আফ্রিকা থেকে বাংলাদেশে আনা হয়েছিল ২৫টি উটপাখি। উদ্দেশ্য ছিল সাত বছর ধরে গবেষণা করে দেখা, বাংলাদেশের আবহাওয়া ও পরিবেশে অ-স্থানীয় এই পাখি কতটা খাপ খাওয়াতে পারে, কীভাবে বেড়ে ওঠে, প্রজননে কতটা সফল হয় এবং ভবিষ্যতে বাণিজ্যিকভাবে উটপাখি পালন কতটা সম্ভাবনাময়।
সাত বছর পর সেই ২৫টি উটপাখির মধ্যে জীবিত আছে মাত্র তিনটি। গবেষণার অংশ হিসেবে ১৫টি উটপাখি পরিকল্পিতভাবে জবাই করা হয়েছে। আর গুরুতর পায়ের আঘাতে চিকিৎসাধীন অবস্থায় মারা গেছে আরও সাতটি।
এখন বড় প্রশ্ন, সাত বছরের এই গবেষণা কি বাংলাদেশে উটপাখি পালনের দীর্ঘমেয়াদি সম্ভাবনার কোনো স্পষ্ট উত্তর দিতে পেরেছে?
প্রকল্পের নথি ও গবেষকদের সঙ্গে কথা বলে পাওয়া তথ্য বলছে, এর উত্তর এখনো পুরোপুরি স্পষ্ট নয়।
কেন জবাই করা হয়েছিল ১৫টি উটপাখি?
বাংলাদেশ প্রাণিসম্পদ গবেষণা ইনস্টিটিউটের (বিএলআরআই) সাভার ক্যাম্পাসে ‘স্ট্রেংদেনিং অব পোলট্রি রিসার্চ অ্যান্ড ডেভেলপমেন্ট প্রজেক্ট’-এর আওতায় প্রায় ৫ লাখ টাকা ব্যয়ে দুই ধাপে আফ্রিকা থেকে ২৫টি উটপাখি আনা হয়।
গবেষণায় ১৫টি উটপাখিকে পরিকল্পিতভাবে জবাই করা হয়। এটি গবেষণা শেষে পাখিগুলো সরিয়ে ফেলার কোনো সাধারণ প্রক্রিয়া ছিল না; বরং গবেষণার নির্দিষ্ট অংশ হিসেবেই জবাই করা হয়।
গবেষকেরা তিন, ছয়, নয়, ১২ ও ১৮ মাস বয়সে উটপাখি জবাই করে মাংসের গুণগত মান, পুষ্টিমান এবং বয়স বাড়ার সঙ্গে এসব বৈশিষ্ট্যের পরিবর্তন পরীক্ষা করেন।
এর পাশাপাশি গবেষণায় উটপাখির খাদ্য চাহিদা, প্রোটিনের প্রয়োজনীয়তা, বৃদ্ধি, স্বাস্থ্য, পরিবেশের সঙ্গে খাপ খাওয়ানোর সক্ষমতা, উৎপাদনশীলতা ও প্রজনন সক্ষমতাও পর্যবেক্ষণ করা হয়।
পাওয়া গেছে প্রাথমিক তথ্য
বিএলআরআইয়ের প্রধান বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তা ড. মো. সাজেদুল করিম সরকারের অধীনে কাজ করা পিএইচডি শিক্ষার্থী খোন্দকার তৌহিদুল ইসলাম জানান, বাংলাদেশে উটপাখি পালনের বিষয়ে প্রাথমিক তথ্য সংগ্রহ করাই ছিল গবেষণার অন্যতম উদ্দেশ্য।
গবেষকেরা উটপাখির খাদ্য গ্রহণ, প্রোটিনের চাহিদা, শারীরিক বৃদ্ধি, স্বাস্থ্য, স্থানীয় পরিবেশে অভিযোজন এবং প্রজনন সক্ষমতা নিয়ে তথ্য সংগ্রহ করেন।
