২৬৪ বছর ধরে দাঁড়িয়ে থাকা মৃত প্রবাল: সেন্টমার্টিনের বুকে ১৭৬২ সালের ভূমিকম্পের সাক্ষী

সেন্টমার্টিনের দক্ষিণ, পশ্চিম ও পূর্ব উপকূলে আজও দাঁড়িয়ে আছে শত শত মৃত প্রবাল। রোদে পুড়ে, বৃষ্টিতে ভিজে, জোয়ার-জলোচ্ছ্বাসের আঘাত সহ্য করে তারা যেন বহন করছে আড়াই শতাব্দীরও বেশি সময় আগের এক ভয়াবহ ভূমিকম্পের স্মৃতি।

সময়টা ১৭৬২ সাল। ২ এপ্রিল। আরাকান-নাগা ইয়োমা অঞ্চলে সংঘটিত হয় শক্তিশালী এক ভূমিকম্প। ধারণা করা হয়, এর মাত্রা ছিল প্রায় ৮ দশমিক ৫ থেকে ৮ দশমিক ৮। এই ভয়াবহ ভূমিকম্পের প্রভাব পড়ে বিস্তীর্ণ উপকূলীয় অঞ্চলে এবং বঙ্গোপসাগরে সৃষ্টি হয় সুনামির।

ভূমিকম্পের ভয়াবহতায় সেন্টমার্টিন দ্বীপসহ আশপাশের উপকূলীয় এলাকার ভূমির উচ্চতায় বড় ধরনের পরিবর্তন ঘটে। কোথাও কোথাও ভূমি কয়েক মিটার পর্যন্ত উঁচু হয়ে যায়। ভূপ্রকৃতির এই নাটকীয় পরিবর্তন বদলে দেয় নদী, উপকূল এবং দ্বীপাঞ্চলের চেহারা।

এক সময়ের নাব্য রেজু নদী ধীরে ধীরে তার নাব্যতা হারিয়ে খালে পরিণত হয়। অন্যদিকে সেন্টমার্টিনের ভূপ্রকৃতিতেও আসে বড় পরিবর্তন। ধারণা করা হয়, একসময় অগভীর চর কিংবা জোয়ার-ভাটার দ্বীপ হিসেবে থাকা এই ভূখণ্ড পরবর্তীতে মানুষের বসবাসের জন্য আরও উপযোগী হয়ে ওঠে।

তবে সবচেয়ে মর্মান্তিক পরিবর্তন ঘটে দ্বীপটির চারপাশের প্রবাল জগতে।

ভূমিকম্পে পানির ওপরে উঠে আসে প্রবালের রাজ্য

১৭৬২ সালের সেই শক্তিশালী মেগাথ্রাস্ট ভূমিকম্পের প্রভাবে সেন্টমার্টিনের আশপাশের বহু প্রবাল কলোনি সমুদ্রপৃষ্ঠের ওপরে উঠে আসে। যে প্রবালগুলো একসময় ছিল বঙ্গোপসাগরের পানির নিচে জীবন্ত এক সামুদ্রিক জগতের অংশ, সেগুলো হঠাৎ করেই উন্মুক্ত হয়ে পড়ে প্রকৃতির নির্মম পরিবেশে।

পানির নিচে বেঁচে থাকা এসব প্রবাল সূর্যের তীব্র আলো, তাপমাত্রার পরিবর্তন এবং দীর্ঘ সময় পানির বাইরে থাকার কারণে ধীরে ধীরে মারা যায়। কোটি কোটি প্রবালের মৃত্যুতে জীবন্ত প্রবাল কলোনিগুলো পরিণত হয় পাথরের মতো কঠিন মৃত কাঠামোয়।

আজও সেন্টমার্টিনের দক্ষিণ, পশ্চিম ও পূর্ব উপকূলে এমন অনেক মৃত প্রবাল দাঁড়িয়ে আছে। দেখতে অনেকটা শতবর্ষী কোনো বৃদ্ধের মতো—নীরব, স্থির, অথচ ইতিহাসের এক ভয়াবহ ঘটনার জীবন্ত সাক্ষী।

সেন্টমার্টিনের সব পাথর কিন্তু প্রবাল নয়

সেন্টমার্টিনে গিয়ে অনেকেই দ্বীপের চারপাশে ছড়িয়ে থাকা সব পাথরকেই প্রবাল পাথর বলে মনে করেন। কিন্তু বাস্তবতা ভিন্ন।

দ্বীপটির চারপাশে থাকা অধিকাংশ পাথরই বেলেপাথর ও অন্যান্য শিলাস্তরের অংশ। সেন্টমার্টিনের ভূতাত্ত্বিক গঠন অত্যন্ত বৈচিত্র্যময়। দ্বীপটি একটি ডুবো ভূ-গঠনের অংশ হওয়ায় এখানে এখনো বিভিন্ন ধরনের শিলাস্তরের উপস্থিতি দেখা যায়।

তবে পাথরের মধ্যে বা আলাদাভাবে দাঁড়িয়ে থাকা বড় বড়, উঁচু এবং তুলনামূলক সাদা রঙের যেসব কাঠামো দেখা যায়, সেগুলোর অনেকগুলোই মৃত প্রবালের অবশেষ।

