বর্জ্য নয়, সম্পদ: ১২ হাজার টন কমলার খোসায় আবর্জনা থেকে অরণ্য

১২ হাজার টন কমলার খোসা ও পাল্প ফেলার ১৫ বছর পর গবেষকেরা দেখলেন অবিশ্বাস্য পরিবর্তন।

বর্জ্য মানেই কি আবর্জনা? সবসময় নয়। সঠিকভাবে ব্যবহার করতে পারলে মানুষের কাছে ফেলনা কোনো জিনিসও প্রকৃতির জন্য মূল্যবান সম্পদ হয়ে উঠতে পারে। এর অসাধারণ এক উদাহরণ পাওয়া গেছে মধ্য আমেরিকার দেশ কোস্টারিকায়।

কোস্টারিকার একটি জাতীয় উদ্যানের অনুর্বর জমিতে ফেলা হয়েছিল প্রায় ১২ হাজার মেট্রিক টন কমলার খোসা ও পাল্প। প্রায় দেড় দশক পর গবেষকেরা সেখানে গিয়ে দেখলেন, একসময়কার অনুর্বর জমিটি ঘন সবুজ বনে পরিণত হয়েছে।

গবেষকেরা পরে দেখতে পান, যে তিন হেক্টর জমিতে কমলার খোসা ফেলা হয়েছিল, সেখানে গাছের বায়োমাস অর্থাৎ একটি নির্দিষ্ট এলাকায় থাকা গাছপালার মোট ভর বেড়েছিল ১৭৬ শতাংশ।

শুধু গাছের পরিমাণই বাড়েনি। ওই জমির মাটির গুণমান, গাছের বৈচিত্র্য এবং বনের ঘনত্ব, সবই পাশের জমির তুলনায় উল্লেখযোগ্যভাবে বেশি ছিল।

কিন্তু কীভাবে সম্ভব হলো এমন পরিবর্তন?

শুরুটা কমলার খোসা দিয়ে

ঘটনাটি ১৯৯০-এর দশকের মাঝামাঝি সময়ের। কোস্টারিকার উত্তর সীমান্তে তখন ডেল অরো নামে একটি প্রতিষ্ঠান কমলার জুস তৈরির কারখানা চালু করে।

সেসময় পরিবেশবিদ ড্যানিয়েল জানজেন ও উইনি হলভাক্স কোস্টারিকার গুয়ানাকাস্তে সংরক্ষিত বনাঞ্চলে কাজ করছিলেন। তাঁরা ডেল অরোকে একটি অভিনব প্রস্তাব দেন।

প্রস্তাব ছিল, প্রতিষ্ঠানটি যদি সংরক্ষিত বনাঞ্চলের জন্য কিছু বনভূমি দান করে, তাহলে জাতীয় উদ্যানের ক্ষতিগ্রস্ত একটি জমিতে তাদের কমলার খোসা ও অন্যান্য জৈব বর্জ্য ফেলার সুযোগ দেওয়া হবে। এসব জৈব বর্জ্য সময়ের সঙ্গে পচে মাটির সঙ্গে মিশে গিয়ে জমির উর্বরতা বাড়াতে সহায়তা করবে।

প্রস্তাবে রাজি হয় ডেল অরো। ১৯৯৭ সালের চুক্তির পর প্রায় ১২ হাজার মেট্রিক টন কমলার খোসা ও পাল্প ট্রাকে করে নিয়ে গিয়ে অনুর্বর জমিটিতে ফেলে দেওয়া হয়।

তবে বছর না ঘুরতেই শুরু হয় আইনি জটিলতা।

আদালতের মামলায় থেমে গেল সব

ডেল অরোর প্রতিদ্বন্দ্বী প্রতিষ্ঠান টিকোফ্রুট অভিযোগ করে, জাতীয় উদ্যানে বিপুল পরিমাণ বর্জ্য ফেলে জায়গাটি ‘নষ্ট’ করা হয়েছে।

মামলাটি শেষ পর্যন্ত কোস্টারিকার সুপ্রিম কোর্ট পর্যন্ত গড়ায়। আদালত টিকোফ্রুটের পক্ষে রায় দেন। এরপর প্রায় ১৫ বছর জায়গাটির কথা তেমন কেউ মনে রাখেনি।

২০১৩ সালে প্রিন্সটন বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষক টিমোথি ট্রয় পরিবেশবিদ ড্যানিয়েল জানজেনের সঙ্গে সম্ভাব্য গবেষণার বিষয় নিয়ে আলোচনা করছিলেন। তখনই উঠে আসে সেই পুরোনো কমলার খোসা ফেলার জায়গাটির কথা।

ট্রয় সেখানে গিয়ে যা দেখলেন, তা তাঁর কল্পনার চেয়েও বেশি চমকপ্রদ।

একসময়কার অনুর্বর জমিটি এতটাই ঘন গাছপালা ও লতায় ঢেকে গিয়েছিল যে রাস্তার পাশে থাকা প্রায় সাত ফুট লম্বা উজ্জ্বল হলুদ সাইনবোর্ডটিও গাছের আড়ালে হারিয়ে গিয়েছিল।

পাশের জমির সঙ্গে তুলনা

গবেষকেরা এবার জানতে চাইলেন, এই পরিবর্তনের পেছনে সত্যিই কি কমলার খোসার ভূমিকা রয়েছে?

