রাজশাহী, চাঁপাইনবাবগঞ্জ ও নওগাঁর বরেন্দ্র অঞ্চলে ভূগর্ভস্থ পানির স্তর আশঙ্কাজনকভাবে নেমে যাওয়ায় ১৫৩টি ইউনিয়নকে পানিসংকটাপন্ন ঘোষণা করেছিল সরকার। এসব এলাকায় নতুন নলকূপ স্থাপন, সেচে ভূগর্ভস্থ পানির ব্যবহার, অধিক পানিনির্ভর ফসলের আবাদ এবং ভূগর্ভস্থ পানিনির্ভর নতুন শিল্প স্থাপনে একাধিক বিধিনিষেধ আরোপ করা হয়। পাশাপাশি বৃষ্টির পানি সংরক্ষণ, ভূপৃষ্ঠের পানির ব্যবহার বাড়ানো এবং নদী-খাল-পুকুর পুনঃখননের নির্দেশনা দেওয়া হয়।
কিন্তু পানিসংকটাপন্ন এলাকা ঘোষণার আট মাস পরও এসব বিধিনিষেধের কার্যকর প্রয়োগে ঘাটতি রয়ে গেছে। কোথাও বিকল্প সেচের ব্যবস্থা গড়ে ওঠেনি, কোথাও জলাশয় ইজারামুক্ত করা যায়নি। আবার সংকটাপন্ন এলাকা চিহ্নিত করার পদ্ধতি নিয়েও প্রশ্ন উঠেছে। অন্যদিকে ব্যক্তিগত সেচ নিয়ন্ত্রণে প্রশাসনের সীমাবদ্ধতা এবং বাস্তবায়নের দায়িত্ব বহু প্রতিষ্ঠানের মধ্যে ভাগ হয়ে থাকায় জবাবদিহি নিয়েও তৈরি হয়েছে অনিশ্চয়তা।
১৫৩ ইউনিয়ন পানিসংকটাপন্ন ঘোষণা
গত বছরের আগস্টে জাতীয় পানিসম্পদ পরিষদের নির্বাহী কমিটির সভায় রাজশাহী, চাঁপাইনবাবগঞ্জ ও নওগাঁর পানির পরিস্থিতি নিয়ে পানিসম্পদ পরিকল্পনা সংস্থার সমীক্ষা উপস্থাপন করা হয়।
সমীক্ষায় তিন জেলার ২৫ উপজেলার ২১৫টি ইউনিয়নের ৪ হাজার ৯১১টি মৌজাকে পানিসংকটের মাত্রা অনুযায়ী তিনটি শ্রেণিতে ভাগ করা হয়। এর মধ্যে ৪৭ ইউনিয়নের ১ হাজার ৪৬৯টি মৌজাকে অতি উচ্চ, ৪০ ইউনিয়নের ৮৮৪টি মৌজাকে উচ্চ এবং ৬৬ ইউনিয়নের ১ হাজার ২৪০টি মৌজাকে মধ্যম পানিসংকটাপন্ন হিসেবে চিহ্নিত করা হয়।
এরপর ২২ জানুয়ারি ‘পানিসংকটাপন্ন এলাকা ঘোষণা আদেশ (সংশোধিত)’ শীর্ষক গেজেট প্রকাশ করা হয়। গেজেট অনুযায়ী, ঘোষিত ইউনিয়ন ও মৌজাগুলোকে পরবর্তী ১০ বছরের জন্য পানিসংকটাপন্ন এলাকা হিসেবে নির্ধারণ করা হয়।
বিধিনিষেধ আছে, বাস্তবায়ন কতটা?
