ভাবুন, কয়েক হাজার বছর পর কোনো ভূতত্ত্ববিদ মাটির গভীরে খুঁজে পেলেন একটি অদ্ভুত পাথর। দেখতে অনেকটা সাধারণ শিলার মতো, কিন্তু সেটিকে ভালোভাবে পরীক্ষা করতেই বেরিয়ে এলো চমকে দেওয়ার মতো তথ্য, পাথরের ভেতরে আটকে আছে প্লাস্টিকের টুকরো, বালু, প্রবাল, ঝিনুক আর পাথরের কণা।
ভবিষ্যতের কোনো সভ্যতার কাছে এটি হয়তো হবে এক বিস্ময়কর আবিষ্কার। তারা হয়তো ভাববে, কীভাবে একটি পাথরের মধ্যে এমন বিচিত্র সব উপাদান একসঙ্গে বন্দি হলো?
কিন্তু এটি কল্পকাহিনি নয়। পৃথিবীর কিছু সমুদ্রসৈকতে এমন অদ্ভুত শিলাসদৃশ বস্তু ইতোমধ্যে তৈরি হয়েছে। এর নাম প্লাস্টিগ্লোমেরেট।
হাওয়াইয়ের কয়েকটি সমুদ্রসৈকতে এই ধরনের বস্তু নিয়ে গবেষণার পর বিজ্ঞানীদের সামনে উঠে আসে মানুষের ফেলে দেওয়া প্লাস্টিকের এক অপ্রত্যাশিত পরিণতি। সমুদ্রসৈকতে ক্যাম্পফায়ার বা আগুনের প্রচণ্ড তাপে আশপাশে পড়ে থাকা প্লাস্টিক গলে যায়। সেই গলিত প্লাস্টিক তখন বালু, পাথর, ব্যাসল্ট, প্রবাল ও ঝিনুকের টুকরোর সঙ্গে মিশে যেতে পারে।

পরে আগুন নিভে গেলে মিশ্রণটি ঠান্ডা হয়ে শক্ত হয়। এভাবেই তৈরি হয় পাথরের মতো শক্ত এক ধরনের নতুন বস্তু- প্লাস্টিগ্লোমেরেট।
আবর্জনা থেকে ‘পাথর’
প্রকৃতিতে পাথর তৈরি হতে সাধারণত দীর্ঘ সময় লাগে। তাপ, চাপ, ক্ষয় ও ভূতাত্ত্বিক নানা প্রক্রিয়ার মধ্য দিয়ে শিলা পরিবর্তিত হয়। কিন্তু প্লাস্টিগ্লোমেরেটের ক্ষেত্রে মানুষের তৈরি প্লাস্টিক খুব অল্প সময়ের মধ্যেই প্রাকৃতিক উপাদানের সঙ্গে মিশে একটি শক্ত শিলাসদৃশ বস্তু তৈরি করতে পারে।
এখানেই বিষয়টি হয়ে ওঠে আরও গুরুত্বপূর্ণ।
কারণ প্লাস্টিক এমনিতেই পরিবেশে দীর্ঘ সময় টিকে থাকতে পারে। আর যখন সেটি বালু, পাথর, প্রবাল বা ঝিনুকের সঙ্গে শক্তভাবে আটকে যায়, তখন তার স্থায়িত্ব আরও দীর্ঘ হতে পারে। অর্থাৎ আজ সমুদ্রসৈকতে ফেলে দেওয়া একটি প্লাস্টিকের টুকরো শুধু আজকের দূষণের অংশ নয়; সেটি ভবিষ্যতের ভূতাত্ত্বিক রেকর্ডেরও অংশ হয়ে উঠতে পারে।
ভবিষ্যতের পৃথিবীর কাছে মানুষের চিহ্ন
পৃথিবীর ভূতাত্ত্বিক স্তর অনেকটা একটি বিশাল ইতিহাসের বই। কোটি কোটি বছর ধরে বিভিন্ন প্রাকৃতিক ঘটনা, জলবায়ু পরিবর্তন, আগ্নেয়গিরির অগ্ন্যুৎপাত কিংবা জীবের বিবর্তনের চিহ্ন বিভিন্ন স্তরে সংরক্ষিত হয়েছে।
এখন সেই ইতিহাসে মানুষের তৈরি নতুন একটি উপাদান যোগ হচ্ছে- প্লাস্টিক।
ভবিষ্যতে কোনো বিজ্ঞানী যদি এমন কোনো শিলাস্তর পরীক্ষা করেন, যেখানে প্রাকৃতিক খনিজের সঙ্গে কৃত্রিম পলিমারের উপস্থিতি পাওয়া যায়, তাহলে সেটি বর্তমান সময়ের মানুষের জীবনযাপন সম্পর্কে গুরুত্বপূর্ণ তথ্য দিতে পারে।
তারা হয়তো বুঝতে পারবেন, এই সময়ে পৃথিবীতে এমন একটি উপাদানের ব্যাপক ব্যবহার ছিল, যা প্রকৃতিতে স্বাভাবিকভাবে তৈরি হয়নি।
একটি ছোট প্লাস্টিকের বোতল, খাবারের মোড়ক কিংবা ব্যবহার শেষে ফেলে দেওয়া কোনো প্লাস্টিকের টুকরো হয়তো তখন আর আবর্জনা হিসেবে আলাদা করে চেনা যাবে না। সেটি হয়তো মিশে থাকবে একটি শক্ত শিলার মধ্যে।
‘ফসিল’ নাকি দূষণের স্মারক?
