নারায়ণগঞ্জের সোনারগাঁয়ে বর্জ্য ব্যবস্থাপনার অভাবে একের পর এক নদী-খাল ও জলাধার পরিণত হচ্ছে ময়লার ভাগাড়ে। আবাসিক এলাকা, বাজার ও বিভিন্ন স্থাপনা থেকে প্রতিদিনের গৃহস্থালি ও বাণিজ্যিক বর্জ্য ফেলা হচ্ছে নদী-খালে। কোথাও মহাসড়কের পাশে, কোথাও নিচু জমি ও জলাভূমিতে স্তূপ করে রাখা হচ্ছে আবর্জনা। এতে একদিকে জলাধারগুলো দূষিত হচ্ছে, অন্যদিকে দখল ও দূষণের চাপে হুমকিতে পড়েছে পরিবেশ ও জনস্বাস্থ্য।
সোনারগাঁ পৌরসভা, মোগরাপাড়া, কাঁচপুর ও পিরোজপুর ইউনিয়নে সাম্প্রতিক সময়ে এ সমস্যা প্রকট আকার ধারণ করেছে। দ্রুত নগরায়ণের ফলে এসব এলাকায় গড়ে উঠেছে শত শত বহুতল ভবন। এসব ভবনের অসংখ্য ফ্ল্যাট ও আবাসিক স্থাপনা থেকে প্রতিদিন বিপুল পরিমাণ বর্জ্য তৈরি হলেও তা অপসারণ ও ব্যবস্থাপনার জন্য নেই পর্যাপ্ত অবকাঠামো। নেই কার্যকর কোনো স্থায়ী ডাম্পিং স্টেশনও। ফলে নদী-খাল, নিচু জমি ও জলাভূমিই হয়ে উঠছে বর্জ্য ফেলার সহজ জায়গা।
নদী-খালেই ফেলা হচ্ছে বর্জ্য
বর্জ্য ফেলার নির্দিষ্ট স্থান না থাকায় মোগরাপাড়া ও পিরোজপুর ইউনিয়নের বিভিন্ন এলাকার আবর্জনা ফেলা হচ্ছে মোগরাপাড়া চৌরাস্তা কাঁচাবাজার-সংলগ্ন মেনিখালী নদীতে। মেঘনা ও ব্রহ্মপুত্রের শাখা এ নদীতে নিয়মিত বর্জ্য পড়ায় দূষিত হচ্ছে পানি ও নদীর পরিবেশ।
সরেজমিনে দেখা যায়, মেনিখালী ব্রিজের পাশে নদীতে, উদ্ধবগঞ্জ ব্রিজের পাশে পঙ্খীরাজ খালে, ঐতিহাসিক পানাম সেতুর পাশের খালে, ৭ নম্বর ওয়ার্ডের দীঘিরপাড় ও টিপরদী খালেও ফেলা হচ্ছে গৃহস্থালি ও বাণিজ্যিক বর্জ্য।
এ ছাড়া ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়কের কাঁচপুর নয়াবাড়ি, পিরোজপুর ইউনিয়নের আষাঢ়িয়ার চর, পৌর এলাকার ৮ নম্বর ওয়ার্ডের পৌর ভবনাথপুর ও আদমপুর লেক সিটি এলাকাসহ বিভিন্ন স্থানে বর্জ্য ফেলার চিত্র দেখা গেছে। স্থানীয় বাজারগুলোতে প্রতিদিন উৎপন্ন বর্জ্যও ফেলা হচ্ছে আশপাশের নিচু জমি ও জলাভূমিতে।
ডাম্পিং স্টেশন নেই, রাস্তার পাশে বর্জ্যের স্তূপ
সোনারগাঁ পৌরসভায় এতদিন একটি অস্থায়ী ডাম্পিং স্টেশন থাকলেও সেটি ব্যক্তি মালিকানাধীন জমিতে হওয়ায় বর্তমানে সেখানে বর্জ্য ফেলা যাচ্ছে না। ওই জমি এখন প্লট আকারে বিক্রি হচ্ছে। ফলে গত দুই মাস ধরে পৌর এলাকার বিভিন্ন সড়কের পাশে স্তূপ করে রাখা হচ্ছে বর্জ্য।
এতে ছড়াচ্ছে দুর্গন্ধ, দূষিত হচ্ছে আশপাশের পরিবেশ। ঐতিহাসিক ও পর্যটন নগরী হিসেবে পরিচিত সোনারগাঁয়ের গুরুত্বপূর্ণ স্থানগুলোর আশপাশেও বর্জ্যের স্তূপ থাকায় ক্ষুণ্ন হচ্ছে এলাকার সৌন্দর্য ও ভাবমূর্তি। একই সঙ্গে বিব্রতকর পরিস্থিতিতে পড়ছেন দেশি-বিদেশি পর্যটকরাও।
দখল-দূষণে সংকটে জলাধার
স্থানীয়দের অভিযোগ, শুধু বর্জ্য ফেলা নয়, অপরিকল্পিত নগরায়ণ ও জলাধার দখলের কারণেও সোনারগাঁয়ের নদী-খাল ও জলাভূমিগুলো ক্রমেই সংকুচিত হচ্ছে। বর্জ্য ফেলে ভরাটের মাধ্যমে অনেক নিচু জমি ও জলাভূমির স্বাভাবিক বৈশিষ্ট্য নষ্ট হচ্ছে। ফলে পানি নিষ্কাশন ব্যবস্থাও বাধাগ্রস্ত হচ্ছে।