প্রজ্ঞাপনে পানিসংকটাপন্ন এলাকায় খাওয়ার পানি ছাড়া অন্য কাজে নতুন নলকূপ স্থাপন ও ভূগর্ভস্থ পানি উত্তোলন বন্ধের নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। ফসল নির্বাচনসহ প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নিয়ে দুই বছরের মধ্যে সেচে ভূগর্ভস্থ পানির ব্যবহার বন্ধ করার কথা বলা হয়েছে। একই সঙ্গে ভূগর্ভস্থ পানিনির্ভর নতুন শিল্প বা প্রতিষ্ঠান স্থাপন নিষিদ্ধ করা হয়েছে।
এ ছাড়া খাল, বিল, পুকুর ও নদীর শ্রেণি পরিবর্তন কিংবা জলস্রোতের স্বাভাবিক প্রবাহে বাধা দেওয়া যাবে না। খাস জলাশয় ও জলমহাল ইজারা দিতে নিরুৎসাহিত করা হয়েছে। নদী, জলাশয় ও জলাভূমিতে অপরিশোধিত বর্জ্য ফেলা নিষিদ্ধ করা হয়েছে। অধিক পানিনির্ভর ফসলের আবাদ সীমিত করে পানিসাশ্রয়ী ফসল চাষে গুরুত্ব দেওয়ার নির্দেশনাও রয়েছে। বিধিনিষেধ লঙ্ঘন শাস্তিযোগ্য অপরাধ।
তবে মাঠপর্যায়ে এসব নির্দেশনার বাস্তবায়ন পুরোপুরি নিশ্চিত করা যায়নি। অনেক এলাকায় কৃষকদের পানিসাশ্রয়ী ফসল চাষে উৎসাহিত করা যাচ্ছে না। বিকল্প সেচের উৎস হিসেবে পুকুর ও খাল ব্যবহারের উদ্যোগও পর্যাপ্ত নয়।
নওগাঁর সাপাহার উপজেলার আইহাই, গোয়ালা, সাপাহার, শিরণ্ডী ও তিলনা ইউনিয়নকে অতি উচ্চ পানিসংকটাপন্ন হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে। তবে উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা মো. মনিরুজ্জামান প্রথম আলোকে বলেন, তিলনা ও সাপাহারে ভূগর্ভস্থ পানির সংকট তীব্র হলেও অন্য ইউনিয়নগুলোতে সংকট ততটা তীব্র নয়।
চাঁপাইনবাবগঞ্জে প্রায় সাড়ে ছয় হাজার পুকুর রয়েছে। এর মধ্যে ১ হাজার ১০০টি সংস্কার করা হয়েছে। তবে এসব পুকুরকে বিকল্প সেচের উৎস হিসেবে কার্যকরভাবে ব্যবহার করা যাচ্ছে না।
বরেন্দ্র বহুমুখী উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের (বিএমডিএ) নির্বাহী প্রকৌশলী মো. আল মামুনুর রশীদ প্রথম আলোকে বলেন, উচ্চ সংকটাপন্ন এলাকায় জলাশয় ইজারামুক্ত করা সম্ভব হয়নি।
সংকটাপন্ন এলাকা চিহ্নিতকরণ নিয়ে প্রশ্ন
পানিসংকটাপন্ন হিসেবে ঘোষিত কিছু এলাকার প্রকৃত পানির পরিস্থিতি নিয়ে স্থানীয় প্রকৌশলী ও কৃষিবিদদের একাংশ প্রশ্ন তুলেছেন। তাঁদের মতে, ঘোষিত তালিকার সব এলাকায় সংকটের মাত্রা সমান নয়।
চাঁপাইনবাবগঞ্জের শিবগঞ্জ উপজেলার পাঁকা ইউনিয়নের পাঁচটি মৌজাকে মধ্যম পানিসংকটাপন্ন ঘোষণা করা হয়েছে। অথচ এসব এলাকার একদিকে পদ্মা, অন্যদিকে মহানন্দা নদী প্রবাহিত হয়েছে। স্থানীয় বাসিন্দাদের ভাষ্য অনুযায়ী, কোনো কোনো স্থানে মাত্র ১০ ফুট মাটি খুঁড়লেই পানি পাওয়া যায়।
এ বিষয়ে স্থানীয় লোকজনের সঙ্গে মতবিনিময়ের অভিজ্ঞতা তুলে ধরে বিএমডিএর এক কর্মকর্তা প্রশ্ন তোলেন, এমন এলাকায় পানিসংকটের শ্রেণিবিন্যাস কীভাবে নির্ধারণ করা হয়েছে।
তবে পানিসংকটাপন্ন এলাকা নির্ধারণে ব্যবহৃত সমীক্ষার পদ্ধতি নিয়ে পানিবিশেষজ্ঞ চৌধুরী সারোয়ার জাহান বলেন, ‘এ বিতর্ক তৈরি করা হয়েছে। আমরা আমাদের পদ্ধতি অনুসরণ করে এটা করেছি। এটা নিয়ে পর্যালোচনা হতে পারে।’
অর্থাৎ, পানিসংকটের প্রকৃত মাত্রা নির্ধারণে সমীক্ষার পদ্ধতি ও স্থানীয় বাস্তবতার মধ্যে কোনো অসংগতি রয়েছে কি না, তা পর্যালোচনার সুযোগ রয়েছে।
ব্যক্তিগত সেচ নিয়ন্ত্রণে দুর্বলতা
বরেন্দ্র অঞ্চলে বড় পরিসরে সেচ কার্যক্রম পরিচালনা করে বিএমডিএ। প্রতিষ্ঠানটির নিয়ন্ত্রিত সেচ এলাকায় নতুন বিধিনিষেধ অনুসরণের উদ্যোগ থাকলেও ব্যক্তিগত বা বেসরকারি সেচের ক্ষেত্রে একই ধরনের নিয়ন্ত্রণ নিশ্চিত করা কঠিন হয়ে পড়েছে।
চাঁপাইনবাবগঞ্জে ১ লাখ ২৮ হাজার হেক্টর আবাদি জমির মধ্যে ৭২ হাজার হেক্টর বিএমডিএর সেচের আওতায়। বাকি জমিতে ব্যক্তিগত ব্যবস্থাপনায় সেচ দেওয়া হয়।
পানিবিশেষজ্ঞ চৌধুরী সারোয়ার জাহান স্বীকার করেন, ব্যক্তিগত সেচ নিয়ন্ত্রণ করা যাচ্ছে না। ফলে সরকারি সেচব্যবস্থায় বিধিনিষেধ আরোপ করলেও পুরো অঞ্চলে ভূগর্ভস্থ পানির ব্যবহার কমানোর লক্ষ্য অর্জন কঠিন হতে পারে।
দায়িত্ব অনেক প্রতিষ্ঠানের, জবাবদিহি কার?
