শেরপুরের নালিতাবাড়ীতে ১০ হেক্টর পাহাড়ি জমিতে গড়ে তোলা ‘মিনজুরি বাগান’ নামের সামাজিক বনের প্রায় সব গাছ কেটে নেওয়ার অভিযোগ উঠেছে। বাগানটিতে ২৫ হাজার আকাশমণি গাছের চারা রোপণ করা হয়েছিল। দীর্ঘদিন ধরে ২৫ জন অংশীদারের শ্রম ও বিনিয়োগে গড়ে ওঠা বাগানের গাছ কেটে নেওয়ার পাশাপাশি অনেক জায়গায় গোড়া ও শেকড়ও তুলে ফেলা হয়েছে বলে অভিযোগ করেছেন অংশীদাররা।
তাদের দাবি, এতে তাদের অন্তত ৪০ লাখ টাকার ক্ষতি হয়েছে। তবে হাজার হাজার গাছ কেটে নেওয়ার অভিযোগের বিষয়ে কিছুই জানেন না বলে দাবি করেছে স্থানীয় বন বিভাগ।
এ ঘটনায় বন বিভাগের নজরদারি ও ভূমিকা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন অংশীদার ও পরিবেশবাদীরা। তাদের অভিযোগ, প্রভাবশালী মহলের ছত্রছায়ায় গাছ কাটার কারণে বাধা দিতে গিয়ে তারা হুমকির মুখে পড়েছেন।
তবে এসব অভিযোগ অস্বীকার করেছেন মধুটিলা রেঞ্জ কর্মকর্তা। তিনি বিষয়টি সম্পর্কে অবগত নন বলে জানিয়েছেন। অন্যদিকে বিভাগীয় বন কর্মকর্তা বলেছেন, তদন্ত করে দোষীদের বিরুদ্ধে আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
১০ হেক্টরের বাগানে ২৫ হাজার গাছ
শেরপুরের নালিতাবাড়ী উপজেলার মধুটিলা রেঞ্জের আওতাধীন বাতকুচি বিটের দাওধারা-কাটাবাড়ি মৌজায় ‘মিনজুরি বাগান’ নামে সামাজিক বনটি গড়ে তোলা হয়। ২০১৭-১৮ অর্থবছরে সামাজিক বনায়ন কর্মসূচির আওতায় ১০ হেক্টর পাহাড়ি বনভূমিতে ২৫ জন অংশীদারকে নিয়ে বাগানটি সৃজন করা হয়। সেখানে ২৫ হাজার আকাশমণি গাছের চারা রোপণ করা হয়েছিল।
অংশীদারদের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, বাগানের গাছগুলোর বর্তমান বাজারমূল্য ৪০ লাখ টাকার বেশি। তাদের অভিযোগ, পর্যায়ক্রমে বাগানের প্রায় সব গাছই কেটে নিয়ে গেছে একটি সংঘবদ্ধ চক্র।
শুধু গাছ কেটে নেওয়াই নয়, কাটা গাছের আলামত মুছে ফেলতে অনেক জায়গায় গোড়া ও শেকড় পর্যন্ত তুলে নেওয়া হয়েছে বলেও অভিযোগ তাদের।
সরেজমিনে গাছ কাটার চিহ্ন
সরেজমিনে বাগানের বিভিন্ন এলাকা ঘুরে কোথাও ঘাস ও আগাছা জন্মাতে দেখা গেছে। কোথাও পড়ে আছে কাটা গাছের ছোট ছোট টুকরা। আবার কিছু জায়গায় দু-একটি চিকন গাছ রেখে দেওয়া হয়েছে।
সাম্প্রতিক একটি প্রতিবেদনেও একই বাগানকে ১০ হেক্টরের সামাজিক বন হিসেবে উল্লেখ করে সেখানে ২৫ হাজার আকাশমণি গাছের চারা রোপণের তথ্য দেওয়া হয়েছিল। পর্যায়ক্রমে বাগানের প্রায় সব গাছ কেটে নেওয়ার অভিযোগও উঠে এসেছে।
‘বন বিভাগকে ম্যানেজ করেই উজাড়’
