হিমালয় অঞ্চলে হিমবাহ ধস এবং এর জেরে গত ২৬ আগস্ট নেপালে ঘটে যাওয়া প্রলয়ংকরী বন্যা জলবায়ু পরিবর্তনের নেতিবাচক পরিণতির আশঙ্কাকে যেন বাস্তবতায় রূপ দিয়েছে। নেপাল ও তিব্বত সীমান্ত মিলিয়ে এই দুর্যোগে মৃতের সংখ্যা ৯০০ ছাড়িয়েছে এবং ৪ হাজারেরও বেশি মানুষ নিখোঁজ রয়েছেন।
এই ধ্বংসলীলা শুধু মানুষের জীবন কেড়ে নেয়নি, বদলে দিয়েছে প্রকৃতির চিরচেনা রূপও। বসন্ত পেরিয়ে গেলেও এবার কাঠমান্ডু উপত্যকায় শোনা যায়নি কোকিলের পরিচিত ‘কু-হূ’ ডাক।
নেপালের ‘দ্য কাঠমান্ডু পোস্ট’-এ প্রকাশিত এক নিবন্ধে লেখক, শিল্প-ইতিহাসবিদ ও চলচ্চিত্র নির্মাতা সোফিয়া এল পাণ্ডে লিখেছেন, ৪৫ বছরেরও বেশি সময়ের মধ্যে এবারই প্রথম তাঁর বাগানের ল্যাপসি গাছে বসন্তের বার্তা নিয়ে কোনো কোকিল ডাকেনি।
গাছটি আগের মতোই দাঁড়িয়ে আছে। আছে সেই কাকগুলোও, যাদের বাসায় কোকিল ডিম পাড়ে। কিন্তু নেই কোকিল। কাঠমান্ডু উপত্যকার বহু মানুষ এবার বসন্তে এই সুরেলা পাখিটির ডাক শোনার অপেক্ষায় থেকেও হতাশ হয়েছেন।
অনিয়ন্ত্রিত জলবায়ু পরিবর্তন এবং কার্বন নিঃসরণ কমানোর ভাঙা প্রতিশ্রুতিগুলো দেখতে দেখতে এমন আশঙ্কা আগে থেকেই তৈরি হয়েছিল। উষ্ণতর বসন্ত এবং ইট-কাঠের চাপে ক্রমশ সবুজ হারাতে থাকা রুক্ষ উপত্যকাকে একদিন হয়তো কোকিল সত্যিই চিরতরে বিদায় জানাবে, এমন ভয় অমূলক ছিল না।
তবে কোকিলের এই অনুপস্থিতি নিছক একটি পাখির হারিয়ে যাওয়া নয়; এটি হতে পারে আরও বড় বিপদের অশুভ সংকেত। বিশ্ব যখন জলবায়ু সংকটকে পাশ কাটিয়ে নিজের গতিতে এগিয়ে চলেছে, তখন প্রকৃতির এই নীরবতা নেপালের পরিবেশ কতটা বিপজ্জনক সীমায় পৌঁছেছে, তারই ইঙ্গিত দিচ্ছে।
পরিবেশবিদদের দৃষ্টিতে পাখির এমন নীরবতা হিমালয় অঞ্চলের বাস্তুতন্ত্রের ওপর ক্রমবর্ধমান চাপের একটি গুরুত্বপূর্ণ আলামত। জলবায়ুর পরিবর্তনের সঙ্গে সঙ্গে পাখির আবাসস্থল, খাদ্যের প্রাপ্যতা, প্রজননকাল এবং পরিযায়ী আচরণও বদলে যেতে পারে। ফলে একটি পরিচিত পাখির অনুপস্থিতির পেছনে লুকিয়ে থাকতে পারে পুরো একটি বাস্তুতন্ত্রের পরিবর্তনের গল্প।
প্রকৃতির স্বর্গে সংকট
ভৌগোলিক বৈচিত্র্যের কারণে নেপাল সমৃদ্ধ জীববৈচিত্র্যের এক অনন্য ভূখণ্ড। ক্রান্তীয় আবহাওয়া থেকে শুরু করে হিমালয়ের তুষারাবৃত অঞ্চল, প্রকৃতির বিচিত্র রূপের অসাধারণ সমন্বয় রয়েছে দেশটিতে।
