পাহাড়ের সবুজ অরণ্য, সমুদ্রের নীল জলরাশি, নদীর বুকে জেগে ওঠা চর, হাওরের বিস্তীর্ণ জলাভূমি কিংবা সুন্দরবনের রহস্যময় জীববৈচিত্র্য, প্রকৃতির এসব অপরূপ সৌন্দর্যই মানুষকে টেনে নেয় ঘরের বাইরে। কিন্তু যে প্রকৃতিকে দেখার জন্য মানুষের এত আয়োজন, সেই প্রকৃতিই আজ অপরিকল্পিত পর্যটন, প্লাস্টিক দূষণ, বনভূমি ধ্বংস ও মানুষের অবিবেচক কর্মকাণ্ডে বিপন্ন হয়ে উঠছে। পর্যটনের প্রসারের সঙ্গে প্রকৃতি সংরক্ষণের সমন্বয় ঘটাতে না পারলে একদিন হারিয়ে যেতে পারে ভ্রমণের সবচেয়ে আকর্ষণীয় স্থানগুলোই।
আজ ২৭ সেপ্টেম্বর, বিশ্ব পর্যটন দিবস। বিশ্বের অন্যান্য দেশের মতো বাংলাদেশেও দিনটি পর্যটনের অর্থনৈতিক সম্ভাবনা, সাংস্কৃতিক ঐতিহ্য এবং পরিবেশগত গুরুত্ব তুলে ধরার সুযোগ এনে দিয়েছে। তবে বাংলাদেশের বাস্তবতায় পর্যটনের ভবিষ্যৎ নিয়ে আলোচনার কেন্দ্রে থাকা উচিত জীববৈচিত্র্য সংরক্ষণ, স্থানীয় জনগোষ্ঠীর অংশগ্রহণ এবং প্রকৃতিবান্ধব পর্যটনব্যবস্থা গড়ে তোলা।
প্রকৃতিই পর্যটনের প্রাণ, অথচ সেই প্রকৃতিই বিপন্ন
পর্যটনশিল্পের অন্যতম প্রধান আকর্ষণ প্রাকৃতিক পরিবেশ। পৃথিবীর বহু দেশের অর্থনীতি বনাঞ্চল, পাহাড়, সমুদ্র, প্রবালপ্রাচীর ও বন্যপ্রাণীকেন্দ্রিক পর্যটনের ওপর নির্ভরশীল। বাংলাদেশেও সুন্দরবন, কক্সবাজার, সেন্ট মার্টিন, পার্বত্য চট্টগ্রাম, রাতারগুল, টাঙ্গুয়ার হাওর এবং লাউয়াছড়ার মতো অঞ্চলগুলো প্রকৃতিপ্রেমী পর্যটকদের কাছে বিশেষ আকর্ষণীয়।
কিন্তু পর্যটকদের সংখ্যা বৃদ্ধির সঙ্গে সঙ্গে এসব এলাকার প্রাকৃতিক পরিবেশের ওপর চাপও বাড়ছে। পর্যটনকেন্দ্র ঘিরে অপরিকল্পিত অবকাঠামো নির্মাণ, বনের ভেতর উচ্চ শব্দে গান বাজানো, বন্যপ্রাণীকে বিরক্ত করা, যত্রতত্র প্লাস্টিক ও খাবারের উচ্ছিষ্ট ফেলে রাখা এবং জলাশয়ে নৌযানের অনিয়ন্ত্রিত চলাচল প্রাকৃতিক বাস্তুতন্ত্রের ক্ষতি করতে পারে।
প্রকৃতির একটি বাস্তুতন্ত্রে উদ্ভিদ, প্রাণী, মাটি, পানি ও জলবায়ু পরস্পরের সঙ্গে সম্পর্কযুক্ত। পর্যটনের কারণে এই সম্পর্কের কোনো একটি অংশ ক্ষতিগ্রস্ত হলে তার প্রভাব পড়তে পারে পুরো বাস্তুতন্ত্রের ওপর। ফলে জীববৈচিত্র্য সংরক্ষণ এখন আর কেবল পরিবেশগত দায়িত্ব নয়, পর্যটনশিল্পের দীর্ঘমেয়াদি অস্তিত্ব রক্ষারও অপরিহার্য শর্ত।
