খাবার বাঁচালেই বাঁচবে জলবায়ু: খাদ্যবর্জ্যে বাড়ছে মিথেন, উত্তপ্ত হচ্ছে পৃথিবী

খাবার শুধু মানুষের ক্ষুধা মেটায় না; একটি খাবার উৎপাদনের সঙ্গে জড়িয়ে থাকে পানি, কৃষিজমি, জ্বালানি, শ্রম ও প্রাকৃতিক সম্পদ। সেই খাবার যদি শেষ পর্যন্ত মানুষের পেটে না গিয়ে ময়লার ভাগাড়ে যায়, তার পরিবেশগত ক্ষতিও কম নয়। বরং পচতে থাকা খাদ্যবর্জ্য থেকে তৈরি হওয়া মিথেন জলবায়ু সংকটকে আরও তীব্র করে তুলছে।

জাতিসংঘের পরিবেশবিষয়ক সংস্থা ইউএনইপির তথ্য অনুযায়ী, খাদ্য অপচয় ও খাদ্যবর্জ্যের সঙ্গে বিশ্বের মোট গ্রিনহাউস গ্যাস নিঃসরণের প্রায় ৮ থেকে ১০ শতাংশ যুক্ত। এই পরিমাণ বৈশ্বিক উড়োজাহাজ পরিবহন খাতের মোট নিঃসরণের প্রায় পাঁচ গুণ।

প্রতিদিন নষ্ট হচ্ছে একশ কোটির বেশি খাবার

বিশ্বে খাবার অপচয়ের চিত্রও ভয়াবহ। ইউএনইপির Food Waste Index Report 2024 অনুযায়ী, ২০২২ সালে বিশ্বে প্রায় ১০৫ কোটি টন খাবার অপচয় হয়েছে। এর ৬০ শতাংশই হয়েছে মানুষের নিজ নিজ বাড়িতে। খাবার অপচয়ের পরিমাণ এত বেশি যে, শুধু পরিবারগুলোতেই প্রতিদিন অন্তত ১০০ কোটি খাবারের সমপরিমাণ খাদ্য নষ্ট হচ্ছে।

অন্যদিকে, বিশ্বে এখনো বিপুলসংখ্যক মানুষ খাদ্যসংকটে ভুগছে। ফলে খাদ্য অপচয় শুধু পরিবেশগত সমস্যা নয়; এর সঙ্গে খাদ্যনিরাপত্তা, অর্থনীতি ও সামাজিক বৈষম্যের বিষয়ও জড়িয়ে আছে।

ভাগাড়ে পচে তৈরি হয় মিথেন

খাদ্যবর্জ্য যখন ময়লার ভাগাড়ে জমা হয়, তখন অক্সিজেনের স্বল্প পরিবেশে জৈব পদার্থ পচতে থাকে। এই প্রক্রিয়ায় তৈরি হয় মিথেন গ্যাস, যা শক্তিশালী গ্রিনহাউস গ্যাস।

ইউএনইপির তথ্য অনুযায়ী, বায়ুমণ্ডলে প্রথম ২০ বছরে মিথেনের উষ্ণায়ন ক্ষমতা কার্বন ডাই-অক্সাইডের তুলনায় ৮০ গুণেরও বেশি। তাই স্বল্পমেয়াদে বৈশ্বিক উষ্ণায়ন কমানোর ক্ষেত্রে মিথেন নিঃসরণ নিয়ন্ত্রণ অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।

খাদ্যবর্জ্য ও অন্যান্য জৈব বর্জ্যকে যথাযথভাবে ব্যবস্থাপনা না করলে এই মিথেনের পরিমাণ আরও বাড়তে পারে। ইউএনইপির সাম্প্রতিক তথ্য বলছে, শুধু ভাগাড়ে পচতে থাকা খাদ্য থেকেই বিশ্বে উল্লেখযোগ্য পরিমাণ মিথেন তৈরি হচ্ছে।