তৌহিদুল ইসলাম বলেন, কোনো বিদেশি প্রজাতি নতুন পরিবেশে কতটা খাপ খাইয়ে নিতে পারে এবং সেখানে কেমন ফল দিতে পারে, তা নির্ধারণে যথেষ্ট সময় প্রয়োজন।
প্রকল্প পরিচালক ও বিএলআরআইয়ের সংশ্লিষ্ট গবেষকরা বলছেন, গবেষণা থেকে উটপাখির অভিযোজন, খাদ্য, স্বাস্থ্য, প্রজনন ও উৎপাদন সম্ভাবনা সম্পর্কে গুরুত্বপূর্ণ তথ্য পাওয়া গেছে।
প্রকল্প পরিচালক সাজেদুল করিম সরকার মনে করেন, উটপাখি নিয়ে গবেষণার প্রায় ৮৫ শতাংশ উদ্দেশ্য অর্জিত হয়েছে। তবে তিনি আরও গবেষণার প্রয়োজন রয়েছে বলেও জানিয়েছেন।
সাতটি উটপাখির মৃত্যু
গবেষণার অংশ হিসেবে জবাই করা ১৫টির বাইরে আরও সাতটি উটপাখি মারা গেছে। গুরুতর পায়ের আঘাতের কারণে চিকিৎসাধীন অবস্থায় তাদের মৃত্যু হয়।
উটপাখি আকারে বড় এবং দ্রুতগতিতে দৌড়াতে সক্ষম পাখি। ফলে এদের পালনে পায়ের স্বাস্থ্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। বিশেষ করে প্রাকৃতিক আবাসস্থলের বাইরে পালনের ক্ষেত্রে এ বিষয়টি আরও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে।
প্রকল্পের নথিতেও গবেষণার জন্য পরিকল্পিতভাবে জবাই করা ১৫টি পাখির মৃত্যু এবং পায়ের আঘাতে মারা যাওয়া সাতটি পাখিকে পৃথকভাবে উল্লেখ করা হয়েছে।
গবেষণার জন্য জবাই করা পাখিগুলোর ক্ষেত্রে ভেটেরিনারি স্বাস্থ্য সনদও নেওয়া হয়েছিল বলে নথিতে উল্লেখ রয়েছে।
বর্তমানে জীবিত তিনটি উটপাখিকে ভবিষ্যৎ গবেষণা কিংবা পরবর্তী কোনো কর্মসূচিতে ব্যবহারের পরিকল্পনা রয়েছে।
সবচেয়ে বড় প্রশ্ন প্রজনন নিয়ে
গবেষণায় উটপাখিরা ডিম দিয়েছে। তবে এসব ডিম থেকে কোনো বাচ্চা সফলভাবে জন্ম নেয়নি।
এ কারণেই বাংলাদেশে উটপাখির দীর্ঘমেয়াদি প্রজনন সক্ষমতা যাচাইয়ের ক্ষেত্রে একটি গুরুত্বপূর্ণ ঘাটতি রয়ে গেছে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।
কারণ কোনো প্রজাতিকে বাণিজ্যিকভাবে পালনের সম্ভাবনা যাচাই করতে শুধু মাংসের গুণমান বা ওজন বৃদ্ধির তথ্য যথেষ্ট নয়। দেখতে হয়, স্থানীয় পরিবেশে পাখিটি দীর্ঘদিন সুস্থ থাকে কি না, নিয়মিত প্রজনন করতে পারে কি না এবং উৎপাদিত পণ্য বাজারে লাভজনকভাবে বিক্রি করা সম্ভব কি না।
গবেষণায় জবাই কতটা যৌক্তিক?