এই প্রবাল পাথরগুলোর বিশেষ বৈশিষ্ট্য হলো—এগুলো একসময় বড় বড় প্রবাল কলোনি ছিল। ফলে এখনো অনেক ক্ষেত্রে একাধিক প্রবাল কাঠামো একসঙ্গে দাঁড়িয়ে থাকতে দেখা যায়।

হেলে পড়ে না, খাঁড়াভাবে দাঁড়িয়ে থাকে

সেন্টমার্টিনের মৃত প্রবাল কাঠামোগুলোর সবচেয়ে বিস্ময়কর বৈশিষ্ট্য তাদের অবস্থান।

অনেক মৃত প্রবাল পাথর হেলে বা শুয়ে নেই। তারা এখনো খাঁড়াভাবে দাঁড়িয়ে আছে। শত শত বছর ধরে জোয়ারের ঢেউ, সামুদ্রিক স্রোত ও জলোচ্ছ্বাসের আঘাত সহ্য করেও তাদের অনেকগুলো টিকে আছে।

এই খাঁড়াভাবে দাঁড়িয়ে থাকা কাঠামো উপকূলের প্রাকৃতিক প্রতিরক্ষাতেও ভূমিকা রাখতে পারে। জোয়ার ও ঢেউয়ের শক্তি সরাসরি উপকূলে আঘাত করার আগে এসব প্রাকৃতিক কাঠামো সেই শক্তির একটি অংশ প্রতিহত করে।

২৬৪ বছর ধরে দাঁড়িয়ে থাকা এই মৃত প্রবালগুলো তাই শুধু পাথর নয়। তারা সেন্টমার্টিনের ভূতাত্ত্বিক ইতিহাসের সাক্ষী, বঙ্গোপসাগরের পরিবর্তিত ভূপ্রকৃতির নীরব দলিল এবং এক ভয়াবহ ভূমিকম্পের স্মৃতিচিহ্ন।

আজ তারা মৃত, কিন্তু তাদের শরীরে লেখা রয়েছে জীবন্ত ইতিহাস।

রোদে পুড়ে, বৃষ্টিতে ভিজে, শত শত বর্ষার জোয়ার-জলোচ্ছ্বাস পেরিয়ে সেন্টমার্টিনের উপকূলে দাঁড়িয়ে থাকা এই ‘বুড়ো’ প্রবালগুলো যেন এখনো বলে যাচ্ছে—১৭৬২ সালের সেই দিনের গল্প।

লেখক: তৈয়ব উল্লাহ, সেন্টমার্টিন

আরও পড়ুন

নেপালে বন্যা-হিমবাহ ধসের পর কোকিলের নীরবতা, কী বার্তা দিচ্ছে প্রকৃতি?

হিমালয় অঞ্চলে হিমবাহ ধস এবং এর জেরে গত ২৬ আগস্ট নেপালে ঘটে যাওয়া প্রলয়ংকরী বন্যা জলবায়ু পরিবর্তনের নেতিবাচক পরিণতির আশঙ্কাকে যেন বাস্তবতায় রূপ দিয়েছে।...
জলবায়ু পরিবর্তন
0
minutes

মৌলভীবাজারে ধর্মীয় সংরক্ষণে টিকে থাকা প্রাচীন বৃক্ষ: পরিবেশ রক্ষার এক লোকজ...

অনলাইন ডেস্ক: বাংলাদেশের উত্তর-পূর্বাঞ্চলে অবস্থিত মৌলভীবাজার জেলা শুধু চা-বাগান, পাহাড় আর নদীর জন্য নয়, বরং প্রাচীন ও দুর্লভ বৃক্ষপ্রজাতির সংরক্ষণের জন্যও একটি গুরুত্বপূর্ণ এলাকা।...
প্রকৃতি ও জীববৈচিত্র্য
0
minutes

আগামী ২৪–৩৬ ঘণ্টায় ৬৪ জেলায় বৃষ্টির সম্ভাবনা

দেশের উত্তরাঞ্চল দিয়ে শুরু হওয়া বৃষ্টি আগামী ২৪ থেকে ৩৬ ঘণ্টায় সারাদেশে ছড়িয়ে পড়তে পারে। রাত থেকেই উত্তরাঞ্চলের বিভিন্ন এলাকায় বৃষ্টিপাত শুরু হয়েছে, যা...
জলবায়ু পরিবর্তন
0
minutes

তিন মাসের আবহাওয়ায় স্বস্তি-অস্বস্তি: বৃষ্টি কম, তাপপ্রবাহ বৃদ্ধি ও ৬টি লঘুচাপের...

সেপ্টেম্বর থেকে নভেম্বর, আগামী তিন মাসে দেশে স্বাভাবিকের তুলনায় কম বৃষ্টিপাত হতে পারে। তবে এ সময় বঙ্গোপসাগরে চার থেকে ছয়টি লঘুচাপ সৃষ্টি হওয়ার সম্ভাবনা...
জলবায়ু পরিবর্তন
0
minutes
spot_imgspot_img