খাবার নষ্ট মানে পানি-জমি-জ্বালানিও নষ্ট

এক প্লেট খাবার নষ্ট হওয়ার অর্থ শুধু খাবারটির অপচয় নয়। সেই খাবার উৎপাদনে ব্যবহৃত পানি, কৃষিজমি, সার, জ্বালানি ও শ্রমও কার্যত অপচয় হয়ে যায়।

জাতিসংঘের হিসাবে, বিশ্বে উৎপাদিত খাদ্যের একটি বড় অংশ শেষ পর্যন্ত মানুষের খাদ্য হিসেবে ব্যবহৃত হয় না। খাদ্য উৎপাদনের জন্য ব্যবহৃত কৃষিজমিরও একটি উল্লেখযোগ্য অংশ এমন খাদ্য উৎপাদনে ব্যবহৃত হয়, যা পরে নষ্ট হয়ে যায়। ইউএনইপির হিসাবে খাদ্য অপচয়ের সঙ্গে বিশ্বের কৃষিজমির প্রায় ২৮ শতাংশ ব্যবহারের বিষয়টি জড়িত এবং কৃষিতে ব্যবহৃত মিঠা পানিরও বড় একটি অংশ এ প্রক্রিয়ায় অপচয় হয়।

এর সঙ্গে যুক্ত হয় বন উজাড়ের ঝুঁকি। কৃষিজমির চাহিদা বাড়লে নতুন জমি তৈরির জন্য বন ধ্বংস হতে পারে। ফলে একদিকে কার্বন নিঃসরণ বাড়ে, অন্যদিকে কার্বন শোষণকারী বনভূমি কমে যায়।

খাদ্য অপচয় কমানো হতে পারে দ্রুত জলবায়ু সমাধান

জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব এখন আর শুধু পরিবেশের মধ্যে সীমাবদ্ধ নেই। অতিরিক্ত তাপ, খরা, বন্যা ও চরম আবহাওয়া কৃষি উৎপাদনকে বাধাগ্রস্ত করছে। এর প্রভাব পড়ছে খাদ্যের সরবরাহ ও দামের ওপরও।

এই পরিস্থিতিতে খাদ্য অপচয় কমানো তুলনামূলকভাবে দ্রুত ফল দিতে পারে। কারণ খাদ্য উৎপাদন, পরিবহন ও সংরক্ষণের পর্যায়ে অপচয় কমানোর পাশাপাশি ভাগাড়ে পচে মিথেন তৈরির পরিমাণও কমানো সম্ভব।

ইউএনইপি বলছে, খাদ্য অপচয় কমানো একই সঙ্গে জলবায়ু পরিবর্তন মোকাবিলা, খাদ্যনিরাপত্তা জোরদার এবং অর্থনৈতিক ক্ষতি কমাতে সাহায্য করতে পারে।

বর্জ্য থেকেই তৈরি হতে পারে সম্পদ

বিশ্বের বিভিন্ন দেশে খাদ্যবর্জ্য ব্যবস্থাপনায় নতুন নতুন পদ্ধতি ব্যবহার করা হচ্ছে। জৈব বর্জ্যকে কম্পোস্টে পরিণত করা, পশুখাদ্য বা অন্যান্য কাজে ব্যবহার করা এবং উন্নত বর্জ্য ব্যবস্থাপনার মাধ্যমে ভাগাড়ে পাঠানো কমানো হচ্ছে।

কিছু দেশে ব্ল্যাক সোলজার ফ্লাই বা এক ধরনের মাছির লার্ভা ব্যবহার করেও খাদ্যবর্জ্যকে পুনর্ব্যবহারের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। এ ধরনের পদ্ধতিতে জৈব বর্জ্যকে সম্পদে পরিণত করার সুযোগ তৈরি হচ্ছে।

