পটুয়াখালীর কলাপাড়ার নীলগঞ্জের জেলে সিদ্দিক মাঝির কাছে ইলিশের সংকট কোনো পরিসংখ্যানের বিষয় নয়। তিন দশকেরও বেশি সময় ধরে সাগর ও নদীতে মাছ ধরেছেন তিনি। এই দীর্ঘ সময়ে নিজের চোখের সামনেই বদলে যেতে দেখেছেন ইলিশের বিচরণক্ষেত্র।
সিদ্দিকের ভাষায়, তিন দশকের বেশি সময় ধরে ইলিশ ধরলেও গত সাত-আট বছরে ধীরে ধীরে মাছের পরিমাণ কমে এসেছে। একসময় ইলিশের মৌসুমে নদীর মোহনা ও উপকূলের অগভীর পানিতে প্রচুর মাছ পাওয়া যেত। প্রজন্মের পর প্রজন্ম ধরে যেসব এলাকায় স্থানীয় জেলেরা জাল ফেলতেন, সেসব জায়গায় তখন মিলত বড় বড় ইলিশ।
এখন সেই চিত্র বদলে গেছে।
অগভীর পানিতে বড় ইলিশ পাওয়া কঠিন হয়ে পড়েছে। তবে সিদ্দিক মনে করেন না যে ইলিশ পুরোপুরি হারিয়ে যাচ্ছে। তার অভিজ্ঞতা বলছে, গভীর সাগরে এখনো প্রচুর ইলিশ রয়েছে। কিন্তু মাছগুলো আগের মতো অগভীর পানির স্তরে উঠে আসছে না।
সেখানেই সামনে আসছে বড় প্রশ্ন, ইলিশ কি কমে যাচ্ছে, নাকি তাদের বিচরণক্ষেত্র বদলে যাচ্ছে?
গভীর সাগরের দিকে ইলিশ
সিদ্দিকের অভিজ্ঞতায়, নদীর মোহনা থেকে ২০, ৩০ বা ৪০ কিলোমিটারের মধ্যে যে এলাকায় একসময় প্রচুর ইলিশ পাওয়া যেত, এখন সেখানে মাছের দেখা কম। আগে যেখানে বড় আকারের ইলিশ পাওয়া যেত, এখন সেখান থেকে তেমন মাছ মিলছে না।
অন্যদিকে উপকূল থেকে আরও দূরে, বিশেষ করে ৪০ মিটারের বেশি গভীর পানিতে এখনো ইলিশের উপস্থিতি রয়েছে বলে জানান তিনি।
কিন্তু এই পরিবর্তন প্রান্তিক জেলেদের জন্য বড় সমস্যা তৈরি করছে। তাদের অনেকের নৌকা ও জাল অগভীর পানিতে মাছ ধরার উপযোগী। ফলে ইলিশ যদি আরও গভীর সাগরে চলে যায়, সেই মাছের কাছে পৌঁছানো তাদের পক্ষে কঠিন হয়ে পড়ে।
এর প্রভাব সরাসরি পড়ছে জেলেদের আয়ে।
পটুয়াখালীর আরেক জেলে আবুল হোসেন ইলিশের ভরা মৌসুমে ১৪ দিন সাগরে থেকেও মাত্র তিন হাজার টাকা নিয়ে ফিরেছেন। অথচ আগের বছর একই সময়ে তার আয় হয়েছিল প্রায় এক লাখ টাকা।
ভাগে মাছ ধরা জেলেদের জন্য এমন একটি ব্যর্থ সমুদ্রযাত্রা শুধু হতাশার নয়, বড় আর্থিক ঝুঁকিরও। নৌকার মালিককে জাল, বরফ ও খাবারের খরচ বহন করতে হয়। মাছ বিক্রির অর্থ থেকে এসব ব্যয় বাদ দেওয়ার পর বাকি অর্থ ভাগ হয় জেলেদের মধ্যে। ফলে মাছ কম পাওয়া মানে আয় কমার পাশাপাশি ঋণের বোঝা বাড়ার আশঙ্কাও।
উৎপাদনেও পতন
দেশে ইলিশের মোট উৎপাদনের তথ্যেও সাম্প্রতিক পরিবর্তনের ইঙ্গিত রয়েছে।
২০২২-২৩ অর্থবছরে দেশে ইলিশের উৎপাদন রেকর্ড প্রায় ৫ লাখ ৭১ হাজার টনে পৌঁছেছিল। কিন্তু পরবর্তী দুই বছরে উৎপাদন প্রায় ১২ দশমিক ৫ শতাংশ কমে যায়।
