বাংলাদেশে একসময় মূলত শীতকালীন পরিযায়ী পাখি হিসেবে দেখা মিলত খয়রা কাস্তেচরার। তবে সাম্প্রতিক বছরগুলোতে দেশের উত্তরাঞ্চল ও হাওর এলাকায় এই বিরল পাখির একাধিক প্রজনন কলোনির সন্ধান মিলেছে। এমনকি দেশের প্রকৃতিতে খয়রা কাস্তেচরার সফল প্রজননের প্রথম নিশ্চিত নথিও পাওয়া গেছে।
সম্প্রতি ‘জার্নাল অব দ্য বোম্বে ন্যাচারাল হিস্ট্রি সোসাইটি’তে প্রকাশিত এক গবেষণায় এসব তথ্য উঠে এসেছে। ‘ফার্স্ট কনফার্মড ব্রিডিং রেকর্ডস অব গ্লসি আইবিস প্লেগাডিস ফালসিনেলাস অ্যান্ড রিকলোনাইজেশন অব ব্ল্যাক-হেডেড আইবিস থ্রেসকিওর্নিস মেলানোসেফালাস ইন বাংলাদেশ’ শীর্ষক গবেষণাটি পরিচালিত হয়েছে জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রাণিবিদ্যা বিভাগের অধ্যাপক ড. মোহাম্মদ মনিরুল হাসান খান ও অধ্যাপক ড. মো. কামরুল হাসানের যৌথ দিকনির্দেশনায়। নেতৃত্বে ছিলেন বন অধিদপ্তরের গবেষক আল্লামা শিবলী সাদিক।
গবেষণায় যুক্ত ছিলেন মো. শের-ই-আফগান, রিমা আক্তার, আহনাফ আল সাদমান, সামিউল মহসানিন ও আশীষ কুমার দত্ত।
প্রথম নিশ্চিত প্রজননের প্রমাণ জয়পুরহাটে
২০২২ থেকে ২০২৪ সাল পর্যন্ত মে থেকে আগস্ট, প্রজনন মৌসুমে দেশের বিভিন্ন এলাকায় মাঠপর্যায়ে পর্যবেক্ষণ চালানো হয়। এতে বিভিন্ন প্রজনন কলোনিতে কাস্তেচরার অবস্থান, সংখ্যা ও বাসা তৈরির তথ্য সংগ্রহ করা হয়।
গবেষণায় দেখা যায়, ২০২৪ সালের ২৪ আগস্ট জয়পুরহাটের গৌরীপাড়া প্রজনন কলোনিতে ৫৮টি পূর্ণবয়স্ক খয়রা কাস্তেচরা এবং ছয়টি সক্রিয় বাসা পাওয়া যায়। এর মধ্যে দুটি পৃথক বাসায় দুটি করে মোট চারটি ছানাকে বাবা-মায়ের কাছ থেকে খাবার খেতে দেখা যায়।
এটিই বাংলাদেশে খয়রা কাস্তেচরার সফল প্রজননের প্রথম নথিভুক্ত ও নিশ্চিত প্রমাণ। গ্রামের একটি কৃত্রিম পুকুরের পাশে ছোট বাঁশঝাড়ে বাসাগুলো তৈরি করা হয়েছিল।
উত্তরাঞ্চলে গড়ে উঠছে একাধিক কলোনি
জয়পুরহাটের ক্ষেতলালের কাজীপুরে প্রজনন মৌসুমে রাতে আশ্রয়ের জন্য বিপুলসংখ্যক খয়রা কাস্তেচরা জড়ো হয়। ২০২২ সালে এখানে ২৫৩টি, ২০২৩ সালে সর্বোচ্চ ২৯০টি এবং ২০২৪ সালে ১৮০টি পাখি পাওয়া যায়। ২০২৩ সালে একই এলাকায় ১৬টি কালামাথা কাস্তেচরারও উপস্থিতি রেকর্ড করা হয়।
আক্কেলপুরের পুনডুরিয়া কলোনিতে ২০২২ সালে কোনো খয়রা কাস্তেচরা পাওয়া না গেলেও ২০২৩ সালে ৫৫টি এবং ২০২৪ সালে ১৮টি পাখি প্রজনন মৌসুমে রাতে আশ্রয় নেয়।
নওগাঁর কুন্তাইলে ২০২৩ সালে একটি বিশাল বটগাছে ৪৫টি খয়রা কাস্তেচরাকে বাসা তৈরির উপকরণ বহন করতে দেখা যায়।
