প্রজননের জন্য সঙ্গীর খোঁজে সাধারণত অনেক প্রাণীকেই দীর্ঘ পথ পাড়ি দিতে দেখা যায়। কিন্তু আফ্রিকার বুনো কুকুরদের সাম্প্রতিক এক যাত্রা সেই পরিচিত ধারণাকেও নতুন করে ভাবতে বাধ্য করেছে বিজ্ঞানীদের। সঙ্গীর সন্ধানে তিনটি বুনো কুকুর প্রায় ৪১২৬ কিলোমিটার পথ অতিক্রম করেছে। আট মাস ধরে চলা এই যাত্রায় তারা জঙ্গল পেরিয়ে জনবসতি ও শিল্পাঞ্চলের মধ্য দিয়েও এগিয়েছে।
বন্যপ্রাণ সংরক্ষণকারীদের পর্যবেক্ষণে আফ্রিকার স্থলচর প্রাণীদের মধ্যে এমন দীর্ঘ পথ পাড়ি দেওয়ার ঘটনা অত্যন্ত বিরল। ফলে বুনো কুকুরদের এই আচরণ নিয়ে বিজ্ঞানীমহলে তৈরি হয়েছে বিশেষ আগ্রহ।
কেন এত দূরের পথ পাড়ি দেয় বুনো কুকুর?
আফ্রিকার বুনো কুকুর অত্যন্ত সামাজিক প্রাণী। তারা সাধারণত দলবদ্ধ হয়ে বসবাস করে এবং দলের সদস্যদের মধ্যে ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক থাকে। তবে প্রজননের ক্ষেত্রে নিজেদের দলের সদস্যদের সঙ্গে জুটি বাঁধার প্রবণতা তাদের মধ্যে নেই।
সাধারণত দুই থেকে তিন বছর বয়সের পর বুনো কুকুর সঙ্গীর সন্ধানে নিজের দল ছেড়ে অন্য এলাকায় চলে যায়। এর ফলে বিভিন্ন দলের মধ্যে জিনগত বৈচিত্র্য বজায় থাকার সুযোগ তৈরি হয়।
এই কারণেই সঙ্গীর সন্ধানে তাদের দীর্ঘ পথ পাড়ি দিতে হয়।
জিপিএস ট্র্যাকারে ধরা পড়ল অবিশ্বাস্য যাত্রা
বিজ্ঞানীরা বুনো কুকুরদের চলাচল পর্যবেক্ষণের জন্য তাদের গলায় জিপিএস ট্র্যাকার ব্যবহার করেছিলেন। সেই তথ্য বিশ্লেষণ করেই জানা যায়, কয়েকটি বুনো কুকুর মাত্র আট মাসে মোট ৪১২৬ কিলোমিটার পথ অতিক্রম করেছে।
তাদের যাত্রা কেবল গভীর জঙ্গলের মধ্যেই সীমাবদ্ধ ছিল না। জ়াম্বিয়ার বিভিন্ন জনবসতি এবং শিল্পাঞ্চলের মধ্য দিয়েও তাদের এগিয়ে যেতে দেখা যায়।
গবেষণার তথ্য অনুযায়ী, বুনো কুকুরগুলির একটি দল জ়াম্বিয়ার রাজধানী লুসাকা এলাকা থেকে যাত্রা শুরু করেছিল বলে মনে করা হচ্ছে।
শুরু হয়েছিল দলবদ্ধভাবেই
সঙ্গীর খোঁজে যাত্রা শুরু করার সময় বুনো কুকুরগুলি একসঙ্গেই ছিল। পরে দীর্ঘ পথ পাড়ি দিতে গিয়ে তারা চারটি ছোট দলে ভাগ হয়ে যায়। প্রতিটি দলে ছিল প্রায় তিন থেকে চারটি বুনো কুকুর।
এই দলগুলির মধ্যে একটি দলই সবচেয়ে বেশি দূর পর্যন্ত এগিয়ে যায়।
সেই দলে ছিল চারটি বুনো কুকুর। কিন্তু যাত্রাপথের শেষের দিকে একটি বুনো কুকুর শিকারিদের পাতা ফাঁদে আটকে পড়ে। বাকি তিনটি তখন বাধ্য হয়ে তাকে পেছনে রেখে সামনে এগিয়ে যায়।