২০২৩-২৪ অর্থবছরে জাতীয়ভাবে ইলিশ আহরণ নেমে আসে প্রায় ৫ লাখ টনে, যা সাত বছরের মধ্যে সর্বনিম্ন। আরও উদ্বেগের বিষয় হলো, ২০২৫ সালের জুলাই ও আগস্টে আগের বছরের একই সময়ের তুলনায় ইলিশ আহরণ প্রায় ৪৫ শতাংশ কমে যায় বলে জানা গেছে।
তবে উৎপাদন কমে যাওয়ার অর্থ এই নয় যে সমুদ্রে ইলিশের মোট সংখ্যা একই হারে কমে গেছে।
পদ্মাতেও বদলে যাচ্ছে ইলিশ
সাগরের জেলেদের অভিজ্ঞতার সঙ্গে দেশের নদীগুলোতেও কিছু পরিবর্তনের মিল পাওয়া যাচ্ছে।
রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের মৎস্যবিজ্ঞান বিভাগের অধ্যাপক ও মৎস্যবিজ্ঞান বিশেষজ্ঞ ড. ইয়ামিন হোসেন ২০১৭ সাল থেকে পদ্মায় ইলিশ নিয়ে গবেষণা করছেন। ইলিশ সংরক্ষণে ২২ দিনের নিষেধাজ্ঞার সময় তার দল জব্দ করা মাছের নমুনা পরীক্ষা করে আসছে।
তার গবেষণায় দেখা গেছে, ২০২২ সাল পর্যন্ত অক্টোবর ও নভেম্বর মাসে পাওয়া অধিকাংশ ইলিশের ওজন ছিল ৩০০ গ্রামের কম। ৬০০ থেকে ৭০০টি মাছের নমুনার মধ্যে ৩০০ গ্রামের বেশি ওজনের ইলিশ পাওয়া যেত হাতে গোনা, সাধারণত আট থেকে দশটির বেশি নয়।
ড. ইয়ামিন হোসেনের পর্যবেক্ষণ, বড় আকারের ইলিশের উজানে উঠে আসার হার উল্লেখযোগ্যভাবে কমেছে।
আরও উদ্বেগের বিষয় হলো, ছোট আকারেই ইলিশের প্রাপ্তবয়স্ক হয়ে ওঠার প্রমাণ মিলছে। সাধারণত প্রজননক্ষম ইলিশের দৈর্ঘ্য প্রায় ২৩ সেন্টিমিটার। কিন্তু পদ্মায় গবেষণায় ১৭ থেকে ১৮ সেন্টিমিটার দৈর্ঘ্য এবং ১৪০ থেকে ১৫০ গ্রাম ওজনের প্রাপ্তবয়স্ক ইলিশও পাওয়া গেছে।
তার মতে, এটি উদ্বেগজনক পরিস্থিতি।
ইলিশ কি আসলে কমে গেছে?
ইলিশ আহরণ কমে যাওয়ার সঙ্গে ইলিশের মোট সংখ্যা কমে যাওয়াকে এক করে দেখার সুযোগ নেই।
বাংলাদেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের মৎস্য জীববিজ্ঞান ও জেনেটিকস বিভাগের অধ্যাপক ড. শামসুল আলম ইলিশের জিনোম সিকোয়েন্সিংয়ের সঙ্গে যুক্ত ছিলেন। তার মতে, সাম্প্রতিক সময়ে ইলিশের জিনগত বৈচিত্র্য বা সংখ্যায় বড় ধরনের ধস নেমেছে, এমন প্রমাণ পাওয়া যায়নি।
বরং জিনগত তথ্য ইঙ্গিত করে, অতীতে ইলিশের সংখ্যায় সংকোচন ঘটলেও সাম্প্রতিক সময়ে সংখ্যা বৃদ্ধির প্রবণতাই দেখা যাচ্ছে।
অধ্যাপক আলমের ধারণা, গভীর সাগরে ইলিশের উপস্থিতি বাড়ার বিষয়টি মাছটির আচরণগত অভিযোজনের ফল হতে পারে। অর্থাৎ পরিবেশের পরিবর্তনের সঙ্গে খাপ খাইয়ে ইলিশ ধীরে ধীরে আরও গভীর পানির দিকে সরে যাচ্ছে।
নদীর পথ সংকুচিত, বদলে যাচ্ছে অভিবাসন
ইলিশের জীবনচক্র নদী ও সাগরের সঙ্গে ওতপ্রোতভাবে জড়িত। প্রজননের জন্য সাগর থেকে মিঠাপানির দিকে উঠে আসে এই মাছ। ফলে নদীর পানিপ্রবাহ, নাব্যতা ও পরিবেশের ওপর ইলিশের প্রজনন ও চলাচল অনেকটাই নির্ভরশীল।
