থাইল্যান্ডের লোককথায় এমন কিছু নারী-আত্মার গল্প রয়েছে, যেগুলো একই সঙ্গে রহস্যময়, ভয়ংকর এবং কৌতূহলোদ্দীপক। তাদের কেউ সুন্দরী নারীর রূপ ধরে পুরুষকে কাছে ডাকে, আবার কেউ নাকি গাছের ফল হয়ে জন্ম নেয় তরুণীর অবয়বে। বিশ্বাস করা হয়, তাদের ফাঁদে পা দিলে জীবনে নেমে আসতে পারে ভয়াবহ পরিণতি।
এর মধ্যে অন্যতম নাং তাকিয়ান ও নারিফোন, থাইল্যান্ডের প্রাচীন লোকবিশ্বাস ও বৌদ্ধধর্মের সঙ্গে মিশে থাকা দুটি বহুল প্রচলিত কিংবদন্তি।
গাছের গায়ে নারীদের পোশাক, কেন?
থাইল্যান্ডের দোই ইনথানন জাতীয় উদ্যানের একটি পথে হাঁটার সময় চোখে পড়তে পারে অদ্ভুত এক দৃশ্য। বিশাল একটি গাছের কাণ্ডের চারপাশে বাঁধা রয়েছে নানা রঙের ফিতা ও চকচকে কাপড়। গাছটির পাশে রয়েছে ছোট একটি বেদিও।

বিশেষ করে সেখানে ঝোলানো নারীদের রঙিন রেশমি পোশাকই সহজে নজর কাড়ে।
এর পেছনে রয়েছে নাং তাকিয়ান নামের এক নারী-আত্মার কিংবদন্তি।
থাই লোকবিশ্বাস অনুযায়ী, প্রকৃতির বিভিন্ন উপাদান- গাছ, পাহাড়, নদী কিংবা প্রাণীর মধ্যেও আত্মার অস্তিত্ব রয়েছে। এই প্রাচীন অ্যানিমিস্টিক বিশ্বাস পরবর্তী সময়ে বৌদ্ধধর্মের সঙ্গে মিশে থাই সংস্কৃতির অংশ হয়ে যায়।
তাকিয়ান গাছের বাসিন্দা নাং তাকিয়ান
নাং তাকিয়ানকে তাকিয়ান গাছের আত্মা হিসেবে মনে করা হয়। সাধারণত নদী বা জলধারার কাছাকাছি জন্মানো এই গাছকে পবিত্র বলে বিবেচনা করা হয়।
লোককথায় বলা হয়, নাং তাকিয়ান চাইলে গাছের রূপ থেকে বেরিয়ে এক সুন্দরী তরুণীর রূপ ধারণ করতে পারে। তার লম্বা চুল, আকর্ষণীয় চেহারা এবং পরনে থাকে ঐতিহ্যবাহী থাই পোশাক।
তবে এই সুন্দর রূপের আড়ালে লুকিয়ে থাকতে পারে ভয়ংকর বিপদ।
কিংবদন্তির কিছু সংস্করণে বলা হয়, নাং তাকিয়ান বিষণ্ণ সুরে গান গেয়ে পথহারা পুরুষদের নিজের দিকে আকৃষ্ট করে। কেউ তার খুব কাছে চলে এলে সে তাকে নিজের শক্তিশালী আলিঙ্গনে আটকে ফেলে। এরপর সেই ব্যক্তি নাকি তার শাখা-প্রশাখার মধ্যেই বিলীন হয়ে যায়।
গাছ কাটলেই নাকি অভিশাপ!
তাকিয়ান গাছকে ঘিরে রয়েছে আরও নানা বিশ্বাস।
স্থানীয় লোকবিশ্বাস অনুযায়ী, এই গাছের কাঠ ব্যবহারের জন্য গাছ কেটে ফেললে নাং তাকিয়ানের আত্মা ক্রুদ্ধ হতে পারে এবং সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিকে অভিশাপ দিতে পারে।
এ কারণে প্রাচীন বিশ্বাসে তাকিয়ান গাছ কাটার আগে বিশেষ ধর্মীয় আচার পালনের কথা বলা হয়। এমনকি কিছু লোককথায় বলা হয়, ভিক্ষুরাই কেবল যথাযথ আচার-অনুষ্ঠানের মাধ্যমে গাছ কাটার অনুমতি নিতে পারেন।
নাং তাকিয়ান সবসময় যে অশুভ, তা নয়। অনেকের বিশ্বাস, তিনি ভক্তদের রক্ষা করেন এবং বিপদ থেকে দূরে রাখেন।
গাছের গোড়ায় কেন রাখা হয় নারীদের পোশাক?
