চাষে লাভ, প্রকৃতিতে বিপদ? ভিয়েতনামি শোল নিয়ে নতুন উদ্বেগ

ডেস্ক রিপোর্ট


দেশের মৎস্য খাতে বাণিজ্যিকভাবে চাষ হচ্ছে ভিয়েতনাম থেকে আনা শোলের জাত। দ্রুত বৃদ্ধি, তুলনামূলক বড় আকার এবং বাণিজ্যিকভাবে ভালো ফলনের কারণে চাষিদের মধ্যে এ মাছের জনপ্রিয়তা বাড়ছে। তবে বিদেশি জাতের এ মাছ চাষের ক্ষেত্রে পুকুর বা ঘের থেকে প্রাকৃতিক জলাশয়ে ছড়িয়ে পড়ার সম্ভাবনা নিয়ে পরিবেশ ও জীববৈচিত্র্য বিশেষজ্ঞদের মধ্যে উদ্বেগ রয়েছে।

বাংলাদেশে শোল মাছের বৈজ্ঞানিক নাম Channa striata। গবেষণায় দেখা গেছে, বাংলাদেশে বাণিজ্যিক চাষের জন্য ভিয়েতনাম থেকে এ প্রজাতির একটি জাত আনা হয়েছে। দেশীয় ও ভিয়েতনামি উৎসের Channa striata-এর মধ্যে শারীরিক বৈশিষ্ট্যের পার্থক্যও গবেষণায় শনাক্ত হয়েছে।

অন্যদিকে বিশ্বের বিভিন্ন দেশে ‘স্নেকহেড’ নামে পরিচিত Channa গণের কিছু মাছকে আক্রমণাত্মক বিদেশি প্রজাতি হিসেবে বিবেচনা করা হয়। বিশেষ করে উত্তর আমেরিকায় নর্দার্ন স্নেকহেড (Channa argus) স্থানীয় মাছ ও জলজ বাস্তুতন্ত্রের জন্য হুমকি হিসেবে চিহ্নিত। যুক্তরাষ্ট্রে ২০০২ সাল থেকে স্নেকহেড পরিবারের জীবন্ত মাছ আমদানি ও অঙ্গরাজ্যগুলোর মধ্যে পরিবহনে ফেডারেল বিধিনিষেধ রয়েছে; অনেক অঙ্গরাজ্যে জীবন্ত স্নেকহেড রাখা নিষিদ্ধ।

ইউরোপীয় ইউনিয়নেও Channa argus ‘Invasive Alien Species of Union concern’ হিসেবে তালিকাভুক্ত। এ ধরনের প্রজাতির ক্ষেত্রে রাখা, আমদানি, বিক্রি, প্রজনন এবং পরিবেশে অবমুক্ত করার ওপর বিধিনিষেধ আরোপ করা হয়।

স্নেকহেড মাছের কিছু প্রজাতির অন্যতম বৈশিষ্ট্য হলো বাতাস থেকে অক্সিজেন গ্রহণের সক্ষমতা। এ কারণে তারা পানির বাইরে কিছু সময় টিকে থাকতে পারে। যুক্তরাষ্ট্রের ভূতাত্ত্বিক জরিপ সংস্থা (USGS) জানিয়েছে, স্নেকহেড মাছ বায়ুশ্বাস নিতে পারে এবং পানির বাইরে দীর্ঘ সময় বেঁচে থাকার সক্ষমতা রয়েছে।

বাংলাদেশে বিদেশি উৎসের শোলের চাষের ক্ষেত্রে মূল উদ্বেগ তৈরি হয় তখনই, যখন বন্যা, পুকুর ভেঙে যাওয়া বা ঘের প্লাবিত হওয়ার মাধ্যমে মাছটি প্রাকৃতিক জলাশয়ে ছড়িয়ে পড়তে পারে। গবেষণাতেও বাংলাদেশে ভিয়েতনামি Channa striata বন্য পরিবেশে ছড়িয়ে পড়লে বাস্তুতন্ত্র ও প্রজাতিবৈচিত্র্যের ওপর দীর্ঘমেয়াদি প্রভাবের আশঙ্কার কথা উল্লেখ করা হয়েছে।

