পরীক্ষার চাপে কয়েক দিন ক্যাম্পাসের গাছগুলোর কাছে যাওয়া হয়নি রাতুল মুন্সীর। পরীক্ষা শেষে গিয়ে দেখেন, নিজের হাতে লাগানো ঝুমকোলতাটি মাটিতে লুটিয়ে আছে। তাঁর মনে হলো, গাছটি যেন অভিমান করে জিজ্ঞেস করছে, ‘এত দিন কই ছিলা?’
অন্যের কাছে কথাটি কল্পনা মনে হতে পারে। কিন্তু রাতুলের কাছে তা নয়। তাঁর বিশ্বাস, গাছও কথা বলতে পারে, মান-অভিমান করে।
‘গাছ আসলেই কথা বলতে পারে। মান-অভিমান করে,’ বলেন রাতুল।
জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলাম বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক শিক্ষার্থী রাতুল পেশায় সাংবাদিক। তবে এক যুগের বেশি সময় ধরে সাংবাদিকতার পাশাপাশি গাছ লাগানো ও বন বাঁচানোর কাজও করছেন তিনি। নিজের উদ্যোগে এবং বিভিন্ন সংগঠনের কর্মসূচিতে এ পর্যন্ত হাজারের বেশি চারা রোপণ করেছেন।
দেশে বৃক্ষরোপণের সাফল্য সাধারণত কতটি চারা লাগানো হলো, সেই হিসাব দিয়ে মাপা হয়। কিন্তু কতটি চারা শেষ পর্যন্ত বেঁচে থাকল, সে খোঁজ খুব একটা নেওয়া হয় না। রাতুলের হিসাব ঠিক উল্টো। তাঁর কাছে গুরুত্বপূর্ণ হলো, চারাটি ঠিকমতো মাটিতে লাগানো হলো কি না, শেষ পর্যন্ত টিকে থাকল কি না।
তাঁর কথায়, ‘সংখ্যা হিসাব করে তো আর বৃক্ষরোপণ করা যায় না। লাভ-লোকসানের হিসাব করলে তো আমি ব্যবসায়ী হয়ে গেলাম।’
শৈশবের শালবন, হারিয়ে যাওয়া বন্যপ্রাণী
ছোটবেলায় রাতুলের বাড়ি থেকে প্রায় তিন কিলোমিটার দূরে ছিল ঘন শালবন। বনটি এতটাই গভীর ছিল যে সেখানে ঢুকতে ভয় পেতেন তিনি। বছরে একবার বনভোজনে দল বেঁধে যাওয়া হতো। ফেরার সময় সবার হাতে থাকত বুনো ফল।
সেই বন এখন অনেকটাই ফাঁকা। খাবার ও আশ্রয় হারিয়ে বন্যপ্রাণীরা লোকালয়ে চলে আসছে। আর লোকালয়ে ঢুকে পড়া প্রাণীদের পিটিয়ে মারছে মানুষ। এই দৃশ্যই সবচেয়ে বেশি পোড়ায় রাতুলকে।
গাছের প্রতি তাঁর টান অবশ্য শুরু হয়েছিল বাড়ির উঠান থেকেই। গোলাপ ও কামরাঙার চারা কিনবেন বলে বাবার কাছে টাকা চেয়েছিলেন। কিন্তু টাকা না পেয়ে নিজের মাটির ব্যাংক ভেঙে কিনে আনেন দুটি গোলাপ ও একটি কামরাঙার চারা।
কামরাঙা গাছে ঝাঁক বেঁধে টিয়া পাখি বসতে দেখেছেন তিনি। বাড়ির চালের ওপর ঝুঁকে ছিল বড় একটি জাম্বুরা গাছ। ফুলের মৌসুমে জানালা দিয়ে ভেসে আসত ফুলের গন্ধ, যা ভরিয়ে দিত পুরো বাড়ি।
সেই স্মৃতি এখনো তাঁকে টানে। রাতুল বলেন, ‘জাম্বুরা ফুল ফোটার সময় যত ব্যস্ততাই থাকুক, বাড়িতে যাই। শুধু ফুলের গন্ধটা নেওয়ার জন্য।’
ক্যাম্পাসে তাঁর লাগানো বটগাছটিও এখন বড় হয়েছে। শিক্ষক ড. দ্রাবিড় সৈকত গাছটির নাম রেখেছেন ‘রাতুলবট’। পরিবেশের পাঠ রাতুল পেয়েছেন এই শিক্ষকের কাছেই।
৩৭ দিনের আন্দোলন, গাছ পাহারায় রাতুল
২০১৯ সালের অক্টোবরে শালবন রক্ষার আন্দোলনে নামেন রাতুল ও তাঁর সঙ্গীরা। টানা ৩৭ দিন চলে তাঁদের আন্দোলন। বন এলাকায় ভবন নির্মাণের উদ্বোধনের চেষ্টা হয়েছিল দুবার। দুবারই বাধা দেন তাঁরা।
দিনভর গাছ পাহারা দিতেন আন্দোলনকারীরা। আড্ডা, বৈঠক কিংবা পরদিনের কর্মসূচি ঠিক করা, সবই চলত গাছতলায়। পূজার ছুটিতেও কয়েকজন বাড়ি যাননি। তাঁদের আশঙ্কা ছিল, ফাঁকা পেলেই গাছে কোপ পড়বে।
