয়, এগুলো স্থানীয় মানুষের স্মৃতি, হাটের পরিচয় এবং এলাকার জীববৈচিত্র্যের অংশ। তাই জননিরাপত্তা নিশ্চিত করার পাশাপাশি শতবর্ষী এসব গাছের অস্তিত্ব রক্ষায়ও কার্যকর ও দায়িত্বশীল পদক্ষেপ চান স্থানীয়রা।
তাদের প্রত্যাশা, কুঠারের আঘাতে ঐতিহ্য হারানোর আগে বিশেষজ্ঞের পরামর্শে গাছগুলোর স্বাস্থ্য পরীক্ষা করা হবে। ঝুঁকিপূর্ণ অংশ নিরাপদে সরিয়ে বাকি গাছগুলোকে বাঁচিয়ে রাখা হবে, যাতে আগামী প্রজন্মও মাথাইলচাপড় হাটে এসে শতবর্ষী বটগাছের ছায়ায় দাঁড়াতে পারে।