একই এলাকায় ২০২২ সালের ৪ জুন একটি বিশাল বটগাছে ১৫ থেকে ১৬ মিটার উচ্চতায় কালামাথা কাস্তেচরার চারটি সক্রিয় বাসা পাওয়া যায়। ওই কলোনিতে কালামাথা কাস্তেচরার সংখ্যা ২০২২ সালে ৭৯টি, ২০২৩ সালে ৬০টি এবং ২০২৪ সালে ৫৬টি রেকর্ড করা হয়।
আলিদেওনায় বাড়ছে দুই প্রজাতির সংখ্যা
নওগাঁর মহাদেবপুর উপজেলার আলিদেওনা কলোনিতেও দুই প্রজাতির কাস্তেচরার উপস্থিতি প্রতি বছর বেড়েছে।
খয়রা কাস্তেচরা পাওয়া যায় ২০২২ সালে ১৭টি, ২০২৩ সালে ৪৩টি এবং ২০২৪ সালে ৬০টি। কালামাথা কাস্তেচরার সংখ্যা ছিল যথাক্রমে ১৯, ২২ ও ৫০টি।
গবেষকেরা টানা তিন বছরই এসব পাখিকে মুখে করে বাসা তৈরির উপকরণ বহন করতে দেখেছেন।
রাজশাহীর গোদাগাড়ীর ঝিকরাপাড়া কলোনিতে ২০২৩ সালে ১৬টি এবং ২০২৪ সালে ২২টি খয়রা কাস্তেচরা পাওয়া যায়। একই এলাকায় কালামাথা কাস্তেচরা ছিল যথাক্রমে ১৮ ও ২০টি।
স্থানীয় বাসিন্দারাও ২০২৩ ও ২০২৪ সালে সেখানে পাখিগুলোর ডিম ফুটে ছানা হওয়ার তথ্য নিশ্চিত করেছেন।
বগুড়ার রামনগর কলোনিতেও প্রজনন মৌসুমে রাতের আশ্রয়স্থল হিসেবে খয়রা কাস্তেচরার উপস্থিতি পাওয়া গেছে। ২০২২ সালে সেখানে সর্বোচ্চ ৯০টি, ২০২৩ সালে ৬৫টি এবং ২০২৪ সালে ২৪টি পাখি নথিভুক্ত করা হয়।
প্রজননস্থল ধ্বংসে বাড়ছে শঙ্কা
গবেষণায় কাস্তেচরার নতুন কলোনি গড়ে ওঠার পাশাপাশি তাদের টিকে থাকার ক্ষেত্রে বেশ কিছু উদ্বেগজনক তথ্যও উঠে এসেছে।
২০২৩ সালের জুনে কালবৈশাখীতে নওগাঁর কুন্তাইলে কালামাথা কাস্তেচরার প্রধান প্রজননস্থল হিসেবে ব্যবহৃত বিশাল পুরোনো বটগাছটি উপড়ে পড়ে। এতে পাখিদের নিয়মিত প্রজনন ও আশ্রয়ের পরিবেশ মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়।
এ ছাড়া ২০২১ সালে একই কলোনিতে উড়তে না শেখা দুটি ছানা বাসা থেকে পড়ে গিয়ে মারা যায়।
গবেষকেরা বলছেন, এসব পাখি ঘনবসতিপূর্ণ গ্রামের ছোট বাঁশঝাড় কিংবা পুরোনো গাছে বাসা বাঁধে। ফলে মানুষের উপস্থিতি, কোলাহল, রাতের আলো এবং প্রজনন মৌসুমে অনিয়ন্ত্রিতভাবে বাঁশ বা গাছ কাটার কারণে তাদের প্রজনন পরিবেশ হুমকির মুখে পড়ছে।
কিছু কলোনিতে কমেছে পাখির সংখ্যা
কলোনিভিত্তিক তথ্যেও কয়েকটি এলাকায় উদ্বেগজনকভাবে পাখির সংখ্যা কমে যাওয়ার চিত্র পাওয়া গেছে।
বগুড়ার রামনগরে ২০২২ সালে ৯০টি খয়রা কাস্তেচরা থাকলেও ২০২৪ সালে তা কমে দাঁড়িয়েছে ২৪টিতে। একইভাবে কাজীপুরে ২০২৩ সালে ২৯০টি পাখি পাওয়া গেলেও ২০২৪ সালে সংখ্যা নেমে আসে ১৮০টিতে।
