ঢাকার নদীগুলোতে দুই দশক আগেও নিয়মিত দেখা মিলত ডলফিনের। দূষণ, মাছের সংকট ও অতিরিক্ত নৌযান চলাচলে কমেছে তাদের বিচরণ; তবু বসিলা অংশে এখনো টিকে আছে কয়েকটি গাঙ্গেয় শুশুক।
সময় সকাল ৭টা। প্রতিদিনের মতো রাজধানীর মোহাম্মদপুরের বসিলায় নদীতীরবর্তী ওয়াকওয়েতে প্রাতঃভ্রমণে বেরিয়েছিলেন একজন পথচারী। হঠাৎ বুড়িগঙ্গার মাঝ নদীতে পানির ওপর ছোট্ট একটি লাফ চোখে পড়ে। কিছুক্ষণ পর আবারও পানিতে দেখা যায় আলোড়ন।
প্রথমে ডলফিন মনে হলেও ঢাকার বুড়িগঙ্গার দূষিত পানিতে ডলফিন থাকার বিষয়টি বিশ্বাস করা কঠিনই মনে হয়েছিল। তবে কয়েক মিনিট নদীর দিকে নজর রাখার পর আবারও প্রাণীটির লাফ চোখে পড়ে। তখন নিশ্চিত হওয়া যায়, সেটি ডলফিনই।
স্থানীয় জেলেদের সঙ্গে কথা বলেও মেলে একই তথ্য। তাদের ভাষ্য, বসিলা এলাকায় বুড়িগঙ্গায় দুটি ডলফিন দেখেছেন তারা। তুরাগ নদীতেও ডলফিনের দেখা পেয়েছেন বলে জানান কয়েকজন জেলে। স্থানীয় বাসিন্দারাও বলছেন, গত কয়েক বছর ধরে বসিলার নদীতে ডলফিনের আনাগোনা চোখে পড়ছে।
বুড়িগঙ্গার দূষিত পানিতে কীভাবে টিকে আছে ডলফিন?
ঢাকার নদীগুলোর মধ্যে বুড়িগঙ্গা দীর্ঘদিন ধরেই দূষণের কারণে আলোচিত। নদীতে মাছের উপস্থিতিও কমেছে উল্লেখযোগ্যভাবে। এমন বাস্তবতায় বুড়িগঙ্গায় গাঙ্গেয় শুশুকের অস্তিত্ব বিস্ময় তৈরি করেছে।
জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রাণীবিদ্যা বিভাগের অধ্যাপক ড. আবদুল আজিজ বলেন, ‘আশ্চর্যজনক হলেও সত্য যে ঢাকার বুড়িগঙ্গা, তুরাগ ও বংশী নদীতে এখনো বেশ কয়েকটি মিঠাপানির ডলফিন বা গাঙ্গেয় শুশুক টিকে আছে। বিশেষত বুড়িগঙ্গায় যে ডলফিন রয়েছে তা মোহাম্মদপুরের বসিলা অংশেই থাকে। আমরা ওখানে তিনটি ডলফিনের দেখা পেয়েছি। তবে বুড়িগঙ্গার এই পানিতে কীভাবে ডলফিন টিকে রয়েছে তা কিছুটা বিস্ময়কর। কারণ এই নদীতে মাছ নেই বললেই চলে।’
ড. আজিজের ধারণা, খাদ্যসংকটের কারণে গাঙ্গেয় শুশুক এখন সাকার মাছও খেতে পারে। তিনি বলেন, ‘আমার ধারণা ডলফিন এখন সাকার মাছও খাচ্ছে। নয়তো এরা টিকে থাকবে কী করে! যেভাবেই হোক তারা এখন পরিবেশের সঙ্গে মানিয়ে নিয়েছে।’
তার মতে, বুড়িগঙ্গার অন্যান্য অংশের তুলনায় বসিলায় দূষণ কিছুটা কম। পাশাপাশি এ এলাকায় মানুষের নদীমুখী ব্যস্ততাও তুলনামূলক কম। আর নিরাপদ ও শান্ত পরিবেশ ডলফিনের বিচরণের জন্য গুরুত্বপূর্ণ।
শীতকালে অবশ্য বুড়িগঙ্গায় ডলফিনের দেখা পাওয়া আরও কঠিন হয়ে পড়ে। এ সময় নদীতে পানি কমে যাওয়ায় দূষণের মাত্রা বাড়ে এবং মাছের প্রাপ্যতাও কমে যায়।
ড. আজিজ বলেন, ‘তবে কোনো নদীর পানি কতোটুকু ভালো রয়েছে তা বোঝার উপায় হলো ডলফিন রয়েছে কি না। এক্ষেত্রে ডলফিনকে আমরা প্যারামিটার বা সূচক ধরতে পারি।’
ঢাকার নদীগুলোতে কত ডলফিন?