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক একাধিক অংশীদার অভিযোগ করেন, প্রভাবশালী মহলের ছত্রছায়ায় বাগানের গাছ কেটে নেওয়া হয়েছে। তারা বাধা দিতে গেলে বিভিন্ন ধরনের হুমকি দেওয়া হয়। এ কারণে ভয়ে অনেকেই বন কাটার সঙ্গে জড়িতদের বিষয়ে প্রকাশ্যে কথা বলতে চান না।
তাদের অভিযোগ, বন বিভাগের কর্মকর্তাদের গাফিলতি এবং তাদের ‘ম্যানেজ’ করেই বাগানটি উজাড় করা হয়েছে। বন বিভাগ চাইলে পাহাড় থেকে একটি গাছের পাতাও কেউ নিতে পারবে না। দীর্ঘদিন অর্থ ও শ্রম দেওয়ার পরও এখন তারা নিজেদের প্রাপ্য সুবিধা থেকে বঞ্চিত হচ্ছেন।
পরিবেশ অধিকারকর্মীদের অভিযোগ, শুধু মিনজুরি বাগান নয়, গারো পাহাড়ের বিভিন্ন এলাকাতেও সরকারি বন উজাড়ের ঘটনা ঘটছে। কোনো কোনো ক্ষেত্রে ব্যক্তিমালিকানাধীন বাগান বিক্রি হওয়ার পর তার সঙ্গে থাকা সরকারি বনের গাছও কেটে নেওয়া হচ্ছে।
তাদের দাবি, দাওধারা ইসলামিক মিশন হাসপাতালের বাগানের পুরোনো বেশ কিছু গাছও গত কয়েক বছরে কেটে নেওয়া হয়েছে।
শেরপুরের সেভ ওয়াইল্ডলাইফ অ্যান্ড ন্যাচার (সোয়ান)-এর যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক জাহিদুল ইসলাম জিহাদ বলেন, ‘সরকার যেখানে গাছ রোপণে সারাদেশে উৎসাহিত করছে, বিভিন্ন কর্মসূচি নিচ্ছে, সেখানে শেরপুরের গারো পাহাড়ের চিত্র পুরোপুরি উল্টো। মিনজুরি বাগানে নির্বিচারে গাছ কেটে একদিকে বন ধ্বংস করা হচ্ছে, অন্যদিকে এলাকার সৌন্দর্য নষ্ট হচ্ছে।
তিনি বলেন, আমি ওই বাগানে গিয়েছি এবং স্থানীয় অংশীদারদের সঙ্গে কথা বলেছি। বন বিভাগ ও প্রভাবশালী মহলের যোগসাজশে ২০ থেকে ২৫ হাজার গাছ উধাও হয়ে গেছে বলে স্থানীয়রা জানিয়েছেন। বিষয়টি সুষ্ঠুভাবে তদন্ত করে ভবিষ্যতে যেন এমন ঘটনার পুনরাবৃত্তি না ঘটে, সে ব্যবস্থা নিতে হবে।’
‘কিছুই জানে না’ বন বিভাগ
গাছ কাটার অভিযোগের বিষয়ে ময়মনসিংহ বন বিভাগের মধুটিলা রেঞ্জ কর্মকর্তা দেওয়ান আলী বলেন, ‘এ বিষয়ে আমি অবগত নই। গণমাধ্যমকর্মীদের কাছে এ বিষয়ে জানতে পেরেছি। আমার চাকরির প্রায় শেষ মুহূর্তে। দীর্ঘ চাকরিজীবনে কোনো চোরাকারবারির সঙ্গে আপস করিনি। এখানেও আমার অবস্থান একই।’
ময়মনসিংহের বিভাগীয় বন কর্মকর্তা কাজী মুহাম্মদ নুরুল করিম বলেন, ‘এত বিপুল পরিমাণ গাছ চুরি হয়ে গেছে, এটা আমার জানা নেই। বিষয়টি সুষ্ঠু তদন্ত সাপেক্ষে আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হবে।’
বেসামরিক বিমান ও পর্যটন মন্ত্রী এম রশিদুজ্জামান মিল্লাত বলেন, ‘কারা পরিবেশ নষ্ট করার জন্য বন বিভাগের গাছগুলো কেটে নিচ্ছে, তাদের আইনশৃঙ্খলা বাহিনী যেন শনাক্ত করে। কোনো অবস্থাতেই তাদের ছাড় দেওয়া যাবে না।’
সূত্র: Jago News 24