গবেষকদের মতে, এসব পরিবর্তন প্রজননস্থল ও আশ্রয়স্থলে বিভিন্ন ধরনের বিঘ্নের ইঙ্গিত দিতে পারে।
হাওর থেকে কৃষিজমিতে আসে প্রজননের জন্য
গবেষণার নেতৃত্বদানকারী শিবলী সাদিক বলেন, ২৪টি জেলা নিয়ে মাঠপর্যায়ে গবেষণাটি পরিচালনা করা হয়েছে। প্রাথমিকভাবে হাওরাঞ্চলে এসব পাখির উপস্থিতি বেশি বলে মনে হলেও প্রজননের জন্য তারা এমন কিছু এলাকা বেছে নিচ্ছে, যেখানে সাধারণত বড় প্রজনন কলোনির প্রত্যাশা করা হয় না।
তিনি বলেন, শীতকালে পাখিগুলো হাওরাঞ্চলে অবস্থান করলেও গ্রীষ্ম ও বর্ষায় প্রজননের জন্য কৃষিপ্রধান এলাকায় চলে আসে। বিশেষ করে জয়পুরহাট, নওগাঁ, রাজশাহী, চাঁপাইনবাবগঞ্জ ও বগুড়া অঞ্চলে তাদের প্রজনন কলোনি বেশি দেখা যাচ্ছে।
এসব পাখি গভীর পানির পরিবর্তে অল্প পানিতে খাবার খোঁজে। তাই বর্ষার কৃষিজমি তাদের পছন্দের আবাসস্থল। শুষ্ক মৌসুমে পানি কমে গেলে তারা আবার হাওর ও বিলে ফিরে যায়।
স্থানীয় মানুষের সহযোগিতাই বড় ভরসা
অধ্যাপক ড. মোহাম্মদ মনিরুল হাসান খান বলেন, খয়রা কাস্তেচরা একসময় বাংলাদেশে অত্যন্ত বিরল একটি পাখি ছিল। তবে সাম্প্রতিক বছরগুলোতে এর সংখ্যা বেড়েছে। উত্তরবঙ্গের একাধিক জলাভূমি ও মিশ্র পাখির কলোনিতে তারা সফলভাবে বাসা তৈরি ও প্রজনন শুরু করেছে।
তিনি বলেন, বিরল একটি পাখির এভাবে কলোনি গড়ে প্রজনন শুরু করা পরিবেশের জন্য অত্যন্ত ইতিবাচক ঘটনা। সাম্প্রতিক গবেষণায় বৃহত্তর সিলেটের হাওর এলাকার মিশ্র কলোনিতেও এদের নিয়মিত বাসা বাঁধার তথ্য পাওয়া গেছে।
অধ্যাপক মনিরুল হাসান খান আরও বলেন, জলচর পাখি জলাভূমির বাস্তুতন্ত্র ও প্রজাতিগত ভারসাম্য রক্ষায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। নিরাপদ পরিবেশ পেলে তারা বছরের পর বছর একই এলাকায় বাসা বাঁধে। বাড়ির মালিক ও স্থানীয় বাসিন্দারা পাখিদের ভালোবাসেন ও সুরক্ষা দেন, এমন জায়গাতেই সাধারণত এসব কলোনি গড়ে ওঠে।
তবে প্রজনন মৌসুমে হাজার হাজার পাখি একসঙ্গে অবস্থান করায় স্থানীয় বাসিন্দাদের কিছু সমস্যাও হয়। মার্চ থেকে অক্টোবর পর্যন্ত পাখির বিষ্ঠায় দুর্গন্ধ ছড়ায়, ঘরের টিনের চালে জং ধরে এবং পুকুরে মাছ চাষ ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে।
এ কারণে পাখির কলোনি রক্ষাকারী জমি বা বাড়ির মালিকদের প্রতিবছর ক্ষতিপূরণ বা প্রণোদনা দেওয়ার জন্য বন অধিদপ্তরের কাছে দাবি জানিয়েছেন তিনি।
সূত্র: কালবেলা