ইউনেস্কো স্বীকৃত সগরমাথা ও চিতওয়ান জাতীয় উদ্যানের পাশাপাশি নেপাল ‘তৃতীয় মেরু’ হিসেবে পরিচিত হিমালয় অঞ্চলেরও গুরুত্বপূর্ণ অংশ। কিন্তু সেই প্রাকৃতিক সম্পদ আজ অস্তিত্বের সংকটে।
রসুয়ায় হঠাৎ ঘটে যাওয়া প্রলয়ঙ্করী বন্যা যেন সেই সংকটেরই একটি নির্মম প্রকাশ। ঘটনাটি আকস্মিক হলেও এর পেছনে তৈরি হচ্ছিল দীর্ঘমেয়াদি ঝুঁকি। দ্রুত বদলে যাওয়া আবহাওয়ার কারণে এখন প্রাচীন অশ্বত্থ গাছ থেকে শুরু করে বর্ণিল পাখি, উচ্চভূমির স্বচ্ছ হ্রদ, বরফাবৃত পর্বত, দেবদারু বন, স্থানীয় ফলমূল ও সবজি, সবকিছুই ঝুঁকির মুখে।
ঝুঁকির বাইরে নেই দূষিত বাতাস ধুয়ে দেওয়া আষাঢ়ের বৃষ্টিও। সবচেয়ে ঝুঁকিপূর্ণ অঞ্চলগুলোতে মানুষ ও পশুপাখির টিকে থাকাও ক্রমশ কঠিন হয়ে উঠছে।
জলবায়ু সংকট আড়ালে
রাজনৈতিক অস্থিরতা ও অর্থনৈতিক মন্দার কারণে বন্যা, হিমবাহ গলন, আকস্মিক ভূমিধস কিংবা দাবদাহের মতো ঘটনা নিয়মিত ঘটলেও জাতীয় আলোচনায় জলবায়ু পরিবর্তনের বিষয়টি অনেক সময় আড়ালে পড়ে থাকে।
নেপালের রসুয়ায় ভয়াবহ বন্যার ঠিক আগমুহূর্তে লেখা নিবন্ধটিতে দেশটির জাতীয় অর্থনীতিতে জলবায়ু পরিবর্তনের সম্ভাব্য প্রভাব সম্পর্কে মানুষের উদাসীনতার বিষয়টিও উঠে এসেছে। এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে এক গভীর মানসিক আঘাত, প্রাকৃতিক দুর্যোগের পর যে ট্রমার মুখোমুখি হচ্ছে পুরো দেশ।
বৈশ্বিক তাপমাত্রা বৃদ্ধি ১ দশমিক ৫ ডিগ্রি সেলসিয়াসের নিচে রাখার চেষ্টা চলছে। অথচ নেপালের তাপমাত্রা ইতোমধ্যে ১ দশমিক ৪ ডিগ্রি সেলসিয়াস বেড়েছে। ফলে জলবায়ু পরিবর্তনের চড়া মাশুল দেশটিকে অব্যাহতভাবেই দিতে হবে।
নীতিতে জলবায়ু সচেতনতা জরুরি
এই বাস্তবতায় জাতীয় বাজেট প্রণয়ন, নীতি নির্ধারণ কিংবা শিক্ষাব্যবস্থা পুনর্গঠনের মতো প্রতিটি ক্ষেত্রেই জলবায়ু সচেতনতা মৌলিক বিষয় হিসেবে অন্তর্ভুক্ত করা জরুরি।
বিশ্বের মোট কার্বন নিঃসরণে নেপালের অবদান সামান্য হলেও নদীতে জমে থাকা প্লাস্টিক বর্জ্যসহ পরিবেশের নানা চিত্র নিজেদের অপচয় ও ব্যক্তিগত উদাসীনতার বাস্তব চেহারা তুলে ধরে।
সমাজের সচ্ছল মানুষ সাধারণত অসচ্ছল মানুষের তুলনায় বেশি ভোগ করেন, বেশি বর্জ্য তৈরি করেন এবং বেশি কার্বন নিঃসরণ ঘটান। অথচ জলবায়ু সংকটের সামগ্রিক প্রভাব পড়ে সবার ওপর। এতে ধনী-দরিদ্রের বৈষম্য আরও বাড়ার আশঙ্কা তৈরি হয়।
