ভাদ্র মাসে তালের পিঠা, খুব স্বাভাবিকভাবেই একসময় ঘরে ঘরে থাকার কথা। কিন্তু সময়ের সঙ্গে সেই চিত্র অনেকটাই বদলে গেছে। শহরের বাজারে কচি শাঁসের জন্য কাঁচা তাল আর পিঠাপুলির জন্য পাকা তাল এখনো যথেষ্ট ওঠে। তবে বাড়িতে বাড়িতে ভাদ্র মাসের তালের পিঠার আয়োজন আর আগের মতো দেখা যায় না। নতুন প্রজন্ম, বিশেষ করে শিশুরাও অনেক ক্ষেত্রে তালের পিঠার স্বাদ নেওয়ার সুযোগ থেকে বঞ্চিত হচ্ছে।
‘তাল গাছ এক পায়ে দাঁড়িয়ে’ রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের সেই কবিতা কি নতুন প্রজন্ম শেখে? তালগাছ (Borassus flabellifer) অবশ্য সব এলাকায় দেখা যায় না। ইংরেজিতে তাল Asian palmyra palm নামে পরিচিত। বেশ উঁচু হয় বলে একসময় গ্রামে পথ চিনতেও দীর্ঘদেহী এই গাছ সাহায্য করত।
তালগাছ লাগানোর পর ফল পেতে ১৫ থেকে ২০ বছর লেগে যায়। তবে গাছ টিকে গেলে একটি শতাব্দীও পার করে দিতে পারে। তালপাতাসহ গাছটির বিভিন্ন অংশের প্রায় ৮০০ ধরনের ব্যবহার রয়েছে। তালপাতার পাখার বাতাস যেমন আরামদায়ক, তেমনি তালপাতা দিয়ে লেখা, ছাউনি দেওয়াসহ নানা কাজও করা হয়। বাবুই পাখির মতো স্বনামধন্য স্থপতি পাখিও তালগাছেই বাসা বানায়।
তালগাছের সঙ্গে দেশি ধানের সম্পর্ক
নয়াকৃষি আন্দোলনের একটি গুরুত্বপূর্ণ কাজ হলো গাছগাছালির জাত নির্ণয় করা। তালের কয়েকটি জাতের মধ্যে ঈশ্বরদীতে দুটি জাত পাওয়া গেছে, ‘মঈশা’ ও ‘পটা’। মঈশার গায়ের বর্ণ একেবারে মোষের মতো। এতে রসও বেশি, স্বাদও বেশি।
তবে পিঠার জন্য শুধু তালের রস হলেই হয় না, প্রয়োজন নতুন ধানের চালের গুঁড়া। তাও আবার হতে হয় ঢেঁকিছাঁটা চালের গুঁড়া।
তাল পাকে ভাদ্র মাসে। এ সময় কৃষকের ঘরে আউশের ধান ওঠে। এ কারণে এলাকার মানুষ তালের পিঠাকে ‘ভাদর ধানের ভাদর পিঠা’ও বলে। অর্থাৎ একদিকে যেমন তালগাছ থাকতে হবে, অন্যদিকে প্রায় হারিয়ে যেতে বসা আউশের আবাদও থাকতে হবে। আমনের নতুন ধান অগ্রহায়ণ-পৌষের আগে ওঠে না।
আধুনিক কৃষির ফলে বহু স্থানীয় জাতের ধান দ্রুত হারিয়ে গেছে। বিশেষ করে আউশ ধানের অনেক জাত বিলুপ্তির পথে। নয়াকৃষি আন্দোলন আউশ ধানের জাত আবারও প্রবর্তনের চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে। কৃষকেরা পাবনা ও নাটোর এলাকায় আউশের কয়েকটি জাত চাষ করছেন। এর মধ্যে ‘কালাবকরী’ বা ‘কালোবকরি’ খুব জনপ্রিয়তা পেয়েছে। শুধু গ্রামে নয়, ঢাকাতেও এ আউশ ধানের চালের চাহিদা বেড়েছে। শস্যপ্রবর্তনায়ও এটি পাওয়া যায়।
নানা ধানের গুঁড়ায় তালের পিঠা
যেকোনো পিঠার মতোই তালের পিঠাতেও আতপ ধানের চালের গুঁড়া ব্যবহার হয়। অঞ্চল ও পিঠার ধরন অনুযায়ী বিভিন্ন জাতের ধান এতে ব্যবহার করা হয়।
যেখানে আউশের নতুন ধান নেই, সেখানে সুগন্ধি ও বিন্নির মতো আঠালো আমন ধানের চালের গুঁড়া ব্যবহার করা হয়। এর মধ্যে রয়েছে খন্ডাইল্লাহ, নোনাশাইল, লাল বিন্নি ধান, লেম্বুরু, সাহেব চিকন, নোনা শাইল, কার্তিক শাইল, কাজলকুড়ি, কালিজিরা ও বাদশাভোগ। শুধু তাই নয়, তালের পিঠার নকশার জন্য ব্যবহার করা হয়েছে কাঁঠালের পাতাও।