বন্ধুকে ফেলে গেলেও বারবার ফিরে এসেছিল তিনটি কুকুর
এই ঘটনাটিই বিজ্ঞানীদের সবচেয়ে বেশি ভাবিয়েছে।
ফাঁদে আটকে পড়া সঙ্গীকে পেছনে রেখে এগিয়ে যাওয়ার পরও বেঁচে থাকা তিনটি বুনো কুকুর বারবার সেই জায়গায় ফিরে আসে। তাদের গতিবিধির তথ্য বিশ্লেষণ করে গবেষকরা মনে করেন, তারা সম্ভবত ফেলে যাওয়া সঙ্গীটির অবস্থানের দিকেই বারবার ফিরে যাচ্ছিল।
অস্তিত্ব রক্ষার তাগিদে সামনে এগিয়ে গেলেও দলের সদস্যটির প্রতি তাদের এই ফিরে আসার আচরণ বুনো কুকুরদের সামাজিক বন্ধনের গভীরতা সম্পর্কে নতুন প্রশ্ন তৈরি করেছে।
বিপন্ন এই প্রাণীর সংখ্যা মাত্র প্রায় ৬ হাজার
বর্তমানে পৃথিবীতে আফ্রিকান বুনো কুকুরের সংখ্যা প্রায় ৬ হাজার বলে উল্লেখ করা হয়েছে। ফলে তাদের প্রজনন এবং নতুন এলাকায় বিস্তারের বিষয়টি প্রজাতিটির টিকে থাকার ক্ষেত্রে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
সঙ্গীর সন্ধানে দীর্ঘ দূরত্ব অতিক্রম করার এই প্রবণতা শুধু তাদের আচরণগত বৈশিষ্ট্য নয়, প্রজাতিটির জিনগত বৈচিত্র্য বজায় রাখার ক্ষেত্রেও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে।
গবেষণাটি ‘Ecology’ জার্নালে প্রকাশিত হয়েছে বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।
পূর্ব ও দক্ষিণ আফ্রিকার মধ্যে প্রজননগত সংযোগের ইঙ্গিত
বিজ্ঞানীদের ধারণা, বুনো কুকুরদের এমন দীর্ঘ পথ অতিক্রমের ঘটনা পূর্ব ও দক্ষিণ আফ্রিকার বিভিন্ন অঞ্চলের বুনো কুকুরের মধ্যে প্রজননগত যোগাযোগ থাকার ইঙ্গিত দিতে পারে।
অর্থাৎ, একটি অঞ্চলের দল থেকে বেরিয়ে অন্য অঞ্চলে গিয়ে সঙ্গী খোঁজার মাধ্যমে তারা বিভিন্ন জনসংখ্যার মধ্যে জিনের আদান-প্রদানের সুযোগ তৈরি করে।
সংরক্ষণেই টিকে থাকার সম্ভাবনা
বুনো কুকুরের এই দীর্ঘ যাত্রা শুধু একটি প্রাণীর অসাধারণ চলাচলের গল্প নয়; এটি তাদের অস্তিত্ব টিকিয়ে রাখার সংগ্রামেরও একটি উদাহরণ।
মানুষের বসতি, শিল্পাঞ্চল, শিকারিদের ফাঁদসহ নানা ঝুঁকির মধ্য দিয়েই তাদের চলাচল করতে হচ্ছে। তাই বুনো কুকুরের মতো বিপন্ন প্রাণীর আবাসস্থল ও চলাচলের পথ নিরাপদ রাখা সংরক্ষণ কার্যক্রমের গুরুত্বপূর্ণ অংশ হয়ে উঠছে।
সঙ্গীর সন্ধানে আট মাসে ৪১২৬ কিলোমিটার পথ পাড়ি দেওয়া এই তিন বুনো কুকুর যেন দেখিয়ে দিল- প্রজাতিকে টিকিয়ে রাখার লড়াইয়ে প্রকৃতির প্রাণীরাও নিজেদের মতো করে অবিরাম পথ খুঁজে নেয়।
সূত্র: আনন্দবাজার