গবেষকদের মতে, উজানে পানিপ্রবাহ কমে যাওয়া এবং নদীতে পলি জমা বড় সমস্যা তৈরি করছে।
অধ্যাপক শামসুল আলম ফারাক্কা বাঁধের কারণে পানিপ্রবাহ কমে যাওয়া এবং নদীতে চর জেগে ওঠার বিষয়টি তুলে ধরেছেন। অন্যদিকে ড. ইয়ামিন হোসেন বাংলাদেশের নদীগুলোতে ব্যাপক পলি জমার কথা উল্লেখ করে গুরুত্বপূর্ণ নদীগুলোতে দ্রুত ড্রেজিংয়ের প্রয়োজনীয়তার কথা বলেছেন।
ইলিশের চলাচলের জন্য প্রয়োজনীয় গভীর পানির পথও অনেক জায়গায় সংকুচিত হয়েছে।
মৎস্য অধিদপ্তরের এক জরিপে মেঘনা-তেঁতুলিয়া মোহনা ও আশপাশের নদীগুলোতে ইলিশের চলাচলে বাধা সৃষ্টি করছে এমন ১৭টি স্থান চিহ্নিত করা হয়েছে। এর মধ্যে ১৪টি মেঘনা নদীতে।
ধারণা করা হয়, ইলিশের স্বাভাবিক চলাচলের জন্য প্রায় ৩০ ফুট গভীর পানি প্রয়োজন। কিন্তু ভাটার সময় মোহনার কিছু এলাকায় পানির গভীরতা মাত্র আট থেকে নয় ফুটে নেমে আসে।
জলবায়ু পরিবর্তনের চাপও বাড়ছে
ইলিশ কখন কোথায় যাবে, তার সঙ্গে বৃষ্টিপাত, মিঠাপানির প্রবাহ, পানির তাপমাত্রা, লবণাক্ততা ও স্রোতের গভীর সম্পর্ক রয়েছে।
ফলে মৌসুমি বৃষ্টিপাতের ধরন বদলে যাওয়া এবং বঙ্গোপসাগরের পানির তাপমাত্রা বৃদ্ধির মতো জলবায়ুগত পরিবর্তন ইলিশের চলাচল ও প্রজননেও প্রভাব ফেলতে পারে।
উপকূলীয় আবাসস্থলও নিরাপদ নেই। বিশেষ করে ম্যানগ্রোভ বা বাদাবন-সংলগ্ন এলাকায় ক্ষতিকর পদ্ধতিতে মাছ ধরা, কীটনাশক ও বিষের ব্যবহার ইলিশের প্রজনন ও বেড়ে ওঠার পরিবেশকে হুমকির মুখে ফেলছে।
ড. ইয়ামিন হোসেনের মতে, কোনো বন্য মাছের প্রজনন ব্যাহত হলে টিকে থাকার জন্য তারা অন্যত্র চলে যেতে পারে।
তবে ইলিশের জীবনচক্রের প্রতিটি পর্যায়ে ঠিক কী ধরনের লবণাক্ততা, পানির ঘোলাভাব, তাপমাত্রা ও স্রোতের সমন্বয় প্রয়োজন, তা এখনো পুরোপুরি জানা যায়নি। এই জায়গায় আরও গবেষণার প্রয়োজন রয়েছে।
নিষেধাজ্ঞায় সাফল্য, বাস্তবায়নে প্রশ্ন
ইলিশ সংরক্ষণে বাংলাদেশ দীর্ঘদিন ধরে বিভিন্ন মৌসুমি নিষেধাজ্ঞা কার্যকর করছে। এর মধ্যে জাটকা ধরা বন্ধ, প্রজনন মৌসুমে মা ইলিশ আহরণ নিষিদ্ধ এবং সাগরে নির্দিষ্ট সময় মাছ ধরার ওপর নিষেধাজ্ঞা রয়েছে।
এসব উদ্যোগের সুফলও পাওয়া গেছে। গবেষণায় দেখা গেছে, মা ইলিশ আহরণে নিষেধাজ্ঞার ফলে বিপুলসংখ্যক প্রজননক্ষম মাছ নিরাপদে ডিম ছাড়ার সুযোগ পায়।
তবে জেলেদের অভিযোগ, নিষেধাজ্ঞা সব এলাকায় সমানভাবে কার্যকর হয় না।
সিদ্দিক মাঝির দাবি, কুয়াকাটা, পটুয়াখালী ও বরগুনা এলাকার জেলেরা সাধারণত সাগরে মাছ ধরার নিষেধাজ্ঞা মেনে চললেও অন্য এলাকার কিছু নৌকা তখনো মাছ ধরে।