সুন্দরবন: পর্যটনের আকর্ষণ ও সংরক্ষণের চ্যালেঞ্জ
বিশ্বের বৃহত্তম অখণ্ড ম্যানগ্রোভ বন সুন্দরবন বাংলাদেশের প্রকৃতিনির্ভর পর্যটনের অন্যতম প্রধান আকর্ষণ। রয়েল বেঙ্গল টাইগার, চিত্রা হরিণ, কুমির, ডলফিন এবং অসংখ্য প্রজাতির পাখি ও উদ্ভিদের আবাসস্থল এই বন। ১৯৯৭ সালে সুন্দরবনকে বিশ্ব ঐতিহ্যের স্বীকৃতি দেয় ইউনেসকো।
সুন্দরবনে পর্যটনের সম্ভাবনা যেমন রয়েছে, তেমনি রয়েছে সংবেদনশীল বাস্তুতন্ত্রের ক্ষতির আশঙ্কা। পর্যটকবাহী নৌযানের শব্দ, বর্জ্য ব্যবস্থাপনার ঘাটতি এবং বন্যপ্রাণীর আবাসস্থলে মানুষের অনিয়ন্ত্রিত উপস্থিতি বনাঞ্চলের স্বাভাবিক পরিবেশে বিঘ্ন ঘটাতে পারে।
বন বিভাগের ইকো-ট্যুরিজম কার্যক্রমের আওতায় করমজল, হারবাড়িয়া, কটকা, কচিখালীসহ বিভিন্ন স্থানে পর্যটনের ব্যবস্থা রয়েছে। এসব কার্যক্রমের অন্যতম উদ্দেশ্য হলো বন্যপ্রাণীকে বিরক্ত না করে পর্যটকদের সুন্দরবন দেখার সুযোগ দেওয়া।
ইকো-ট্যুরিজম সুন্দরবন
তবে সুন্দরবনকে শুধু পর্যটনকেন্দ্র হিসেবে দেখলে চলবে না। উপকূলীয় জনপদকে ঘূর্ণিঝড় ও জলোচ্ছ্বাসের আঘাত থেকে রক্ষা, কার্বন সংরক্ষণ এবং হাজারো মানুষের জীবিকা নির্বাহে এই বনের ভূমিকা অপরিসীম। তাই সুন্দরবনের পর্যটন পরিকল্পনায় সর্বোচ্চ গুরুত্ব পাওয়া উচিত এর প্রতিবেশগত নিরাপত্তা।
সেন্ট মার্টিন: প্রবাল ও সামুদ্রিক জীববৈচিত্র্য রক্ষার প্রশ্ন
বাংলাদেশের একমাত্র প্রবালসমৃদ্ধ দ্বীপ সেন্ট মার্টিন। সামুদ্রিক শৈবাল, প্রবাল, মাছ ও অন্যান্য সামুদ্রিক প্রাণীর জন্য দ্বীপটির প্রতিবেশগত গুরুত্ব রয়েছে। কিন্তু অপরিকল্পিত পর্যটন, প্লাস্টিক বর্জ্য, আবাসন সম্প্রসারণ এবং সামুদ্রিক পরিবেশের ওপর মানুষের ক্রমবর্ধমান চাপ দ্বীপটির জীববৈচিত্র্যের জন্য উদ্বেগের কারণ।
দ্বীপটির পরিবেশ রক্ষায় সরকার ২০২৩ সালে পরিবেশবান্ধব পর্যটন নির্দেশিকা প্রণয়ন করে। ২০২৫ সালের নভেম্বরে অনিয়ন্ত্রিত পর্যটন নিয়ন্ত্রণে একটি সমন্বিত মহাপরিকল্পনার খসড়ার ওপর মতামতও আহ্বান করা হয়।
সেন্ট মার্টিনের অভিজ্ঞতা মনে করিয়ে দেয়, পর্যটনের সাফল্য কেবল হোটেল, রিসোর্ট কিংবা পর্যটকের সংখ্যা দিয়ে পরিমাপ করা যায় না। দ্বীপের প্রবাল, সামুদ্রিক প্রাণী ও স্থানীয় মানুষের জীবনযাত্রা কতটা সুরক্ষিত থাকছে, সেটিও সমান গুরুত্বপূর্ণ।
