চা শ্রমিকদের দৈনিক মজুরি ৫০০ টাকা করার দাবিতে কর্মসূচি পালনকে কেন্দ্র করে মৌলভীবাজারের শ্রীমঙ্গলে লেবার হাউসের সড়কে আন্দোলনকারীদের ওপর চা শ্রমিক নেতাদের হামলার অভিযোগ উঠেছে। এ ঘটনায় ১০ থেকে ১২ জন আহত হয়েছেন বলে দাবি করেছেন আন্দোলনকারীরা। তাঁদের মধ্যে দুই থেকে তিনজনকে মৌলভীবাজার সদর হাসপাতালে পাঠানো হয়েছে।
সোমবার (৩১ আগস্ট) দুপুরে শ্রীমঙ্গল চৌমুহনায় মানববন্ধন শেষে লেবার হাউসের দিকে র্যালি নিয়ে যাওয়ার সময় এ ঘটনা ঘটে বলে জানা গেছে।
চা শ্রমিক নেত্রী গীতা রানি কানু অভিযোগ করেন, তাঁরা প্রথমে র্যালি নিয়ে ডিডিএল ও ইউএনও অফিসের দিকে যাওয়ার পরিকল্পনা করেছিলেন। এ বিষয়ে পুলিশের কাছ থেকে অনুমতিও নেওয়া হয়েছিল। পরে চা শ্রমিক ইউনিয়ন কার্যালয়ের সামনে দিয়ে র্যালি করে সড়কের বিপরীত পাশ দিয়ে যাওয়ার সময় তাঁদের ওপর হামলা চালানো হয়।
তিনি বলেন, তারা আমাদের ব্যানার ছিনিয়ে নেয় এবং মারধর শুরু করে। এটি প্রথমবার নয়, দ্বিতীয়বারের মতো তারা আমাদের ওপর হামলা করেছে।
গীতা রানি কানু আরও বলেন, চা শ্রমিকদের মজুরি দাবি করা যদি আমাদের অপরাধ হয়, তাহলে আমাদের আন্দোলন অব্যাহত থাকবে।
আন্দোলনকারীদের অভিযোগ
চা শ্রমিক নেতা আকাশ দোষাদ বলেন, তাঁরা বিভিন্ন চা-বাগানে প্রচারণা চালিয়ে শ্রীমঙ্গল চৌমুহনার সামনে বড় মানববন্ধনের কর্মসূচি ঘোষণা করেছিলেন। কর্মসূচি শেষে তাঁরা র্যালি নিয়ে লেবার হাউসের সামনে যান। রাস্তা পার হয়ে কিছুটা দূরে গিয়ে আবার ফেরার সময় পরেশ কালিন্দি, বিজয় হাজরাসহ কয়েকজন তাঁদের ওপর অতর্কিত হামলা চালান।
আকাশ দোষাদ বলেন, তারা আমাদের ধরে লেবার হাউসের গেটের সামনে নিয়ে মারধর করেন। এ ঘটনার যথেষ্ট ভিডিও ফুটেজ আমাদের কাছে রয়েছে। সেখানে পুলিশ অবস্থান করলেও আমাদের কেউ বাচায় নি।
তিনি অভিযোগ করে বলেন, প্রথমে চা শ্রমিক নেতা দুলাল হাজরা তাঁদের ব্যানার ছিঁড়ে ফেলেন। পরে চা শ্রমিক ইউনিয়নের অর্থ সম্পাদক পরেশ কালিন্দী ও নেতা সুবাস রবিদাস আন্দোলনকারীদের ধরে চা শ্রমিক ইউনিয়নের গেইটে নিয়ে আসেন। এরপর ইউনিয়নের সাধারণ সম্পাদক নিপেন পাল, বালিশিরা ভ্যালীর সভাপতি বিজয় হাজরা, সুমন হাজরা ও সুমন তাঁতীসহ কয়েকজন আন্দোলনকারীদের ধরে মারধর শুরু করেন।
তিনি দাবি করেন, হামলায় তাঁদের ১০ থেকে ১২ জন আহত হয়েছেন। তাঁদের মধ্যে জনকলাল দেশোয়ারা, রাধামোহন নুনিয়া ও গীতা রানী কানুকে মৌলভীবাজার সদর হাসপাতালে স্থানান্তর করা হয়েছে।