ফলে একদিকে যারা নিয়ম মানছেন, তারা আর্থিকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছেন; অন্যদিকে অন্যরা নিষেধাজ্ঞা অমান্য করে মাছ ধরলে সংরক্ষণ কার্যক্রমের সুফলও কমে যাচ্ছে।
ক্ষতিপূরণ নিয়েও রয়েছে অভিযোগ। নিষেধাজ্ঞার সময় জেলেদের চাল দেওয়া হলেও সাক্ষাৎকার দেওয়া জেলেদের মতে, এই সহায়তা পর্যাপ্ত নয় এবং প্রকৃত জেলেরা সবসময় তা পান না।
শুধু নিষেধাজ্ঞা নয়, দরকার দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা
ইলিশ রক্ষায় শুধু প্রতিবছর কয়েক সপ্তাহ মাছ ধরা বন্ধ রাখলেই সমস্যার সমাধান হবে না। প্রয়োজন ইলিশের পুরো জীবনচক্রকে বিবেচনায় নিয়ে দীর্ঘমেয়াদি ব্যবস্থাপনা।
নদীর পানিপ্রবাহ ও ইলিশের চলাচলের পথ পুনরুদ্ধার, পলি জমা কমাতে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা, উপকূলীয় প্রজনন ও বিচরণক্ষেত্র রক্ষা, ক্ষতিকর পদ্ধতিতে মাছ ধরা বন্ধ এবং সব এলাকায় সমানভাবে আইন প্রয়োগ, সবকিছুকেই গুরুত্ব দিতে হবে।
একই সঙ্গে নিষেধাজ্ঞার সময় প্রকৃত জেলেদের পর্যাপ্ত সহায়তা নিশ্চিত করাও জরুরি। কারণ জীবিকার নিরাপত্তা ছাড়া দীর্ঘমেয়াদি সংরক্ষণ কার্যক্রমে জেলেদের সম্পৃক্ত রাখা কঠিন।
আশার জায়গা এখনো আছে
ইলিশের ভবিষ্যৎ নিয়ে উদ্বেগ থাকলেও আশার জায়গা একেবারে শেষ হয়ে যায়নি।
বাংলাদেশের আগের ইলিশ ব্যবস্থাপনা কর্মপরিকল্পনা দেখিয়েছে, লক্ষ্যভিত্তিক সংরক্ষণ কার্যক্রমের মাধ্যমে ইলিশের উৎপাদন, মাছের আকার এবং জেলেদের আয়, তিনটিই বাড়ানো সম্ভব।
ড. ইয়ামিন হোসেনের মতে, জাটকা রক্ষা এবং প্রজননক্ষম মা ইলিশকে নিরাপদে ডিম ছাড়ার সুযোগ দেওয়া গেলে ২০২৮-২৯ সালের মধ্যে ইলিশের প্রাচুর্য আবার বাড়তে শুরু করতে পারে।
তবে তার জন্য দরকার বিজ্ঞানভিত্তিক ব্যবস্থাপনা এবং ধারাবাহিক গবেষণা।
কারণ ইলিশ শুধু বাংলাদেশের জাতীয় মাছ নয়; লাখো জেলের জীবিকা এবং দেশের মৎস্য অর্থনীতির গুরুত্বপূর্ণ অংশও এটি।
সিদ্দিক মাঝির চোখে যে পরিবর্তন ধরা পড়েছে, তা হয়তো ইলিশের বিলুপ্তির গল্প নয়। বরং এটি হতে পারে বদলে যাওয়া পরিবেশের সঙ্গে ইলিশের খাপ খাইয়ে নেওয়ার গল্প। মাছ হয়তো এখনো আছে কিন্তু তার পথ বদলে যাচ্ছে, বদলে যাচ্ছে তার থাকার গভীরতা।
তাই এখন প্রশ্ন শুধু ‘ইলিশ কমছে কি না’ নয়। বরং আরও জরুরি প্রশ্ন হলো, ইলিশ কোথায় যাচ্ছে, কেন যাচ্ছে এবং তার স্বাভাবিক চলাচলের পথ আমরা কতটা নিরাপদ রাখতে পারছি?
এই প্রশ্নের উত্তর খুঁজে বের করাই হতে পারে বাংলাদেশের ইলিশের ভবিষ্যৎ রক্ষার সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ।