২০২৪-২৫ সালে বন অধিদপ্তর ও বিশ্বব্যাংকের সহায়তায় দেশে মিঠাপানির ডলফিন বা গাঙ্গেয় শুশুক নিয়ে জরিপ চালায় ওয়াইল্ডলাইফ কনজারভেশন সোসাইটি (ডব্লিউসিএস)। আন্তর্জাতিক মিঠাপানির ডলফিন দিবস উপলক্ষে গত অক্টোবর মাসে জরিপের ফল প্রকাশ করা হয়।
জরিপে দেশের ৪৫টি নদী ও সুন্দরবনের জলপথ মিলিয়ে মোট ৪ হাজার ৮৯৩ কিলোমিটার জলপথে ২ হাজার ৩০৭টি ডলফিন শনাক্ত করা হয়।
ঢাকার নদীগুলোতে ডলফিনের সংখ্যা সম্পর্কে ডব্লিউসিএসের কান্ট্রি ডিরেক্টর মো. জাহাঙ্গীর আলম বলেন, ‘আমাদের গবেষক দল বুড়িগঙ্গা নদীতে ৩টি ও তুরাগ নদীতে ৫টি ডলফিন চিহ্নিত করেছেন। এছাড়া বংশী নদীতেও আমরা ৭টি ডলফিন খুঁজে পেয়েছি। বুড়িগঙ্গায় যে তিনটি ডলফিন পাওয়া গেছে তা বসিলাতেই দেখা মিলেছে।’
দুই নদীর মিলনস্থলেই কেন ডলফিন?
বসিলা এলাকায় ডলফিনের উপস্থিতির ব্যাখ্যাও দিয়েছেন জাহাঙ্গীর আলম। তিনি বলেন, ‘বসিলায় দুটি নদী মিলিত হওয়ায় এখানে কিছুটা পানির ঘূর্ণি রয়েছে। এখানে ডলফিন থাকতে পছন্দ করে। এমন না যে এরা শুধু বসিলাতেই থাকে। এরা ঘুরে বেড়ায়। দুটি নদীর মিলন স্থলে স্রোত তৈরি হয়। অন্যান্য জায়গার চেয়ে ওখানে মাছ বেশী পাওয়া যায়। তাই অনায়াসে মাছ শিকার করতে পারে ডলফিন। এছাড়া পানির বাড়তি প্রবাহ থাকায় ডলফিনের ভেসে থাকাও সহজ হয়। নদীতে যেখানে স্রোত বেশি সেখানেই ডলফিন থাকতে পছন্দ করে।’
ডলফিন পানিতে বসবাস করলেও শ্বাস নেয় বাতাস থেকে। ফলে পানির দূষণের মধ্যেও তারা কোনোভাবে টিকে থাকতে পারছে বলে মনে করেন এই গবেষক। জাহাঙ্গীর আলম বলেন, ‘ডলফিন পানিতে থাকলেও ফুসফুসের সাহায্যে বাতাস থেকে শ্বাস নেয়। তাই ঢাকায় নদীর দূষিত পানির মধ্যেও কোনক্রমে তারা টিকে আছে।’
খাদ্যসংকটে শুশুক, ভরসা সাকার মাছ
তবে ঢাকার আশপাশের নদীগুলোতে গাঙ্গেয় শুশুক আর কতদিন টিকে থাকতে পারবে, তা নিয়ে উদ্বেগ রয়েছে।
জাহাঙ্গীর আলম বলেন, ‘দূষণের কারণে ঢাকার নদীগুলোর মাছ নেই বললেই চলে। এখন যা আছে প্রায় সবই সাকার মাছ। সেটি হোক বুড়িগঙ্গা, তুরাগ বা বংশী। আমি নিজেও ডলফিনকে মুখে সাকার মাছ নিয়ে ভেসে উঠতে দেখেছি।’
তার ভাষ্য, ‘ঢাকার নদ-নদীগুলোতে দুই দশক আগেও নিয়মিত ডলফিনের দেখা মিলত।’
অর্থাৎ নদীগুলোতে গাঙ্গেয় শুশুক এখনো পুরোপুরি হারিয়ে যায়নি। কিন্তু তাদের অস্তিত্ব টিকিয়ে রাখার জন্য নদীর পরিবেশ পুনরুদ্ধার জরুরি হয়ে উঠেছে।
দূষণ ও নৌযানই বড় বাধা
বুড়িগঙ্গায় ডলফিনের সংখ্যা বাড়াতে হলে নদীর দূষণ কমানোর পাশাপাশি নৌযান চলাচল নিয়ন্ত্রণের ওপরও গুরুত্ব দিয়েছেন জাহাঙ্গীর আলম।
তিনি বলেন, ‘বুড়িগঙ্গায় দূষণ সবচেয়ে বড় সমস্যা। প্রথমে নদী দূষণ রোধ করতে হবে। এখানে নৌযানের সংখ্যাও এখন অত্যধিক। বিশেষ করে বালুবাহী নৌযান। এগুলো ডলফিনের স্বাভাবিক চলাচলকে বাধাগ্রস্ত করে।’
তিনি আরও বলেন, ‘বুড়িগঙ্গায় ডলফিনের সংখ্যা বাড়াতে হলে প্রথমে নদীকে ডলফিনের বসবাসের অনুকূল অবস্থায় আনতে হবে। নদী দূষণের পাশাপাশি নৌযান চলাচল নিয়ন্ত্রণে রাখতে পারলে বুড়িগঙ্গায় ডলফিনের হারানো সুদিন ফিরবে। এক্ষেত্রে সকল কর্তৃপক্ষের সমন্বিত উদ্যোগ প্রয়োজন।’
বসিলার পানিতে মাঝেমধ্যে ভেসে ওঠা সেই ছোট্ট লাফ তাই শুধু বিস্ময়ের দৃশ্য নয়, ঢাকার দূষিত নদীতেও যে গাঙ্গেয় শুশুক এখনো টিকে থাকার চেষ্টা করছে, তারও একটি ইঙ্গিত। প্রশ্ন হলো, নদীর বর্তমান পরিবেশে এই বিরল জলজ স্তন্যপায়ীদের অস্তিত্ব আর কতদিন ধরে রাখা সম্ভব হবে।
সূত্র: The Daily Star বাংলা