স্কুলগুলোতেও জলবায়ু সচেতনতা সম্পর্কে পর্যাপ্ত শিক্ষা দেওয়া হয় না। মানুষের ভোগ ও ব্যবহারের ধরন পরিবেশের ওপর কী প্রভাব ফেলে, সে বিষয়েও সচেতনতা গড়ে তোলা জরুরি।
উন্নয়নের আলোচনায় ‘চক্রাকার অর্থনীতি’ শব্দটি বহুল ব্যবহৃত হলেও অধিকাংশ মানুষের কাছে এর বাস্তব তাৎপর্য এখনও স্পষ্ট নয়।
টেকসই অর্থনীতির পথে
অর্থনীতিবিদ কেট রাওয়ার্থের ২০১৭ সালের বিখ্যাত বই ‘ডোনাট ইকোনমিক্স: সেভেন ওয়েজ টু থিংক লাইক আ ২১স্ট-সেঞ্চুরি ইকোনমিস্ট’ পরিবেশ ধ্বংস না করে এবং মানুষের বৈষম্য কমিয়ে কীভাবে একটি ভারসাম্যপূর্ণ অর্থনীতি গড়ে তোলা যায়, তার একটি গুরুত্বপূর্ণ ধারণা তুলে ধরে।
অর্থনীতি কেবল গণিত কিংবা চাহিদা ও জোগানের রেখাচিত্র নয়। এটি একটি সামাজিক-রাজনৈতিক বিজ্ঞান, যেখানে সামষ্টিক অর্থনৈতিক নীতি প্রণয়নের সময় বাস্তব জগতের বৈষম্য, সীমিত প্রাকৃতিক সম্পদ এবং রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটকে বিবেচনায় নিতে হয়।
এই পরিবর্তনমুখী চিন্তাগুলো শুধু বুদ্ধিজীবী বা নীতিনির্ধারকদের আলোচনার বিষয় হয়ে থাকলে চলবে না। এগুলোকে বাস্তবায়নযোগ্য নীতিতে রূপান্তর করে সমাজের প্রতিটি স্তরে নিয়ে যেতে হবে।
শিক্ষা, বর্জ্য ব্যবস্থাপনা, ভোগের ধরন, বৃত্তিমূলক প্রশিক্ষণ, বাণিজ্য, করব্যবস্থা ও পর্যটন, প্রতিটি ক্ষেত্রেই টেকসই দৃষ্টিভঙ্গি প্রতিষ্ঠা করতে হবে।
চক্রাকার অর্থনীতির মূল ধারণা হলো সম্পদের সর্বোচ্চ ব্যবহার নিশ্চিত করা এবং পণ্য ব্যবহারের পর তা ফেলে না দিয়ে পুনর্ব্যবহার বা রিসাইক্লিংয়ের মাধ্যমে বর্জ্য কমানো।
অন্যদিকে, ‘ডোনাট অর্থনীতি’র ধারণা এমন একটি অর্থনৈতিক ব্যবস্থা গড়ে তোলার কথা বলে, যেখানে একদিকে সুবিধাবঞ্চিত মানুষের মৌলিক চাহিদা পূরণ হবে, অন্যদিকে অতিরিক্ত সম্পদ ব্যবহারের মাধ্যমে পৃথিবীর পরিবেশগত ভারসাম্য নষ্ট হবে না। এই দুই সীমার মধ্যবর্তী নিরাপদ পরিসরেই মানুষের টেকসই জীবনযাপনের সুযোগ তৈরি করতে হবে।
পরিবর্তন শুরু হোক ব্যক্তি থেকে
