আজ শকুন দিবস।
আকাশে ডানা মেলে চক্কর কাটছে একদল পাখি। দূর থেকে দেখলে হয়তো খুব একটা আকর্ষণীয় মনে হবে না। কিন্তু প্রকৃতির ভারসাম্য রক্ষায় তাদের ভূমিকা অসাধারণ। মৃত প্রাণীর দেহ পড়ে থাকার আগেই ছুটে আসে তারা। পচনশীল মাংস খেয়ে পরিষ্কার করে ফেলে পরিবেশ। রোগজীবাণুর বিস্তার কমিয়ে প্রকৃতিকে রাখে অনেকটাই নিরাপদ।
এই পাখিটির নাম শকুন
মৃত প্রাণীর দেহ খেয়ে প্রকৃতিকে পরিষ্কার রাখার গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকার কারণে শকুনকে বলা হয় ‘প্রকৃতির পরিচ্ছন্নতাকর্মী’। অথচ প্রকৃতির এই নীরব কর্মীই আজ নিজেকে টিকিয়ে রাখার লড়াইয়ে। বাংলাদেশে গত দুই দশকে শকুনের সংখ্যা আশঙ্কাজনকভাবে কমে গেছে। একসময় যে পাখি গ্রামবাংলার আকাশে নিয়মিত দেখা যেত, এখন তাকে দেখতে হলে অনেকটা ভাগ্যের ওপর নির্ভর করতে হয়।
চার কোটি থেকে মাত্র কয়েক হাজার
ভারতীয় উপমহাদেশে একসময় প্রায় ৪ কোটি শকুন ছিল বলে গবেষণায় উঠে এসেছে। সময়ের সঙ্গে সেই সংখ্যা ভয়াবহভাবে কমেছে। বর্তমানে পুরো উপমহাদেশে মাত্র প্রায় ১০ হাজার বাংলা শকুন টিকে আছে বলে জানা যায়।
বাংলাদেশের চিত্রও উদ্বেগজনক। দেশে এখন বাংলা শকুনের সংখ্যা প্রায় ২৬০টির মতো। অর্থাৎ একসময় প্রকৃতির স্বাভাবিক চক্রের গুরুত্বপূর্ণ অংশ হয়ে থাকা এই পাখিটি এখন বিলুপ্তির দ্বারপ্রান্তে।
শকুনের এই বিপর্যয় শুধু একটি পাখির সংখ্যা কমে যাওয়ার ঘটনা নয়। এর সঙ্গে জড়িয়ে আছে পরিবেশের ভারসাম্য, রোগজীবাণু নিয়ন্ত্রণ এবং মানুষের স্বাস্থ্যঝুঁকির মতো গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ও।
কেন হারিয়ে যাচ্ছে শকুন?
গবেষকদের মতে, শকুনের বিপর্যয়ের অন্যতম প্রধান কারণ ছিল গবাদিপশুর চিকিৎসায় ব্যবহৃত ডাইক্লোফেনাক ও কিটোপ্রোফেন জাতীয় ওষুধ।
গবাদিপশুকে চিকিৎসা দেওয়ার পর সেই প্রাণী মারা গেলে তার দেহ শকুনের খাদ্যে পরিণত হয়। কিন্তু ওই প্রাণীর শরীরে ওষুধের ক্ষতিকর অবশিষ্টাংশ থাকলে মৃতদেহ খাওয়ার মাধ্যমে শকুনের শরীরেও তা প্রবেশ করে। বিশেষ করে ডাইক্লোফেনাক শকুনের জন্য মারাত্মক ক্ষতিকর বলে গবেষণায় উঠে এসেছে।
ফলে খাবার খেতে গিয়ে একসময় অসংখ্য শকুন মৃত্যুর মুখে পড়ে। প্রজনন ও স্বাভাবিক বংশবৃদ্ধির সুযোগ কমতে কমতে দ্রুত হ্রাস পেতে থাকে তাদের সংখ্যা।
নিষিদ্ধ হয়েছে ক্ষতিকর ওষুধ
শকুন রক্ষায় বাংলাদেশ সরকারও পদক্ষেপ নিয়েছে। ২০১০ সালে শকুনের জন্য ক্ষতিকর ডাইক্লোফেনাক নিষিদ্ধ করা হয়। এরপর শকুন সংরক্ষণে আরও একটি গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ আসে ২০১৭ সালে। শকুনের জন্য নিরাপদ দুটি এলাকায় কিটোপ্রোফেনও নিষিদ্ধ করা হয়।
এসব উদ্যোগ শকুন সংরক্ষণে গুরুত্বপূর্ণ হলেও শুধু আইন করে এই পাখিকে রক্ষা করা সম্ভব নয়। প্রয়োজন নিষেধাজ্ঞার যথাযথ বাস্তবায়ন, নিরাপদ ওষুধ ব্যবহারে সচেতনতা এবং শকুনের আবাসস্থল ও খাদ্যের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা।
শকুন নেই, বিপদ কার?