তবে ভিয়েতনামি শোলকে সরাসরি ‘বাংলাদেশের জন্য নিষিদ্ধ আক্রমণাত্মক মাছ’ হিসেবে ঘোষণা করা হয়েছে—এমন তথ্য উল্লেখ করার আগে সংশ্লিষ্ট সরকারি বিধিমালা ও বৈজ্ঞানিক গবেষণার ভিত্তিতে বিষয়টি যাচাই করা জরুরি। কারণ ভিয়েতনামি Channa striata এবং ইউরোপ-আমেরিকায় নিষেধাজ্ঞার আওতায় থাকা সব স্নেকহেড প্রজাতি এক নয়।

বিশেষজ্ঞদের মতে, বিদেশি জাতের মাছ চাষের ক্ষেত্রে জৈবনিরাপত্তা, পুকুরের চারপাশে সুরক্ষা ব্যবস্থা, বন্যার সময় মাছ বেরিয়ে যাওয়ার ঝুঁকি এবং প্রাকৃতিক জলাশয়ে প্রজননের সম্ভাবনা নিয়মিত পর্যবেক্ষণ করা প্রয়োজন। একই সঙ্গে দেশীয় শোলসহ স্থানীয় মাছের ওপর এর সম্ভাব্য প্রভাব নিয়ে দীর্ঘমেয়াদি গবেষণা দরকার।

কারণ একটি মাছ চাষির জন্য লাভজনক হলেও সেটি যদি নিয়ন্ত্রণের বাইরে প্রাকৃতিক জলাশয়ে ছড়িয়ে পড়ে, তখন তার প্রভাব শুধু একটি খামারে সীমাবদ্ধ থাকে না—পৌঁছাতে পারে পুরো জলজ বাস্তুতন্ত্রে।

প্রকৃতির মায়াজাল

আরও পড়ুন

ফুটপাতের পিঠা-পুরির দোকানও আসছে নিবন্ধনের আওতায়, কার্যকর ১ নভেম্বর থেকে

সড়কের পাশে পিঠা, পুরি, ঝালমুড়ি ও পেঁয়াজু বিক্রির দোকান থেকে শুরু করে রেস্তোরাঁ, বেকারি ও খাদ্যপণ্য উৎপাদনকারী প্রতিষ্ঠান, নির্ধারিত শ্রেণির সব খাদ্য ব্যবসাকে নিবন্ধন...
কৃষি, কৃষক ও নিরাপদ খাবার
0
minutes

শেষ ইচ্ছা ছিল বীজ বাঁচানো, ৬০ প্রজাতির ধানে বেঁচে থাকবেন রামেট্টন

কেরলের আদিবাসী কৃষক চেরুভায়াল রামন নিজের জীবনের বড় একটি অংশ ব্যয় করেছেন হারিয়ে যেতে বসা দেশীয় ধানের বীজ সংরক্ষণে। অর্থনৈতিক কষ্ট, ব্যক্তিগত ত্যাগ কিংবা...
কৃষি, কৃষক ও নিরাপদ খাবার
0
minutes

নাব্যতা সংকটে তিস্তায় মাছের সংকট, পেশা বদলাচ্ছেন জেলেরা

একসময় ভোর হলেই নৌকা নিয়ে তিস্তায় নামতেন জেলেরা। জাল ফেললেই ধরা পড়ত টেংরা, বোয়াল, পাবদা, শিং, পুঁটিসহ নানা প্রজাতির দেশীয় মাছ। সেই মাছ বিক্রির...
কৃষি, কৃষক ও নিরাপদ খাবার
0
minutes

কৃষিবিজ্ঞানীদের পেনশন নিশ্চিত করতে আইন পরিবর্তনের আহ্বান রাষ্ট্রপতির

কৃষি খাতকে লাভজনক করতে সরকারকে প্রণোদনা ও ভর্তুকি দিতে হবে বলে মন্তব্য করেছেন রাষ্ট্রপতি মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর। কৃষকদের সহায়তা বাড়ানোর ওপর গুরুত্ব দিয়ে...
কৃষি, কৃষক ও নিরাপদ খাবার
0
minutes
spot_imgspot_img