এই মডেলের লক্ষ্য হলো এমন শিক্ষা ও প্রশিক্ষণ নিশ্চিত করা, যা মানুষকে সবুজ ও টেকসই পরিবেশে বসবাসের জন্য প্রস্তুত করবে। একই সঙ্গে অতিরিক্ত ভোগের অভ্যাস পরিবর্তন করে এমন এক জীবনযাপনে অভ্যস্ত করবে, যা শুধু আর্থিক সামর্থ্যের বিচারে নয়, নৈতিক, আত্মিক ও পরিবেশগত সীমার দিক থেকেও গ্রহণযোগ্য।
তবে এ ধরনের পরিবর্তনের সুযোগ সচ্ছল মানুষের জন্য স্বাভাবিকভাবেই বেশি। ফলে এই বৈষম্য দূর করতে রাষ্ট্রকে এগিয়ে আসতে হবে। স্বাস্থ্যসেবা, আবাসন, বর্জ্য ব্যবস্থাপনা, উপযুক্ত কর্মক্ষেত্র, শিক্ষা এবং টেকসই শহর গড়ে তোলার সুযোগ নিশ্চিত করা রাষ্ট্রের দায়িত্ব।
নেপালের এখনও অনেক পথ পাড়ি দেওয়া বাকি। শিক্ষা, সমাজকল্যাণ ও জলবায়ু পরিবর্তনের মতো গুরুত্বপূর্ণ বিষয়গুলোকে ব্যক্তিগত কিংবা রাজনৈতিক কোনো কারণেই আর উপেক্ষা করার সুযোগ নেই।
বাস্তবতা থেকে চোখ ফিরিয়ে রেখে ‘সবকিছু ঠিক হয়ে যাবে’, এমন আশায় দিন পার করার সময়ও শেষ হয়ে আসছে। পৃথিবীকে বাঁচাতে হলে পরিবর্তন শুরু করতে হবে নিজের কাছ থেকে, নিজের পরিবার থেকে।
প্রকৃতির ক্ষতি না করে বাঁচতে শেখা, লোভের বশে সম্পদ নিঃশেষ না করা এবং পরিবেশের ক্ষতি দেখেও চোখ বন্ধ না রাখা, এসব এখন আর কেবল নৈতিকতার প্রশ্ন নয়; মানবজাতির টিকে থাকার প্রশ্ন।
কোকিলের নীরবতার বার্তা
নেপালের বড় সমস্যাগুলোর মধ্যে প্রবাসে পাড়ি জমানো, বিনিয়োগের অভাব ও কর্মসংস্থানের সীমাবদ্ধতা যেমন রয়েছে, তেমনি রয়েছে নীরবে এগিয়ে চলা জলবায়ু পরিবর্তন। এর প্রভাবে প্রকৃতির স্বাভাবিক ছন্দ হারিয়ে যাচ্ছে।
আর সেই পরিবর্তনের একটি ক্ষুদ্র অথচ গভীর প্রতীক হয়ে উঠেছে কোকিলের নীরবতা।
একটি বসন্তে কোকিল না ডাকার ঘটনাকে হয়তো বিচ্ছিন্ন ঘটনা হিসেবে দেখা যায়। কিন্তু যখন তার সঙ্গে যুক্ত হয় হিমবাহ গলন, বন্যা, ভূমিধস, দাবদাহ, জীববৈচিত্র্যের সংকট এবং ক্রমবর্ধমান পরিবেশগত ঝুঁকি, তখন বিষয়টি আর উপেক্ষা করার মতো থাকে না।
প্রকৃতি হয়তো ইতোমধ্যেই সতর্ক করছে। এখন সেই সতর্কবার্তা শুনে আমরা কতটা বদলাতে পারি, সেটিই সবচেয়ে বড় প্রশ্ন।
কারণ কোকিলের ডাক হারিয়ে যাওয়ার পর যদি আমরা নীরব থাকি, তাহলে একদিন হয়তো হারিয়ে যেতে পারে সেই প্রকৃতিও, যে প্রকৃতির অংশ হয়েই আমাদের অস্তিত্ব।
চাইলে এটিকে দৈনিক পত্রিকার সম্পাদকীয় পাতার জন্য আরও সাহিত্যিক ও আবেগঘন, অথবা সংবাদ-ফিচার হিসেবে আরও তথ্যনির্ভর ও সংক্ষিপ্ত করে দিতে পারি।