শকুনকে অনেক সময় ভুলভাবে ‘অপবিত্র’ বা অপ্রয়োজনীয় পাখি হিসেবে দেখা হয়। বাস্তবে প্রকৃতির পরিচ্ছন্নতা ব্যবস্থায় তাদের ভূমিকা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
একটি মৃত প্রাণীর দেহ দ্রুত সরিয়ে ফেলার মাধ্যমে শকুন পরিবেশে পচনশীল জৈব পদার্থ জমে থাকা কমায়। একই সঙ্গে মৃতদেহ থেকে রোগজীবাণু ছড়িয়ে পড়ার সম্ভাবনাও কমাতে সহায়তা করে।
অর্থাৎ শকুনের সংখ্যা কমে যাওয়া মানে শুধু আকাশ থেকে একটি পাখি হারিয়ে যাওয়া নয়; বরং প্রকৃতির একটি গুরুত্বপূর্ণ ‘পরিচ্ছন্নতা ব্যবস্থা’ দুর্বল হয়ে যাওয়া।
ফিরে আসুক শকুন
একসময় বাংলাদেশের গ্রামাঞ্চলে পরিচিত দৃশ্য ছিল আকাশে শকুনের চক্কর। এখন সেই দৃশ্য ক্রমেই বিরল হয়ে উঠছে। মাত্র কয়েকশ শকুনকে ঘিরে দেশের একটি প্রজাতির ভবিষ্যৎ টিকে আছে।
আজ শকুন দিবস। এই দিনটি তাই শুধু একটি পাখিকে স্মরণ করার দিন নয়; বরং প্রকৃতির সঙ্গে মানুষের সম্পর্ক এবং পরিবেশের ভারসাম্যের কথা নতুন করে ভাবার দিন।
যে পাখি কোনো বিনিময় ছাড়াই মৃত প্রাণীর দেহ সরিয়ে প্রকৃতিকে পরিচ্ছন্ন রাখে, তার বেঁচে থাকার দায়িত্বও মানুষের। নিরাপদ ওষুধের ব্যবহার নিশ্চিত করা, ক্ষতিকর ওষুধের নিষেধাজ্ঞা কার্যকর করা, শকুনের নিরাপদ আবাসস্থল তৈরি করা এবং মানুষের মধ্যে সচেতনতা বাড়ানো, এসব উদ্যোগই পারে প্রকৃতির এই পরিচ্ছন্নতাকর্মীকে বিলুপ্তির হাত থেকে ফিরিয়ে আনতে।
শকুন বাঁচলে শুধু একটি পাখি বাঁচবে না, বাঁচবে প্রকৃতির একটি গুরুত্বপূর্ণ পরিচ্ছন্নতা ব্যবস্থা। আবারও হয়তো বাংলাদেশের আকাশে দেখা যাবে ডানা মেলে চক্কর কাটছে শকুনের দল। প্রকৃতির সেই নীরব পরিচ্ছন্নতাকর্মীরা ফিরে পাবে তাদের হারানো জায়গা।






