একটি সিগাল পাখিকে বাঁচাতে ফুটবল মাঠে সিপিআর দেওয়ার চেষ্টা করে প্রশংসায় ভাসছেন তুরস্কের এক অধিনায়ক।
সেদিন ছিল রবিবার। ইস্তাম্বুলের ফুটবল মাঠে চলছিল জমজমাট লড়াই। মুখোমুখি ইস্তাম্বুল ইয়ারদুম ও মেভলানাকাপি গুজেলহিসার। মাঠজুড়ে খেলোয়াড়দের ছুটোছুটি, গোলের জন্য মরিয়া চেষ্টা, সব মিলিয়ে উত্তেজনায় ভরপুর ম্যাচ।
কিন্তু ২২ মিনিটে ঘটে গেল এক অপ্রত্যাশিত ঘটনা। ইয়ারদুমের গোলরক্ষক মুহাম্মেত উয়ানিকের পা থেকে ছুটে যাওয়া জোরালো বল আঘাত করল আকাশে উড়তে থাকা একটি সিগাল পাখিকে। মুহূর্তেই মাটিতে ছিটকে পড়ল পাখিটি।
প্রথমে কী ঘটেছে, তা বুঝে উঠতে পারেননি গোলরক্ষক মুহাম্মেত। পরে আহত পাখিটিকে নিস্তেজ পড়ে থাকতে দেখে উদ্বিগ্ন হয়ে পড়েন মাঠের খেলোয়াড়েরা।
এ সময় আর দেরি করেননি দলের অধিনায়ক গনি কাতান। দ্রুত ছুটে যান পাখিটির কাছে। দেখেন, সেটি নড়াচড়া করছে না। কীভাবে সাহায্য করবেন, তা বুঝতে না পারলেও হাল ছাড়েননি তিনি।
পাখিটিকে বাঁচানোর আশায় মাঠের মধ্যেই তার বুকের ওপর বারবার চাপ দিতে থাকেন গনি। এটি সিপিআর বা জরুরি পুনরুজ্জীবন প্রচেষ্টার মতো একটি পদক্ষেপ। তাঁর এই চেষ্টায় মুহূর্তের জন্য থমকে যায় খেলা। মাঠের খেলোয়াড় ও দর্শকদের দৃষ্টি তখন আহত পাখিটির দিকে।
কিছুক্ষণ পর পাখিটির পা নড়তে শুরু করে। ধীরে ধীরে সাড়া দেওয়ার লক্ষণও দেখা যায়। মাঠে উপস্থিত খেলোয়াড়েরা তখন পাখিটিকে ঘিরে ধরেন। পরে সেটিকে সাবধানে মাঠের পাশে নিয়ে চিকিৎসাকর্মীদের হাতে তুলে দেওয়া হয়।
পাখিটির ডানায় আঘাত লেগেছিল। চিকিৎসাকর্মীদের পর্যবেক্ষণে সেটি বেঁচে যাবে বলে জানানো হয়।
খেলার উত্তেজনা ছাপিয়ে প্রাণের মায়া
মাঠের এই দৃশ্য ছুঁয়ে যায় উপস্থিত সবাইকে। ম্যাচের ধারাভাষ্যকার ওনুর ওজসয় পরে জানান, ঘটনাটি দেখে তিনি কিছুক্ষণের জন্য ধারাভাষ্য দিতেই ভুলে গিয়েছিলেন। দর্শকেরাও ফোন করে খেলার ফলের চেয়ে বেশি জানতে চাইছিলেন, ‘পাখিটা কেমন আছে?’
একটি আহত পাখিকে ঘিরে সেদিন যেন বদলে গিয়েছিল পুরো মাঠের পরিবেশ। গোলের উত্তেজনা, জয়ের আকাঙ্ক্ষা কিংবা প্রতিপক্ষকে হারানোর লড়াই, সবকিছুকে ছাপিয়ে বড় হয়ে উঠেছিল একটি প্রাণ বাঁচানোর চেষ্টা।
গনি কাতান পেশায় একজন হিসাবরক্ষক। তিনি চিকিৎসক নন, এমনকি তাঁর প্রাথমিক চিকিৎসার প্রশিক্ষণও ছিল না বলে প্রকাশিত বর্ণনায় উল্লেখ করা হয়েছে। তবু অসহায় পাখিটিকে পড়ে থাকতে দেখে সাহায্যের চেষ্টা করেছিলেন তিনি।
চ্যাম্পিয়নশিপ নয়, বড় জয় একটি প্রাণ বাঁচানো
শেষ পর্যন্ত ম্যাচে হেরে যায় ইস্তাম্বুল ইয়ারদুম। হাতছাড়া হয় চ্যাম্পিয়নশিপ জয়ের সুযোগও। কিন্তু মাঠের ওই ঘটনার পর ম্যাচের হার যেন আর বড় হয়ে থাকেনি।
অধিনায়ক গনি কাতানের নামে প্রচারিত একটি বক্তব্যে বলা হয়, ‘চ্যাম্পিয়নশিপ তো আরও আসবে, কিন্তু একটা জীবন বাঁচানো, সেটা তো আর প্রতিদিন হয় না। ওইটাই সবচেয়ে বড় জয়।’
ফুটবল মাঠে সাধারণত জয়-পরাজয়ের হিসাব হয় গোল দিয়ে। কিন্তু সেদিনের ঘটনা মনে করিয়ে দিল, সব জয় স্কোরবোর্ডে লেখা থাকে না। কখনো কখনো অসহায় একটি প্রাণের পাশে দাঁড়ানোই হয়ে ওঠে সবচেয়ে বড় অর্জন।
মাঠের সেই রবিবার তাই শুধু একটি ফুটবল ম্যাচের স্মৃতি হয়ে থাকেনি। হয়ে উঠেছে মমতা, সহমর্মিতা আর প্রাণের প্রতি ভালোবাসার এক গল্প।