অধ্যাপক ও বন্যপ্রাণী গবেষক ড. কামরুল হাসানের মতে, নির্দিষ্ট বৈজ্ঞানিক প্রশ্নের উত্তর পেতে গবেষণার অংশ হিসেবে প্রাণী জবাই করে নমুনা সংগ্রহ করা বৈজ্ঞানিক গবেষণায় অস্বাভাবিক নয়।
তবে এর গুরুত্ব নির্ভর করে গবেষণার মূল উদ্দেশ্যের ওপর।
যদি উদ্দেশ্য হয় বয়সভেদে মাংসের গুণগত মান ও পুষ্টিমান যাচাই করা, তাহলে বিভিন্ন বয়সে উটপাখি জবাই করা গবেষণার স্বাভাবিক পদ্ধতি হতে পারে। কিন্তু যদি বৃহত্তর লক্ষ্য হয় বাংলাদেশে উটপাখির বাণিজ্যিক খামার গড়ে তোলার সম্ভাবনা যাচাই, তাহলে শুধু মাংসের মান দিয়ে সেই সম্ভাবনা নির্ধারণ করা সম্ভব নয়।
এ ক্ষেত্রে দীর্ঘমেয়াদি স্বাস্থ্য, অভিযোজন, সফল প্রজনন, বাচ্চা উৎপাদন এবং উৎপাদন ব্যয়, সবকিছু বিবেচনায় নিতে হবে।
সাত বছরের বড় প্রকল্পের একটি অংশ
উটপাখি নিয়ে এই গবেষণা ছিল বিএলআরআইয়ের সাত বছর মেয়াদি একটি বৃহৎ প্রকল্পের অংশ। ‘স্ট্রেংদেনিং অব পোলট্রি রিসার্চ অ্যান্ড ডেভেলপমেন্ট প্রজেক্ট’ ২০১৯ সালের জুলাই থেকে ২০২৬ সালের জুন পর্যন্ত চলে।
এই প্রকল্পে মুরগি, হাঁস, রাজহাঁস, টার্কি, গিনি ফাউল, কবুতর, কোয়েল ও উটপাখি, মোট আট প্রজাতির পাখি নিয়ে গবেষণা করা হয়। প্রজনন, খাদ্য, রোগ ব্যবস্থাপনা ও প্রক্রিয়াজাতকরণসহ বিভিন্ন বিষয় ছিল গবেষণার আওতায়।
এর মধ্যে উটপাখি গবেষণাই বিশেষভাবে আলোচনায় এসেছে, কারণ সাত বছরের গবেষণায় ২৫টি পাখির সংখ্যা কমে দাঁড়িয়েছে মাত্র তিনটিতে।
বিএলআরআই কর্মকর্তাদের দাবি, গবেষণাটি বাংলাদেশে উটপাখি পালনের বিষয়ে প্রয়োজনীয় প্রাথমিক তথ্য ও গবেষণা অবকাঠামো তৈরি করেছে। জীবিত তিনটি উটপাখিকে ব্যবহার করে ভবিষ্যতে অভিযোজন ও প্রজনন নিয়ে আরও গবেষণার সুযোগ রয়েছে।
সম্ভাবনা আছে, তবে চূড়ান্ত উত্তর নেই
সাত বছরের গবেষণায় বাংলাদেশে উটপাখি পালনের খাদ্য, স্বাস্থ্য, বৃদ্ধি, অভিযোজন ও উৎপাদন নিয়ে গুরুত্বপূর্ণ কিছু তথ্য পাওয়া গেছে। কিন্তু সফলভাবে বাচ্চা উৎপাদন না হওয়ায় দীর্ঘমেয়াদি প্রজনন সক্ষমতার বিষয়ে এখনো স্পষ্ট সিদ্ধান্তে পৌঁছানো যায়নি।
আর বাণিজ্যিক খামার গড়ে তুলতে হলে শুধু পাখি বাংলাদেশে টিকে থাকতে পারছে কি না, সেটিই যথেষ্ট নয়। প্রয়োজন হবে নিয়মিত প্রজনন, দীর্ঘমেয়াদি স্বাস্থ্য, উৎপাদন ব্যয়, বাজার সম্ভাবনা এবং লাভজনকতার বাস্তব চিত্র।
ফলে আফ্রিকা থেকে আনা ২৫ উটপাখি সাত বছরে গবেষকদের হাতে গুরুত্বপূর্ণ তথ্য তুলে দিলেও বাংলাদেশে উটপাখি পালন আদৌ টেকসই ও লাভজনক বাণিজ্যিক উদ্যোগ হতে পারে কি না, সেই প্রশ্নের চূড়ান্ত উত্তর এখনো মেলেনি।
সূত্র: Dhaka Tribune