পাহাড় ও হাওর: প্রকৃতির নীরব বিপর্যয়
বান্দরবান, রাঙামাটি ও খাগড়াছড়ির পাহাড়ি অঞ্চল বাংলাদেশের পর্যটনশিল্পের গুরুত্বপূর্ণ অংশ। এসব অঞ্চলের পাহাড়, ঝরনা, বনভূমি এবং স্থানীয় জনগোষ্ঠীর বৈচিত্র্যময় সংস্কৃতি পর্যটকদের আকর্ষণ করে।
কিন্তু পাহাড় কেটে অবকাঠামো নির্মাণ, অপরিকল্পিত সড়ক ও রিসোর্ট স্থাপন এবং প্রাকৃতিক পানিপ্রবাহে বাধা সৃষ্টি পাহাড়ি পরিবেশের ভারসাম্য নষ্ট করতে পারে। একই সঙ্গে স্থানীয় জনগোষ্ঠীর ভূমি, সংস্কৃতি ও ঐতিহ্যকে উপেক্ষা করে পর্যটন সম্প্রসারণ টেকসই উন্নয়নের ধারণার সঙ্গে সাংঘর্ষিক।
অন্যদিকে সুনামগঞ্জের টাঙ্গুয়ার হাওর শীতকালে পরিযায়ী পাখি এবং বর্ষায় বিস্তীর্ণ জলরাশির জন্য পরিচিত। পর্যটকবাহী নৌযানের উচ্চ শব্দ, প্লাস্টিক বর্জ্য এবং পাখির বিচরণক্ষেত্রে মানুষের অনিয়ন্ত্রিত উপস্থিতি হাওরের পরিবেশের জন্য হুমকি হয়ে উঠতে পারে।
দূষণের বৈজ্ঞানিক প্রমাণও মিলেছে। ২০২৬ সালে প্রকাশিত একটি গবেষণায় সুন্দরবন, কাপ্তাই হ্রদ ও টাঙ্গুয়ার হাওরের পানিতে মাইক্রোপ্লাস্টিক পাওয়া গেছে। গবেষকেরা পর্যটনসহ মানুষের বিভিন্ন কর্মকাণ্ডকে এই দূষণের সঙ্গে সম্পর্কিত হিসেবে চিহ্নিত করেছেন।
টেকসই পর্যটন: প্রকৃতি ও মানুষের সহাবস্থান
টেকসই পর্যটনের মূল কথা হলো, বর্তমান প্রজন্মের ভ্রমণের চাহিদা পূরণ করতে গিয়ে ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য প্রাকৃতিক সম্পদ ধ্বংস না করা। পর্যটন থেকে অর্থনৈতিক সুবিধা অর্জনের পাশাপাশি পরিবেশ রক্ষা এবং স্থানীয় জনগোষ্ঠীর ন্যায্য অংশগ্রহণ নিশ্চিত করাও এর উদ্দেশ্য।
বাংলাদেশে স্থানীয় জনগোষ্ঠীকে সম্পৃক্ত করে কমিউনিটিভিত্তিক পর্যটন সম্প্রসারণের সুযোগ রয়েছে। পাহাড়ি জনগোষ্ঠীর পরিচালনায় পরিবেশবান্ধব আবাসন, স্থানীয় খাবার ও হস্তশিল্পের বাজার, প্রশিক্ষিত স্থানীয় প্রকৃতি নির্দেশক এবং হাওর ও বনাঞ্চলে নিয়ন্ত্রিত পর্যটন নতুন কর্মসংস্থান সৃষ্টি করতে পারে।
জাতিসংঘও পর্যটনকে টেকসই উন্নয়নের গুরুত্বপূর্ণ মাধ্যম হিসেবে বিবেচনা করে। বিশেষ করে কর্মসংস্থান সৃষ্টি, দায়িত্বশীল উৎপাদন ও ভোগ এবং সামুদ্রিক সম্পদ সংরক্ষণের সঙ্গে পর্যটনের সরাসরি সম্পর্ক রয়েছে।