আকাশ দোষাদ বলেন, ৫০০ টাকা দৈনিক মজুরির দাবি করায় মালিকপক্ষের দালাল চা শ্রমিক ইউনিয়নের নেতাদের একটি অংশ তাঁদের ওপর হামলা করেছে। তিনি এ ঘটনার সুষ্ঠু বিচার দাবি করেন।
হামলার অভিযোগ অস্বীকার
তবে হামলার অভিযোগ অস্বীকার করেছেন চা শ্রমিক নেতা পরেশ কালিন্দি। তাঁর দাবি, মানববন্ধন শেষে একটি পক্ষ লেবার হাউসের অফিসে ঢুকে ভাঙচুর ও গালাগাল করে। ওই সময় তাঁরা ভবনের ওপরের তলায় একটি কর্মসূচিতে ছিলেন। পরে ওই পক্ষ নিচে নেমে বাইরে আসার সময় রাস্তা পার হয়ে চলে যায়।
পরেশ কালিন্দির দাবি, অফিসে হামলা ও ভাঙচুরের পর তাঁদের লোকজন ধাওয়া দিলে ওই পক্ষ পালিয়ে যায়। পুলিশের সামনে কাউকে ধরে এনে মারধরের অভিযোগও তিনি অস্বীকার করেন।
ব্যানার ছেঁড়ার বিষয়ে তিনি বলেন, ওই পক্ষ রাস্তার ওপারে যাওয়ার সময় তাদের ব্যানার ছিঁড়ে ফেলে। এরপর তাঁর লোকজন চিৎকার-চেঁচামেচি করে বাইরে বের হন। তবে অফিসে ঢুকে ভাঙচুরের ঘটনার কোনো ভিডিও ফুটেজ তাঁর কাছে নেই বলেও জানান তিনি।
ভিডিওতে ভিন্ন চিত্র
এদিকে ঘটনার একটি ভিডিও ফুটেজে দেখা যায়, কয়েকজন চা শ্রমিক নেতা আন্দোলনকারীদের ধরে ধরে মারধর করছেন। ভিডিওতে আন্দোলনকারীদের চা শ্রমিক ইউনিয়নের কার্যালয়ের ভেতরে প্রবেশ করতে দেখা যায়নি। বরং কর্মসূচি শেষে তাঁদের রাস্তার ওপারে চলে যেতে দেখা যায়।
ভিডিওতে আরও দেখা যায়, চা শ্রমিক নেতাদের কয়েকজন দৌড়ে গিয়ে আন্দোলনকারীদের ধরে ফেলেন। এ সময় তাঁদের ব্যানার ছিঁড়ে ফেলা এবং কয়েকজনকে মারধর করতে দেখা যায়। ঘটনাটি পুলিশের উপস্থিতিতেই ঘটেছে বলে ভিডিও ফুটেজে দেখা গেছে।
তদন্তের পর প্রকৃত চিত্র: পুলিশ
শ্রীমঙ্গল থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) আব্দুল্লাহ আল মামুন জানান, গীতা রানী কানুসহ কয়েকজন আন্দোলনকারী চা শ্রমিকদের মজুরি বৃদ্ধির দাবিতে শ্রীমঙ্গল চৌমুহনায় মানববন্ধন করেন। মানববন্ধন শেষে তাঁরা লেবার অফিসের উদ্দেশে রওনা হন। সেখানে গিয়ে কোনো ধরনের ঝামেলা হয়েছে বলে প্রাথমিকভাবে জানা গেছে। একপর্যায়ে দুই পক্ষের মধ্যে ধস্তাধস্তির ঘটনাও ঘটে।
তিনি বলেন, বিস্তারিত তথ্য পাওয়ার পর আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
দৈনিক মজুরি ৫০০ টাকা করার দাবিতে চা শ্রমিকদের কর্মসূচিকে কেন্দ্র করে সংঘর্ষের ঘটনায় এলাকায় উত্তেজনা বিরাজ করছে।
সূত্র: SylhetToday24