পানিসংকট মোকাবিলায় প্রকাশিত প্রজ্ঞাপনে জনস্বাস্থ্য প্রকৌশল অধিদপ্তর, পানি উন্নয়ন বোর্ড, বিএমডিএ, কৃষি উন্নয়ন করপোরেশন, কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর, পরিবেশ অধিদপ্তর, স্থানীয় সরকার প্রকৌশল অধিদপ্তর, ভূমি মন্ত্রণালয় এবং জেলা ও স্থানীয় প্রশাসনসহ একাধিক প্রতিষ্ঠানকে দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে।
তবে এতগুলো প্রতিষ্ঠানের মধ্যে দায়িত্ব ভাগ করা হলেও সার্বিক বাস্তবায়নের জন্য এককভাবে জবাবদিহি করবে, এমন প্রতিষ্ঠান নির্ধারণ করা হয়নি।
বিএমডিএর নির্বাহী পরিচালক মো. জাহাঙ্গীর আলম খানের মতে, এ ক্ষেত্রে বড় দায়িত্ব বিএমডিএর। অন্য প্রতিষ্ঠানগুলো সহায়ক ভূমিকা পালন করবে।
কিন্তু দায়িত্বের পরিধি, সমন্বয় ও জবাবদিহির কাঠামো স্পষ্ট না হলে বিধিনিষেধ বাস্তবায়নে সমন্বয়হীনতা তৈরি হওয়ার আশঙ্কা থাকে। বিশেষ করে ব্যক্তিগত সেচ নিয়ন্ত্রণ, জলাশয় সংরক্ষণ এবং কৃষকদের বিকল্প ফসল চাষে উৎসাহিত করার ক্ষেত্রে সমন্বিত উদ্যোগ প্রয়োজন।
শুধু গেজেট নয়, প্রয়োজন কার্যকর উদ্যোগ
বরেন্দ্র অঞ্চলে পানিসংকটাপন্ন এলাকা ঘোষণা ভূগর্ভস্থ পানির সংকটের গভীরতা আনুষ্ঠানিকভাবে স্বীকার করার একটি গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ। কিন্তু ঘোষণার পাশাপাশি বিকল্প পানির উৎস তৈরি, বৃষ্টির পানি সংরক্ষণ, জলাশয় পুনরুদ্ধার, পানিসাশ্রয়ী কৃষি সম্প্রসারণ এবং ব্যক্তিগত সেচ নিয়ন্ত্রণে কার্যকর ব্যবস্থা নেওয়া জরুরি।
পানিবিশেষজ্ঞ চৌধুরী সারোয়ার জাহানের মতে, বিকল্প পানির উৎস, অর্থায়ন, তদারকি ও জবাবদিহির ব্যবস্থা কার্যকর না হলে শুধু গেজেট প্রকাশ করে ভূগর্ভস্থ পানির স্তর নেমে যাওয়া ঠেকানো সম্ভব হবে না।
বরেন্দ্র অঞ্চলের পানিসংকট মোকাবিলায় তাই এখন বড় প্রশ্ন- বিধিনিষেধের তালিকা কত দীর্ঘ, তা নয়; বরং সেগুলো বাস্তবে কতটা কার্যকর হচ্ছে। সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানগুলোর সমন্বিত উদ্যোগ, নিয়মিত তদারকি এবং জবাবদিহি নিশ্চিত করা না গেলে পানিসংকট মোকাবিলার সরকারি ঘোষণা কাগজেই সীমাবদ্ধ থেকে যাওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।