প্লাস্টিগ্লোমেরেটকে সরাসরি প্রচলিত অর্থে ফসিল বলা ঠিক হবে না। ফসিল সাধারণত অতীত জীব বা জীবনের চিহ্ন সংরক্ষিত হওয়ার ফল। প্লাস্টিগ্লোমেরেট মূলত মানুষের তৈরি প্লাস্টিক এবং প্রাকৃতিক উপাদানের মিশ্রণে তৈরি শিলাসদৃশ বস্তু।
তবে এটি নিঃসন্দেহে মানুষের কর্মকাণ্ডের একটি দীর্ঘস্থায়ী চিহ্ন হতে পারে।
এ কারণেই প্লাস্টিগ্লোমেরেটকে শুধু অদ্ভুত একটি পাথর হিসেবে দেখলে পুরো বিষয়টি বোঝা যায় না। এটি একই সঙ্গে প্লাস্টিক দূষণের একটি দৃশ্যমান নিদর্শন এবং পৃথিবীর পরিবেশে মানুষের ক্রমবর্ধমান প্রভাবের একটি সতর্কবার্তা।
প্রকৃতির সঙ্গে মানুষের সম্পর্ক কতটা বদলে গেছে, তারও যেন একটি কঠিন প্রমাণ এটি।
ভবিষ্যৎ প্রজন্ম কী দেখবে?
আজকের পৃথিবীতে প্লাস্টিক আমাদের দৈনন্দিন জীবনের অবিচ্ছেদ্য অংশ। পানি, খাবার, পোশাক, চিকিৎসা থেকে শুরু করে শিল্প, প্রায় সব ক্ষেত্রেই এর ব্যবহার রয়েছে। কিন্তু ব্যবহারের পর সেই প্লাস্টিকের বড় একটি অংশ শেষ পর্যন্ত বর্জ্যে পরিণত হয়।
এর কিছু নদী-নালা পেরিয়ে সমুদ্রে যায়। কিছু মাটিতে পড়ে থাকে। আবার কিছু আগুনে পুড়ে বা গলে অন্য উপাদানের সঙ্গে মিশে যায়।
প্লাস্টিগ্লোমেরেট সেই পরিবর্তনেরই একটি অদ্ভুত উদাহরণ।
হয়তো হাজার বছর পর কোনো গবেষক পৃথিবীর কোনো পুরোনো স্তর পরীক্ষা করতে গিয়ে মানুষের তৈরি প্লাস্টিকের চিহ্ন খুঁজে পাবেন। তখন সেই শিলা শুধু একটি প্রাকৃতিক বস্তু হবে না; হয়ে উঠবে মানুষের এক যুগের গল্প বলা একটি নিদর্শন।
প্রশ্ন তাই শুধু এটি নয় যে, প্লাস্টিক দিয়ে তৈরি এমন পাথর ভবিষ্যতে কত দিন টিকে থাকবে।
প্রশ্ন আরও বড়, ভবিষ্যতের পৃথিবী যখন আমাদের সময়ের দিকে তাকাবে, তখন মানুষের রেখে যাওয়া সবচেয়ে বড় চিহ্নগুলোর একটি কি হবে প্লাস্টিক?
সমুদ্রসৈকতে পড়ে থাকা একটি ছোট প্লাস্টিকের টুকরো আজ হয়তো তুচ্ছ আবর্জনা। কিন্তু প্রকৃতির দীর্ঘ ইতিহাসে সেটিই হয়তো একদিন হয়ে উঠতে পারে মানুষের উপস্থিতির এক অদ্ভুত স্বাক্ষর।
সূত্র: দর্পণ