আন্দোলনকারীদের ওপর প্রশাসনিক চাপও ছিল। একপর্যায়ে প্রশ্ন ওঠে, আন্দোলন আর চালিয়ে নেওয়া সম্ভব হবে কি না। সেদিনের বৈঠকে সবার চোখ ভিজে গিয়েছিল।
রাতুল বলেন, ‘সেই কথা মনে হলে আর বর্তমানে গাছটা দেখলে খুব আবেগি হয়ে যাই। জড়িয়ে ধরতে ইচ্ছা করে।’
ক্যাম্পাস থেকে খাগড়াছড়ি, ৫১২ কিলোমিটার পদযাত্রা
শালবন রক্ষার আন্দোলনের পরের বছর পরিবেশ সচেতনতা তৈরিতে নতুন উদ্যোগ নেন রাতুল ও তাঁর সঙ্গীরা। ক্যাম্পাস থেকে খাগড়াছড়ি পর্যন্ত ১৫ দিনে ৫১২ কিলোমিটার হাঁটেন তাঁরা।
পথে ৪০০-এর বেশি বাজারে প্রচার চালিয়েছেন, বিলিয়েছেন লিফলেট। ২৬টি উপজেলায় মানুষের সঙ্গে কথা বলেছেন গাছ ও পরিবেশ নিয়ে।
তাঁদের এই উদ্যোগের প্রতি মানুষের ভালোবাসাও ছিল। খাগড়াছড়ির ফলদ বাগান মালিক সমিতির সদস্যরা দুপুর পর্যন্ত রাস্তায় দাঁড়িয়ে তাঁদের অভিনন্দন জানান।
এই অভিজ্ঞতা থেকে রাতুলের উপলব্ধি, ‘পরিবেশ সচেতনতায় মানুষের কাছে যেতে হবে, বুঝাতে হবে। তাহলেই পরিবর্তন সম্ভব। লোক দেখানো কাজে পরিবর্তন সম্ভব নয়।’
গাছ লাগানোর চেয়ে বাঁচানোই বড় কাজ
রাতুল মূলত ফলদ, ঔষধি ও শোভাবর্ধক গাছ লাগান। ফলদ বাংলাদেশ ফাউন্ডেশনের ৬৪ জেলার ফলদ বৃক্ষরোপণ কর্মসূচিতে ব্যবস্থাপনার দায়িত্বেও ছিলেন তিনি।
শুধু চারা রোপণ নয়, বাড়ি বাড়ি গিয়ে গাছের পরিচর্যা শেখান। তাঁর দাবি, এ কর্মসূচিতে লাগানো গাছের ৮০ থেকে ৮৫ শতাংশ এখনো বেঁচে আছে।
প্রতিবছর বিভিন্ন এলাকা থেকে সেসব গাছের ফল আসে তাঁর কাছে। রাতুলের কাছে এর চেয়ে বড় স্বীকৃতি আর কিছু নেই।
পরিবেশ ও প্রকৃতির পাঠশালার হয়ে আরেকটি উদ্যোগেও যুক্ত ছিলেন তিনি। বৈলাম দেশের সবচেয়ে উঁচু ও দীর্ঘজীবী গাছগুলোর একটি। কিন্তু গাছটির সংখ্যা কমে আসছে।
বৈলাম যাতে একেবারে হারিয়ে না যায়, সে জন্য দেশের বিভিন্ন জেলায় একটি-দুটি করে ১০০ থেকে ১২০টি চারা লাগানো হয়েছে। রাতুলের ভাষ্য অনুযায়ী, বেশির ভাগ চারাই টিকে আছে। তাঁর বাড়িতে লাগানো বৈলাম গাছটিও বেঁচে আছে।
বাহবার চেয়ে সন্দেহ বেশি, এসেছে হুমকিও
গাছ ও পরিবেশ রক্ষার পথে রাতুলের অভিজ্ঞতা সব সময় সুখকর নয়। বাহবার চেয়ে সন্দেহই বেশি পেয়েছেন তিনি। প্রকৃতি বাঁচলে মানুষও বাঁচবে, এ কথা বোঝাতে গিয়ে অনেকের কাছেই বিষয়টি সহজভাবে গ্রহণযোগ্য হয়নি। এসেছে হুমকিও।
পরিবারও সব সময় তাঁর কাজকে সহজভাবে নেয়নি।
পরিবেশ ও প্রকৃতির পাঠশালার প্রতিষ্ঠাতা মাহবুবুল রহমান পলাশ জানান, মধুপুরের শালবন রক্ষা এবং অবৈধ বৃক্ষনিধনের বিরুদ্ধে কাজ করতে গিয়ে রাতুল জীবনের ঝুঁকিও নিয়েছেন।
স্বপ্ন পরিবেশবান্ধব বাড়ি বা আশ্রম
রাতুলের স্বপ্ন একদিন একটি পরিবেশবান্ধব বাড়ি বা আশ্রম গড়ে তোলা। এমন একটি জায়গা, যেখানে গেলে মানুষের ভাবনা বদলাবে। প্রকৃতির সঙ্গে মানুষের সম্পর্ক আরও গভীর হবে।
তবে সেই স্বপ্ন পূরণের আগেও তাঁর প্রতিদিনের কাজ খুব সাধারণ। গাছের কাছে যাওয়া, গাছের যত্ন নেওয়া, গাছ বাঁচিয়ে রাখা।
কারণ, গাছেরও যে অভিমান হয়, তা তিনি শিখেছেন নিজের লাগানো ঝুমকোলতার কাছেই।
সূত্র: সমকাল