স্থানীয় বাজার ও আবাসিক এলাকার বর্জ্য সরাসরি নদী-খালে পড়ায় দূষণের মাত্রা আরও বাড়ছে। দীর্ঘদিন ধরে এভাবে বর্জ্য ফেলা অব্যাহত থাকলে নদী-খালগুলোর স্বাভাবিক প্রবাহ ও জীববৈচিত্র্য মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার আশঙ্কা করছেন স্থানীয়রা।
ডাস্টবিন নেই, অনিয়মিত বর্জ্য সংগ্রহ
স্থানীয়রা জানান, ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের পর পৌর এলাকার বিভিন্ন স্থান থেকে সাতটি ডাস্টবিন চুরি হয়ে যায়। এরপর পৌরসভার ময়লা সংগ্রহ কার্যক্রমও অনিয়মিত হয়ে পড়ে। বর্তমানে পৌর এলাকায় পর্যাপ্ত ডাস্টবিন না থাকায় বাসিন্দারা বাধ্য হয়ে বিভিন্ন স্থানে ময়লা ফেলছেন।
সোনারগাঁ পৌর এলাকার আদমপুর গ্রামের গৃহবধূ আফিয়া খাতুন বলেন, একসময় প্রতিদিন সকালে পৌরসভার লোকজন এসে ময়লা নিয়ে যেতেন। কিন্তু আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের পর থেকে তারা নিয়মিত আসেন না। ১০-১২ দিন পরপর ময়লা নিতে আসায় বাড়ির সামনে আবর্জনা জমে স্তূপ হয়ে যায়। এতে দুর্গন্ধে এলাকায় বসবাস করা কঠিন হয়ে পড়েছে।
পিরোজপুর গ্রামের বাসিন্দা মোবারক হোসেন বলেন, বাসাবাড়ির বর্জ্য ফেলার নির্দিষ্ট স্থান না থাকায় তা নদীতে ফেলা হচ্ছে। এতে নদীর পানি দূষিত হচ্ছে। পাশাপাশি দুর্গন্ধের কারণে এ এলাকায় চলাচলও কঠিন হয়ে পড়েছে।
পর্যটনেও পড়ছে নেতিবাচক প্রভাব
পরিবেশ উন্নয়ন সোসাইটির চেয়ারম্যান মোহাম্মদ হোসাইন বলেন, সোনারগাঁ একটি গুরুত্বপূর্ণ পর্যটন নগরী। তাই এখানকার পরিবেশ ও রক্ষণাবেক্ষণে প্রশাসনের বিশেষ নজর দেওয়া প্রয়োজন। পৌর এলাকার গুরুত্বপূর্ণ দুটি পর্যটন স্থানে প্রতিদিন কয়েক হাজার মানুষ ঘুরতে আসেন। অপরিচ্ছন্ন পরিবেশের কারণে দেশি-বিদেশি পর্যটকরা বিমুখ হলে পর্যটন শিল্পও হুমকির মুখে পড়বে।
সুশাসনের জন্য নাগরিক—সুজন সোনারগাঁ শাখার সাধারণ সম্পাদক মিজানুর রহমান মামুন বলেন, পৌরসভা ও উপজেলা প্রশাসনের সমন্বয়ে দ্রুত একটি আধুনিক স্থায়ী ডাম্পিং স্টেশন স্থাপন করা জরুরি। পাশাপাশি নিয়মিত বর্জ্য অপসারণ এবং বাজার ও পর্যটনকেন্দ্রগুলোতে নির্ধারিত সময়ে ময়লা পরিষ্কারের ব্যবস্থা করতে হবে।
স্থায়ী ডাম্পিং স্টেশনের জন্য জায়গা খোঁজা হচ্ছে
সোনারগাঁ উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা ও সোনারগাঁ পৌরসভার প্রশাসক আসিফ আল জিনাত জানান, সোনারগাঁয়ে বর্জ্য ব্যবস্থাপনার জন্য কোনো স্থায়ী ডাম্পিং স্টেশন না থাকায় এ সমস্যার সৃষ্টি হয়েছে। স্থায়ীভাবে বর্জ্য ফেলার জন্য জায়গা খোঁজা হচ্ছে।
তবে স্থানীয়দের প্রশ্ন, স্থায়ী সমাধান না হওয়া পর্যন্ত নদী-খাল ও জলাভূমিকে বর্জ্যের ভাগাড়ে পরিণত করার প্রবণতা কীভাবে বন্ধ হবে? দখল ও দূষণের হাত থেকে সোনারগাঁয়ের নদী-খাল ও জলাধার রক্ষায় দ্রুত কার্যকর পদক্ষেপ না নিলে ঐতিহাসিক এ জনপদের পরিবেশ ও পর্যটন সম্ভাবনা আরও বড় সংকটে পড়তে পারে।