পর্যটকের দায়িত্বও কম নয়
পরিবেশবান্ধব পর্যটন নিশ্চিত করার দায়িত্ব শুধু সরকারের কিংবা পর্যটন ব্যবসায়ীদের নয়। একজন পর্যটকের সচেতনতাও একটি বন, নদী কিংবা পাহাড়ের জীববৈচিত্র্য রক্ষায় ভূমিকা রাখতে পারে।
ভ্রমণে গিয়ে প্লাস্টিক ও অন্যান্য বর্জ্য নির্ধারিত স্থানে ফেলা, বন্যপ্রাণীকে খাবার না দেওয়া, পাখির বাসা ও প্রজননস্থল থেকে দূরে থাকা, উচ্চ শব্দ পরিহার করা এবং স্থানীয় সংস্কৃতির প্রতি শ্রদ্ধাশীল থাকা দায়িত্বশীল পর্যটনের অপরিহার্য অংশ।
পর্যটনকেন্দ্রগুলোর ধারণক্ষমতা বৈজ্ঞানিকভাবে নির্ধারণ, সংবেদনশীল এলাকায় পর্যটক নিয়ন্ত্রণ, কার্যকর বর্জ্য ব্যবস্থাপনা এবং পরিবেশগত প্রভাব মূল্যায়নের ভিত্তিতে অবকাঠামো নির্মাণও জরুরি।
পর্যটনের ভবিষ্যৎ নির্ভর করছে প্রকৃতি সংরক্ষণের ওপর
এ বছরের বিশ্ব পর্যটন দিবসের আন্তর্জাতিক প্রতিপাদ্য ‘ডিজিটাল এজেন্ডা ও কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার মাধ্যমে পর্যটনের পুনর্বিন্যাস’। নতুন প্রযুক্তি পর্যটকদের বিভিন্ন গন্তব্যে ছড়িয়ে দিতে এবং স্থানীয় ক্ষুদ্র উদ্যোক্তাদের জন্য নতুন সুযোগ তৈরিতে ভূমিকা রাখতে পারে।
বাংলাদেশেও প্রযুক্তির সহায়তায় পর্যটনকেন্দ্রের ধারণক্ষমতা পর্যবেক্ষণ, অনলাইন অনুমতিপত্র, পরিবেশগত তথ্য সংগ্রহ এবং পর্যটকদের মধ্যে জীববৈচিত্র্য সংরক্ষণ বিষয়ে সচেতনতা বাড়ানো সম্ভব।
বিশ্ব পর্যটন দিবসে বাংলাদেশের সামনে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন হলো, আমরা কি প্রকৃতিকে ধ্বংস করে পর্যটনশিল্পের সম্প্রসারণ চাই, নাকি প্রকৃতিকে বাঁচিয়ে দীর্ঘমেয়াদি পর্যটনব্যবস্থা গড়ে তুলতে চাই?
মনে রাখতে হবে, সুন্দরবনে বাঘ না থাকলে, হাওরে পরিযায়ী পাখি না এলে, পাহাড়ে সবুজ অরণ্য হারিয়ে গেলে কিংবা সেন্ট মার্টিনের প্রবাল ধ্বংস হয়ে গেলে শুধু জীববৈচিত্র্যই হারাবে না, হারিয়ে যাবে পর্যটনের অন্যতম প্রধান আকর্ষণও।
প্রকৃতি পর্যটনের পণ্য নয়, বরং পর্যটনের প্রাণ। তাই প্রকৃতিকে জয় করা নয়, প্রকৃতির সঙ্গে সহাবস্থানই হোক বিশ্ব পর্যটন দিবসের অঙ্গীকার।






