শুঁড়ের আলিঙ্গনে হাতিশাবক: কৃতজ্ঞতা নাকি নিরাপদ আশ্রয়, কী বলছে এই ছবি?

একটি নদী। নৌকার সরু পাটাতন। চারপাশে পানি। আর সেই ছোট্ট নৌকার ভেতর একটি হাতিশাবককে ঘিরে দুই মানুষের ব্যস্ততা। ছবিটিতে সবচেয়ে বেশি চোখে পড়ে হাতিশাবকটির শুঁড় দিয়ে একজন উদ্ধারকারীর শরীর জড়িয়ে ধরার মুহূর্তটি।

ছবিটি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ার পর অনেকেই বলছেন, হাতিশাবকটি যেন তার উদ্ধারকারীকে কৃতজ্ঞতা জানাতে গলা জড়িয়ে ধরেছে। কেউ কেউ এই দৃশ্যকে বলছেন মানুষের প্রতি বন্যপ্রাণীর ভালোবাসার এক অসাধারণ প্রকাশ।

তবে বন্যপ্রাণীর আচরণকে মানুষের আবেগ দিয়ে ব্যাখ্যা করার ক্ষেত্রে একটু সতর্ক হওয়া প্রয়োজন।

হাতির শুঁড় শুধু খাবার সংগ্রহ বা পানি পান করার অঙ্গ নয়। এটি তাদের স্পর্শ, গন্ধ নেওয়া, অনুসন্ধান, যোগাযোগ এবং সামাজিক সম্পর্কের অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ মাধ্যম। বিশেষ করে ছোট হাতিশাবক অপরিচিত পরিবেশে থাকলে কাছের মানুষ, হাতি কিংবা কোনো বস্তুকে শুঁড় দিয়ে স্পর্শ করে পরিস্থিতি বোঝার চেষ্টা করতে পারে।

তাই ছবির এই মুহূর্তটিকে নিশ্চিতভাবে ‘কৃতজ্ঞতার আলিঙ্গন’ বলা বৈজ্ঞানিকভাবে সম্ভব নয়। কিন্তু এটুকু বলা যায়, শাবকটি মানুষের শরীরের খুব কাছে এসে শুঁড় দিয়ে তাকে আঁকড়ে ধরেছে। সেই স্পর্শের পেছনে থাকতে পারে নিরাপত্তা খোঁজা, পরিচিতি তৈরি, কৌতূহল, স্বস্তি কিংবা উদ্ধারকারীর সঙ্গে তৈরি হওয়া সাময়িক আস্থার সম্পর্ক।

আর এখানেই ছবিটির সৌন্দর্য।

মানুষের ভাষা নেই তার সঙ্গে। নেই কোনো ধন্যবাদ জানানোর শব্দ। কিন্তু একটি অসহায় প্রাণ যখন বিপদের মুহূর্তে কোনো মানুষের শরীরের কাছে নিজেকে সঁপে দেয়, তখন সেই দৃশ্য আমাদের মনে গভীর একটি প্রশ্ন তৈরি করে, বন্যপ্রাণীকে আমরা কতটা বুঝতে শিখেছি?

আমরা প্রায়ই প্রাণীদের আচরণকে নিজেদের অনুভূতির আয়নায় দেখি। তারা হাসলে মনে করি আনন্দ, কাছে এলে মনে করি ভালোবাসা, শুঁড় দিয়ে জড়িয়ে ধরলে মনে করি কৃতজ্ঞতা। এসব ব্যাখ্যার কিছু অংশ হয়তো আমাদের মানবিক অনুভূতির প্রকাশ। কিন্তু প্রাণীর নিজস্ব ভাষা ও আচরণও আছে, যার অর্থ বুঝতে হলে আবেগের পাশাপাশি জীববিজ্ঞানকেও গুরুত্ব দিতে হবে।

কয়েক জন মানুষ একটি হাতিশাবককে বিপদ থেকে নিরাপদ জায়গায় নেওয়ার কাজে যুক্ত ছিলেন। আর শাবকটি তখন তাদের সংস্পর্শে রয়েছে। সেই মুহূর্তে তার কাছে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হতে পারে নিরাপত্তা।