নাং তাকিয়ানকে সন্তুষ্ট করার জন্য ভক্তরা গাছের গোড়ায় ঐতিহ্যবাহী থাই পোশাক, রেশমি কাপড় ও ফিতা উৎসর্গ করেন।
কেউ কেউ তার কাছে গর্ভবতী নারীর নিরাপত্তা, ভ্রমণে সুরক্ষা কিংবা রোগ থেকে আরোগ্য কামনা করেন।
এমনকি থাইল্যান্ডের জনপ্রিয় লটারির ভাগ্যবান নম্বর পাওয়ার আশাতেও কেউ কেউ নাং তাকিয়ানের কাছে প্রার্থনা করেন বলে লোকবিশ্বাস রয়েছে।
অর্থাৎ, একই আত্মাকে কেউ ভয় পায়, আবার কেউ সৌভাগ্য ও সুরক্ষার আশায় তার কাছে প্রার্থনাও করে।
আরেক রহস্যময় চরিত্র নারিফোন
নাং তাকিয়ানের পাশাপাশি থাই লোককথায় রয়েছে আরও অদ্ভুত এক চরিত্র- নারিফোন।
নারিফোনকে সাধারণ কোনো ফল হিসেবে বর্ণনা করা হয় না। কিংবদন্তি অনুযায়ী, নারিফোন গাছে এমন ফল ধরে যার আকৃতি দেখতে সুন্দরী তরুণীর মতো।

এই কাহিনির সঙ্গে বৌদ্ধ জাতককাহিনির একটি গল্পের সম্পর্ক রয়েছে।
গল্প অনুযায়ী, দেবতা ইন্দ্র তার সহধর্মিণী ফুসাতিকে কামুক বনবাসী ঋষিদের হাত থেকে রক্ষা করতে একটি বিশেষ বাগান তৈরি করেন। সেই বাগানের গাছে জন্ম নিত সুন্দরী তরুণীর আকৃতির ফল, যাদের বলা হতো নারিফোন।
মাত্র সাত দিনের জীবন!
নারিফোন নিয়ে প্রচলিত কাহিনির সবচেয়ে বিস্ময়কর অংশ হলো তাদের জীবনকাল।
লোকবিশ্বাস অনুযায়ী, একটি নারিফোন দেখতে ১৬ বছর বয়সী সুন্দরী তরুণীর মতো। তবে তাদের শরীরে কোনো হাড় থাকে না।
আর তাদের জীবনও দীর্ঘ নয়, মাত্র সাত দিন।
সাত দিন পর তারা মারা যায়। এরপর ধীরে ধীরে শুকিয়ে ছোট হয়ে যায় এবং শেষ পর্যন্ত তাবিজের মতো আকার ধারণ করে।
নারিফোনের সঙ্গে সম্পর্ক করলে কী হয়?
কিংবদন্তির সবচেয়ে চমকপ্রদ অংশটি এখানেই।
বিশ্বাস করা হয়, কোনো পুরুষ যদি নারিফোন ফল-তরুণীকে নিয়ে যৌন সম্পর্কে জড়ায়, তাহলে সে বন্ধ্যা হয়ে যেতে পারে। এমনকি ওই ব্যক্তির কোনো অতিপ্রাকৃত বা জাদুকরী ক্ষমতা থাকলে সেটিও নাকি হারিয়ে যায়।
এই বিশ্বাস থেকেই নারিফোনের ছোট মূর্তি বা তাবিজকে ঘিরে তৈরি হয়েছে নানা লোকাচার ও কৌতূহল।
পুরাণ, বিশ্বাস নাকি কেবল লোককথা?
নাং তাকিয়ান ও নারিফোনের গল্প থাইল্যান্ডের দীর্ঘদিনের লোকবিশ্বাস, ধর্মীয় সংস্কৃতি ও পুরাণের অংশ। এগুলোকে বৈজ্ঞানিকভাবে প্রমাণিত ঘটনা হিসেবে দেখার সুযোগ নেই।
তবে এসব কিংবদন্তি থাইল্যান্ডের সংস্কৃতিতে প্রকৃতি, আধ্যাত্মিকতা এবং মানুষের বিশ্বাসের গভীর সম্পর্ককে তুলে ধরে।
বিশেষ করে গাছকে ঘিরে আচার-অনুষ্ঠান, পোশাক উৎসর্গ কিংবা তাবিজ ব্যবহারের মতো প্রথাগুলো দেখায়- প্রকৃতিকে ঘিরে মানুষের কল্পনা ও বিশ্বাস কতটা শক্তিশালী হতে পারে।
একদিকে সুন্দরী নারী-আত্মার রহস্যময় ডাক, অন্যদিকে তরুণীর আকৃতির অদ্ভুত ফল, নাং তাকিয়ান ও নারিফোনের গল্প তাই আজও থাইল্যান্ডের লোককথার ভাণ্ডারে সবচেয়ে কৌতূহলোদ্দীপক কাহিনিগুলোর মধ্যে অন্যতম।