এটি যাচাই করতে তাঁরা কমলার খোসা ফেলা জমির সঙ্গে রাস্তার অপর পাশে থাকা একই ধরনের একটি জমির তুলনা করেন। দুই জায়গায় গাছের সংখ্যা, গাছের আকার ও প্রজাতি পরিমাপ করা হয়। পাশাপাশি সংগ্রহ করা হয় মাটির নমুনা।

ফলাফল ছিল স্পষ্ট।

কমলার খোসা ফেলা জমির মাটি ছিল তুলনামূলক বেশি পুষ্টিসমৃদ্ধ। সেখানে গাছের বায়োমাস বেশি, গাছের প্রজাতির বৈচিত্র্য বেশি এবং বনের ওপরের সবুজ ছাউনিও ছিল বেশি ঘন।

২০১৫ সালের জুলাইয়ে কোয়াডকপ্টার ড্রোনে তোলা ছবিতেও দুই জমির পার্থক্য স্পষ্ট হয়ে ওঠে। কমলার খোসা দিয়ে সার দেওয়া এলাকায় ১০ মিটারের বেশি উঁচু গাছ, ঘন ঝোপ ও লতাগুল্মে জমি ঢেকে ছিল। বিপরীতে রাস্তার অপর পাশের জমিতে ছিল ছড়িয়ে-ছিটিয়ে থাকা প্রায় দুই মিটার উঁচু গাছসহ পাথুরে ঘাসজমি।

অর্থাৎ যে বর্জ্য একসময় ছিল মানুষের কাছে একেবারেই ফেলনা, সেটিই ধীরে ধীরে একটি অনুর্বর জমিকে আবার সবুজ করে তুলেছিল।

বর্জ্যই যখন সম্পদ

প্রিন্সটন বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষকদের এই গবেষণা প্রকাশিত হয় ‘রেস্টোরেশন ইকোলজি’ সাময়িকীতে। গবেষণাটির অন্যতম লেখক টিমোথি ট্রয়ের মতে, কৃষি ও খাদ্যশিল্পের বর্জ্য ব্যবহার করে বন পুনরুদ্ধারের এমন উদাহরণ খুব বেশি নেই।

কোস্টারিকার এই ঘটনা পরিবেশ সংরক্ষণ ও বর্জ্য ব্যবস্থাপনা নিয়ে নতুন করে ভাবার সুযোগ তৈরি করে। খাদ্য উৎপাদনের সময় যে অংশটুকুকে আমরা অপ্রয়োজনীয় মনে করি, প্রকৃতির কাছে সেটিই কখনো কখনো মূল্যবান সম্পদ হয়ে উঠতে পারে।

প্রায় ১৫ বছর জায়গাটির কথা তেমন কেউ মনে রাখেনি। অথচ গবেষকেরা ফিরে গিয়ে দেখলেন, প্রকৃতি নিজের মতো করে সেই ‘বর্জ্য’কে কাজে লাগিয়েছে।

প্রিন্সটনের পরিবেশবিদ ডেভিড উইলকোভের ভাষায়, মানুষের প্রয়োজনীয় পণ্য তৈরি করতে গিয়ে শিল্পপ্রতিষ্ঠানগুলো অনেক সময় পরিবেশগত সমস্যাও তৈরি করে। তবে সেই প্রতিষ্ঠানগুলো এবং পরিবেশ নিয়ে কাজ করা মানুষ একসঙ্গে কাজ করলে সেই সমস্যার কিছুটা সমাধানও করা সম্ভব।

এই গল্প তাই শুধু কমলার খোসার গল্প নয়। এটি আমাদের মনে করিয়ে দেয়, বর্জ্য ব্যবস্থাপনার সঠিক ধারণা থাকলে আবর্জনাও হয়ে উঠতে পারে পরিবেশ পুনরুদ্ধারের উপকরণ।

সূত্র: প্রিন্সটন ডটএডু ও প্রথম আলো

আরও পড়ুন

ডাইনোসর বিলুপ্ত, তবু টিকে গেল কুমির: রহস্য উন্মোচন

পৃথিবী থেকে একসময় হারিয়ে গেছে বিশালাকার ডাইনোসর। প্রায় ৬ কোটি ৬০ লাখ বছর আগে এক গ্রহাণুর আঘাতে পৃথিবীর প্রায় ৭৫ শতাংশ প্রজাতি বিলুপ্ত হয়ে...
প্রকৃতি ও জীববৈচিত্র্য
0
minutes

মিঠাপানির প্রবাহ কমায় বদলে যাচ্ছে সুন্দরবনের উদ্ভিদসমাজ, বাড়ছে কাঁকড়া গাছ

বিশ্বের বৃহত্তম ম্যানগ্রোভ বন সুন্দরবনে এক দশকের ব্যবধানে বীজ থেকে চারা জন্মানোর হার কমেছে। ২০১০ থেকে ২০২০ সালের তথ্য বিশ্লেষণে দেখা গেছে, এ সময়ে...
প্রকৃতি ও জীববৈচিত্র্য
0
minutes

নিরাপত্তা বোধ করায় শাবকদের নিয়ে ধানখেতে নিশ্চিন্তে বিশ্রাম হাতির পালের

সাধারণত কৃষিজমির মাঝখানে একসঙ্গে অনেক হাতিকে শুয়ে বিশ্রাম নিতে দেখা যায় না। তবে ভারতের আসাম রাজ্যের সবুজ ধানখেতের মাঝে কাদামাটির একটি জায়গায় এশীয় হাতির...
প্রকৃতি ও জীববৈচিত্র্য
0
minutes

পরিবেশ রক্ষায় সরকারি কর্মকর্তাদের বাড়তি উদ্যোগের আহ্বান প্রধানমন্ত্রীর

পরিবেশ ও বন রক্ষায় জনসচেতনতা বাড়ানোর পাশাপাশি সরকারি কর্মকর্তাদের নির্ধারিত দায়িত্বের বাইরেও উদ্যোগী হয়ে কাজ করার আহ্বান জানিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। তিনি বলেছেন, দেশের...
প্রকৃতি ও জীববৈচিত্র্য
0
minutes
spot_imgspot_img