নয়াকৃষি আরশীনগর কেন্দ্রের আজমীরা খাতুন, ইয়াসমিন খাতুন ও বুলবুলি বেগম কয়েক ধরনের তালের পিঠা বানিয়েছেন। তাঁদের কেউ কক্সবাজারের, কেউ কুষ্টিয়া এবং সিরাজগঞ্জের মানুষ। পিঠাগুলোর বর্ণনা লিখেছেন আজমীরা খাতুন। ছবি তুলেছেন গোলাম মোস্তফা রনি।
তুষা পিঠা
তুষা পিঠা বেশির ভাগ কক্সবাজারের চকরিয়ায় তৈরি করা হয়। পিঠাটি দেখতে পানের খিলির মতো। খেতে খুব নরম।
তুষা পিঠা তৈরির উপকরণ হিসেবে পাকা তালের রসের সঙ্গে আতপ চালের (খন্ডাইল্লাহ, নোনাশাইল, লাল বিন্নি ধান) গুঁড়া, লবণ, চিনি বা আখের গুড় ব্যবহার করা হয়। তবে আখের গুড় হলে ভালো হয়।
আউশের কালোবকরি ধানের চালের গুঁড়া দিয়েও এই পিঠা তৈরি করা যায়। এ ছাড়া আমন ধানের কার্তিক শাইল ও কাজলকুড়ি ধানের চালের গুঁড়া দিয়েও পিঠাটি তৈরি হয়। এই গুঁড়ার সঙ্গে সুগন্ধি চালের গুঁড়া যেমন কালিজিরা ও বাদশাভোগ মেশালে আরও ভালো সুগন্ধ পাওয়া যায়।
সাটম পিঠা
সাটম পিঠাটিও কক্সবাজারের পিঠা। সব ধরনের আতপ চালের গুঁড়ার সঙ্গে তালের রস মিশিয়ে এই পিঠা তৈরি করা হয়। বিশেষ কয়েকটি ধানের চালের গুঁড়া দিয়ে এই পিঠা তৈরি করা হয়। এগুলো হলো লেম্বুরু, সাহেব চিকন, নোনা শাইল ও খন্ডাইল্লা।
ঈশ্বরদীতে কালোবকরি, বাসমতি ও পাকড়ী ধানের চালের গুঁড়ার সঙ্গে হালকা ময়দা মিশিয়ে পিঠাটি তৈরি করা হয়। চালের গুঁড়ার সঙ্গে হালকা ময়দা মেশালে পিঠা অনেক ফুলে ও নরম হয়। এর সঙ্গে আখের গুড় ব্যবহার করা হয়।
তালের রুটি পিঠা
তালের রুটি পিঠা পাবনা অঞ্চলের পিঠা। দেখতে ঠিক রুটির মতো। তবে রং অনেকটা তালের রসের মতো।
এই পিঠা তৈরিতে তালের রসের সঙ্গে আতপ চালের গুঁড়া ও চিনি ব্যবহার করা হয়। এখানে কালোবকরি ধানের চালের গুঁড়ার সঙ্গে হালকা গমের আটা ব্যবহার করা হয়েছে। চালের গুঁড়ার সঙ্গে গমের আটা মেশালে পিঠা অনেক নরম হয়, খেতেও অনেক স্বাদ লাগে।
তালের কাঁঠাল পাতা পিঠা
সিরাজগঞ্জ এলাকায় এই পিঠা বেশি খাওয়া হয়। তালের রস, লবণ, দুধ, চিনি ও কালোবকরি ধানের চালের গুঁড়া দিয়ে এই পিঠা তৈরি করা হয়েছে। নকশা করার জন্য কাঁঠালের পাতা ব্যবহার করা হয়।
তালের বড়া
তালের সবচেয়ে মজাদার পিঠা হলো তালের বড়া। কমবেশি সব অঞ্চলের মানুষ এই পিঠা খায়। সব ধরনের চালের গুঁড়া দিয়েই এই পিঠা তৈরি করা যায়।
এখানে কালোবকরি ধানের চালের গুঁড়া ব্যবহার করা হয়েছে। কারণ কালোবকরি ধান নতুন উঠেছে। নতুন ধানের চালের গুঁড়ার সঙ্গে তালের পিঠা দারুণ হয়েছে। নতুন ধানের পিঠা খেতেও অনেক ভালো লাগে।
এই পিঠা তৈরিতে প্রয়োজন হয় তালের রস, চালের গুঁড়া ও আখের গুড়।
হারিয়ে যেতে দেবেন না ঐতিহ্য
পিঠা বাংলার সংস্কৃতির অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ অংশ। তালের পিঠার সঙ্গে জড়িয়ে আছে তালগাছ, দেশি ধান, কৃষি ও গ্রামীণ জীবনের দীর্ঘ ঐতিহ্য। আধুনিক কৃষি ও জীবনযাত্রার পরিবর্তনের সঙ্গে সঙ্গে এই ঐতিহ্যের অনেক কিছুই হারিয়ে যাচ্ছে।
তাই তালের পিঠার পাশাপাশি দেশি ধানের জাত, তালগাছ ও স্থানীয় খাদ্যসংস্কৃতিও সংরক্ষণ করা জরুরি। পিঠার এই ঐতিহ্য হারিয়ে যেতে দেওয়া যাবে না। আপনার এলাকার তালের পিঠার তথ্যও সবার সঙ্গে ভাগ করে নেওয়া যেতে পারে, যাতে প্রজন্ম থেকে প্রজন্মে টিকে থাকে বাংলার এই শেকড়ের স্বাদ।
সূত্র: নয়াকৃষি আন্দোলন






