চট্টগ্রামের আনোয়ারায় বিষাক্ত বর্জ্যপানিতে মৎস্যঘেরের মাছ মরে ভেসে ওঠার অভিযোগ উঠেছে। এতে অন্তত ২০ জন মৎস্যচাষি প্রায় ৩৫ লাখ টাকার আর্থিক ক্ষতির মুখে পড়েছেন। ক্ষতিগ্রস্ত চাষিদের অভিযোগ, কর্ণফুলী ইউরিয়া ফার্টিলাইজার কোম্পানি (কাফকো) থেকে বের হওয়া কেমিক্যালযুক্ত বর্জ্যপানি মৎস্যঘেরে ঢুকে পড়ায় এ পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়েছে।
শুক্রবার (১৮ সেপ্টেম্বর) দুপুরে আনোয়ারা উপজেলার বৈরাগ ইউনিয়নের শাহাদাতনগর এলাকার কয়েকটি মৎস্যঘেরে গিয়ে এমন চিত্র দেখা যায়।
সরেজমিনে দেখা যায়, কয়েকটি মৎস্যঘেরের পানিতে বিপুলসংখ্যক মাছ মরে ভেসে আছে। মরে যাওয়া মাছ থেকে দুর্গন্ধ ছড়িয়ে পড়ছে আশপাশের এলাকায়। চাষিরা আশঙ্কা করছেন, দ্রুত প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া না হলে ঘেরের বাকি মাছও মারা যেতে পারে।
স্থানীয়রা জানান, সাবেক সংসদ সদস্য শাহাদাতের কাছ থেকে ইজারা নিয়ে দীর্ঘদিন ধরে এসব ঘেরে মাছ চাষ করে আসছেন তারা। চাষিদের অভিযোগ, কাফকোর দিক থেকে আসা একটি ড্রেনের পানি ঘেরগুলোতে ঢুকে পড়ার পরপরই মাছ মরতে শুরু করে।
লাখ লাখ টাকার মাছ নিয়ে দুশ্চিন্তায় চাষিরা
ক্ষতিগ্রস্ত চাষিরা জানান, বিভিন্ন ব্যক্তি ও ব্যাংক থেকে ঋণ নিয়ে তারা মাছ চাষ করছেন। ঘের থেকে মাছ বিক্রি করেই পরিবারের জীবিকা নির্বাহের পাশাপাশি ঋণ ও কিস্তি পরিশোধ করেন তারা। হঠাৎ মাছ মারা যাওয়ায় একদিকে যেমন বড় ধরনের আর্থিক ক্ষতির মুখে পড়েছেন, অন্যদিকে ঋণ পরিশোধ নিয়েও দুশ্চিন্তায় রয়েছেন।
ক্ষতিগ্রস্ত চাষি মো. ঈসমাইল ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, ‘কয়েক দশক ধরে এই পেশায় আছি। এর আগেও কাফকোর বর্জ্যপানির কারণে আমাদের মাছ মারা গিয়েছিল। কারখানা কর্তৃপক্ষকে বারবার সতর্ক করলেও কোনো স্থায়ী সমাধান হয়নি। এবারও আমাদের লাখ লাখ টাকা ভেসে গেল, এই ক্ষতিপূরণ এখন কে দেবে?’
ক্ষতিগ্রস্ত অন্য চাষিরা হলেন মো. বাবুল হক খান, মো. খায়রুল বশর, মো. জসীম উদ্দীন, মো. সাবা, মো. আনোয়ার, এমদাদ হোসেন, মেহেদী হোসেন, মো. নেজাম উদ্দীন, মো. সাগর, মো. জাহাঙ্গীর আলম, মো. ফারুক, আমিরুজ্জামান, মো. আবু কালাম, মোজাম্মেল, মো. মারুফ, মো. টিপু, মো. খায়রুন্নবী, মো. গিয়াস উদ্দিন ও মো. সেলিম খান।
‘২০ পরিবারের জীবিকা নির্ভরশীল’
বিষয়টি নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করে উপজেলা বিএনপির সাবেক সদস্য মামুন খান বলেন, ‘এই ঘেরগুলোর ওপর ২০টি পরিবারের জীবিকা নির্ভরশীল। কাফকোর দায়িত্বহীনতায় বিষাক্ত পানি ছেড়ে চাষিদের এভাবে পথে বসিয়ে দেওয়া কোনোভাবেই মেনে নেওয়া যায় না। দ্রুত ক্ষতিগ্রস্তদেরকে ক্ষতিপূরণের ব্যবস্থা করতে কাফকোর কাছে দাবি জানাচ্ছি।’
মেরামতের সময় রাসায়নিক মিশ্রিত পানি ছাড়ার অভিযোগ
খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, গ্যাস সংকটের কারণে বেশ কিছুদিন ধরেই কাফকোতে সার উৎপাদন ব্যাহত ও বন্ধ রয়েছে। তবে উৎপাদন বন্ধ থাকা অবস্থায় কারখানার অভ্যন্তরীণ যন্ত্রপাতি মেরামত, ধোয়ামোছা ও ওভারহোলিংয়ের কাজ চলছিল।
চাষিদের অভিযোগ, মেরামতের সময় ব্যবহৃত ক্ষতিকর কেমিক্যাল ও রাসায়নিক মিশ্রিত পানি যথাযথভাবে শোধন না করেই অভ্যন্তরীণ নালার মাধ্যমে বাইরে ছেড়ে দেওয়া হয়েছে। পরে ওই ড্রেনের পানি খাল হয়ে সংলগ্ন মৎস্যঘেরগুলোতে গিয়ে মিশেছে।
তবে এ অভিযোগের বিষয়ে কাফকোর বক্তব্য পাওয়া যায়নি। ঘটনার বিষয়ে বক্তব্য জানতে কাফকোর প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা (সিইও) মো. ফারুখ আহমদের মুঠোফোনে একাধিকবার চেষ্টা করা হলেও তাকে পাওয়া যায়নি।
লিখিত অভিযোগ পেলে নমুনা পরীক্ষা
আনোয়ারা উপজেলা সিনিয়র মৎস্য কর্মকর্তা মো. রাশিদুল হক বলেন, ‘এ বিষয়ে এখনো কোনো লিখিত অভিযোগ পাইনি। লিখিত অভিযোগ পেলে দ্রুত সরেজমিনে পরিদর্শন করে পানির নমুনা পরীক্ষা ও প্রয়োজনীয় আইনি ব্যবস্থা নেওয়া হবে।’
এদিকে ক্ষতিগ্রস্ত চাষিরা দ্রুত মৎস্যঘেরের পানির নমুনা পরীক্ষা, দূষণের উৎস শনাক্ত এবং ক্ষতির পরিমাণ নিরূপণ করে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়ার দাবি জানিয়েছেন।
সূত্র: চাটগাঁ নিউজ ডট কম