হয়তো সে জানে না ‘উদ্ধার’ শব্দের অর্থ। জানে না ‘কৃতজ্ঞতা’ কী।

কিন্তু সে হয়তো বুঝতে পারছে, এই মুহূর্তে এই মানুষগুলোর কাছাকাছি থাকাটা নিরাপদ।

সেখানেই ছবিটির সবচেয়ে বড় শিক্ষা।

প্রকৃতির সঙ্গে সম্পর্ক গড়তে সবসময় ভাষার প্রয়োজন হয় না। কখনো কখনো একটি স্পর্শই যথেষ্ট।

তাই ছবিটিকে শুধু ‘হাতির কৃতজ্ঞতার আলিঙ্গন’ হিসেবে না দেখে আমরা এটিকে দেখতে পারি মানুষ ও বন্যপ্রাণীর মধ্যকার এক অসাধারণ মুহূর্ত হিসেবে, যেখানে একটি অসহায় প্রাণী মানুষের হাতে নিরাপত্তা খুঁজছে।

আর সেই দৃশ্য আমাদের মনে করিয়ে দেয়-

তাদেরও ভয় আছে, অনুভূতি আছে, সামাজিক বন্ধন আছে, বেঁচে থাকার অধিকার আছে।

হাতিশাবকটির শুঁড়ের সেই আলিঙ্গন তাই কৃতজ্ঞতার প্রমাণ হোক বা না হোক, মানুষের জন্য এটি অবশ্যই একটি দায়িত্বের স্মারক, বন্যপ্রাণী বিপদে পড়লে তাকে ভালোবাসার নামে বন্দি নয়, বরং নিরাপদভাবে তার স্বাভাবিক পরিবেশে ফিরিয়ে দেওয়াই আমাদের দায়িত্ব।

আরও পড়ুন

উটের চোখের পানিতে ২৬ সাপের বিষের প্রতিষেধক, দাবিটি কতটা সত্য?

উটের চোখের পানিতে এমন অ্যান্টিবডি রয়েছে, যা দুই ডজনেরও বেশি প্রজাতির বিষধর সাপের বিষ নিষ্ক্রিয় করতে পারে, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া এমন দাবি কৌতূহল...
জাতীয়
0
minutes

ফুটপাতের পিঠা-পুরির দোকানও আসছে নিবন্ধনের আওতায়, কার্যকর ১ নভেম্বর থেকে

সড়কের পাশে পিঠা, পুরি, ঝালমুড়ি ও পেঁয়াজু বিক্রির দোকান থেকে শুরু করে রেস্তোরাঁ, বেকারি ও খাদ্যপণ্য উৎপাদনকারী প্রতিষ্ঠান, নির্ধারিত শ্রেণির সব খাদ্য ব্যবসাকে নিবন্ধন...
কৃষি, কৃষক ও নিরাপদ খাবার
0
minutes

প্রকৃতির নীরব পরিচ্ছন্নতাকর্মী: কাকেরা কি চলে গেছে, নাকি হারিয়েছি আমরাই?

একসময় ভোরের শহর মানেই ছিল কাকের ডাক। ছাদের কার্নিশে, বৈদ্যুতিক তারে কিংবা বাড়ির পাশের ডাস্টবিনে দেখা মিলত তাদের। গ্রীষ্মের অলস দুপুরেও জানালার বাইরে থেকে...
জাতীয়
0
minutes

শেষ ইচ্ছা ছিল বীজ বাঁচানো, ৬০ প্রজাতির ধানে বেঁচে থাকবেন রামেট্টন

কেরলের আদিবাসী কৃষক চেরুভায়াল রামন নিজের জীবনের বড় একটি অংশ ব্যয় করেছেন হারিয়ে যেতে বসা দেশীয় ধানের বীজ সংরক্ষণে। অর্থনৈতিক কষ্ট, ব্যক্তিগত ত্যাগ কিংবা...
কৃষি, কৃষক ও নিরাপদ খাবার
0
minutes
spot_imgspot_img