২০৩০ সালের লক্ষ্য এখনো দূরে

জাতিসংঘের টেকসই উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রায় ২০৩০ সালের মধ্যে মাথাপিছু বৈশ্বিক খাদ্য অপচয় অর্ধেকে নামিয়ে আনার লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে। কিন্তু বর্তমান অগ্রগতি সেই লক্ষ্য অর্জনের জন্য যথেষ্ট নয়। ইউএনইপির তথ্য অনুযায়ী, ২০২২ সালের হিসাবেই বিশ্বের মোট খাদ্য অপচয়ের পরিমাণ ছিল প্রায় ১০৫ কোটি টন।

তাই খাদ্য অপচয়কে শুধু ব্যক্তিগত অভ্যাস বা বর্জ্য ব্যবস্থাপনার সমস্যা হিসেবে দেখলে চলবে না। একটি খাবার নষ্ট হওয়ার সঙ্গে জড়িয়ে আছে জলবায়ু, পানি, কৃষিজমি, বন ও খাদ্যনিরাপত্তার প্রশ্ন।

পৃথিবী যখন জলবায়ু সংকটের দ্রুত সমাধান খুঁজছে, তখন খাবার নষ্ট না করাই হতে পারে সবচেয়ে সহজ ও কার্যকর পদক্ষেপগুলোর একটি। খাবারের অপচয় বন্ধ করা মানে শুধু খাবার বাঁচানো নয়, পানি, জমি, বন ও ভবিষ্যতের জলবায়ুকেও বাঁচানো।

আরও পড়ুন

প্লাস্টিক বর্জ্য ও দূষণ নিয়ন্ত্রণে সহযোগিতা বাড়াবে ইউএনডিপি

পরিবেশ, বন ও জলবায়ু পরিবর্তন মন্ত্রী আবদুল আউয়াল মিন্টুর সঙ্গে সাক্ষাৎ করেছেন বাংলাদেশে নিযুক্ত জাতিসংঘ উন্নয়ন কর্মসূচির (ইউএনডিপি) আবাসিক প্রতিনিধি স্টিফেন রড্রিকস। বৃহস্পতিবার (৮ অক্টোবর)...
জাতীয়
0
minutes

মানুষের কুকর্মের সাক্ষী হয়ে জন্ম নিচ্ছে ‘প্লাস্টিক পাথর’

ভাবুন, কয়েক হাজার বছর পর কোনো ভূতত্ত্ববিদ মাটির গভীরে খুঁজে পেলেন একটি অদ্ভুত পাথর। দেখতে অনেকটা সাধারণ শিলার মতো, কিন্তু সেটিকে ভালোভাবে পরীক্ষা করতেই...
দূষণ ও দখল
0
minutes

লালবাগে ১৩ বাসে পরিবেশ অধিদপ্তরের অভিযান, জরিমানা ১০ হাজার ৯০০ টাকা

রাজধানীর লালবাগে পরিবেশ অধিদপ্তরের মোবাইল কোর্ট অভিযানে অতিরিক্ত গ্যাসীয় নিঃসরণ ও হাইড্রলিক হর্ন ব্যবহারের দায়ে ছয়টি মামলায় মোট ১০ হাজার ৯০০ টাকা জরিমানা আদায়...
জাতীয়
0
minutes

তুরাগ দূষণ নিয়ন্ত্রণে আশুলিয়ায় ৫ শিল্পপ্রতিষ্ঠানে পরিবেশ অধিদপ্তরের অভিযান

তুরাগ ও বুড়িগঙ্গা নদীর দূষণ নিয়ন্ত্রণে ঢাকার আশুলিয়া এলাকায় পাঁচটি শিল্পপ্রতিষ্ঠানে মনিটরিং ও এনফোর্সমেন্ট কার্যক্রম পরিচালনা করেছে পরিবেশ অধিদপ্তর। মঙ্গলবার (৬ অক্টোবর) রোস্টারভিত্তিক এ...
দূষণ ও দখল
0
minutes
spot_imgspot_img