ডেস্ক রিপোর্ট
অন্যের মর্মান্তিক দুর্যোগ কীভাবে মুহূর্তের মধ্যেই কারও কাছে উৎসব বা সুযোগে পরিণত হতে পারে, তিব্বত-নেপাল সীমান্তের সাম্প্রতিক বিপর্যয় তারই এক করুণ উদাহরণ।
হঠাৎ নেমে আসা পাহাড়ি আকস্মিক বন্যার তাণ্ডবে উজান থেকে ভেসে আসে বিপুল ধ্বংসস্তূপ। সেই ধ্বংসযজ্ঞের মধ্যেই কোথাও লাশ থেকে গয়না খুলে নেওয়ার অভিযোগ, কোথাও আবার ভেসে আসা গ্যাস সিলিন্ডার দখলের হিড়িক, দুর্যোগের ভয়াবহতার পাশাপাশি এমন দৃশ্যও চোখে পড়ছে।
তবে নিম্নাঞ্চলের নদীপাড়ে দেখা গেছে সম্পূর্ণ ভিন্ন এক চিত্র, এক ধরনের ‘ফিশ সার্জ’।
উজানের উচ্চভূমির গভীর নদীখাত বা স্থানীয়ভাবে পরিচিত ‘কুম’-এ শত শত বছর ধরে বসবাস করা বিভিন্ন বিরল ও বিলুপ্তপ্রায় মাছ এই প্রবল ঢলে স্থানচ্যুত হয়ে নেপালের নদীগুলোতে ভেসে এসেছে বলে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া বিভিন্ন ভিডিও ও ছবিতে দেখা যাচ্ছে।
মাহশির, বাঘাইড় কিংবা বামুস বা ইলের মতো যেসব মাছ সাধারণত সহজে দেখা যায় না এবং কিছু প্রজাতির মাছ শিকার নিষিদ্ধ বা নিয়ন্ত্রিত, সেসব মাছও এখন সাধারণ মানুষের জালে ধরা পড়ছে।
বছরের পর বছর মানুষের ধরাছোঁয়ার বাইরে থাকা বিশাল আকৃতির বাঘাইড় কিংবা ২০ থেকে ৩০ কেজি ওজনের মাহশির, এমন অনেক মাছই এখন বন্যার পানির সঙ্গে নিম্নাঞ্চলের নদীতে এসে পড়েছে বলে বিভিন্ন ভিডিওতে দেখা যাচ্ছে। বিশাল আকৃতির এসব মাছকে অনেকেই ‘রিভার মনস্টার’ বলেও উল্লেখ করছেন।
এক পাশে শোক, অন্য পাশে মাছ ধরার উৎসব
পাহাড়ের মানুষ যখন স্বজন, ঘরবাড়ি ও জীবিকার উৎস হারিয়ে বিপর্যস্ত, তখন সমতলের কিছু নদীপাড়ে চলছে মাছ ধরার উৎসব।
চাহিদার তুলনায় বিপুল পরিমাণ মাছ ধরা পড়ায় সেগুলো শুকিয়ে শুঁটকি তৈরি করে সংরক্ষণের উদ্যোগও দেখা যাচ্ছে। দুর্যোগের এই দুই বিপরীত চিত্র যেন প্রকৃতির এক নির্মম পরিহাস, কারও জন্য সর্বনাশ, আবার কারও কাছে অপ্রত্যাশিত প্রাপ্তি।
তবে এই দৃশ্যের পেছনে লুকিয়ে আছে আরও বড় এক পরিবেশগত সংকট। উজানের স্বাভাবিক আবাসস্থল থেকে স্থানচ্যুত হয়ে আসা বিরল মাছগুলোর ভবিষ্যৎও অনিশ্চিত। যেসব মাছ বছরের পর বছর গভীর পাহাড়ি নদীখাতের বিশেষ পরিবেশে টিকে ছিল, আকস্মিক বন্যা তাদের সেই আবাসস্থল থেকে ছিটকে দিয়েছে।
মানুষের জীবনে যেমন দুর্যোগের কোনো স্থায়ী সীমারেখা নেই, তেমনি প্রকৃতির এই বিপর্যয়ও এক অঞ্চল থেকে আরেক অঞ্চলে ভিন্ন বাস্তবতা তৈরি করে। আজ যে ঘটনা কারও কাছে দূরের মানুষের করুণ পরিণতি, কাল সেই একই ধরনের দুর্যোগ নিজের জীবনেও নেমে আসতে পারে।
সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ভাইরাল হওয়া বিভিন্ন ভিডিও ও ছবি থেকে সংকলিত এই বিরল মাছগুলোর দৃশ্য তাই শুধু কৌতূহলের বিষয় নয়; বরং একটি বড় পরিবেশগত বিপর্যয়েরও সাক্ষ্য।
একদিকে স্বজনহারা মানুষের কান্না, অন্যদিকে দুর্লভ মাছ ধরার উন্মাদনা, তিব্বত-নেপাল সীমান্তের এই দুর্যোগ যেন একই সঙ্গে মানবিক বিপর্যয় এবং প্রকৃতির বিপন্ন জীববৈচিত্র্যের এক নির্মম চিত্র তুলে ধরেছে।






