ঝিনাইদহ-কোটচাঁদপুর আঞ্চলিক মহাসড়কের দুই পাশে থাকা ২০ থেকে ২৫ বছর বয়সী বিভিন্ন প্রজাতির গাছ কেটে ফেলা হচ্ছে। বড় আকৃতির ও তরতাজা এসব গাছ কাটায় স্থানীয় বাসিন্দাদের মধ্যে প্রশ্ন দেখা দিয়েছে।
বন বিভাগের দাবি, প্রায় আড়াই বছর আগে গাছগুলো কাটার জন্য দরপত্র আহ্বান করা হয়েছিল। পরে কার্যাদেশও দেওয়া হয়। তবে নানা কারণে এত দিন গাছগুলো কাটা সম্ভব হয়নি। এখন সেই কার্যাদেশের আওতায় গাছ কাটা হচ্ছে।
সরেজমিনে দেখা গেছে, ঝিনাইদহের কালীগঞ্জ-জীবননগর সড়কের কোটচাঁদপুর এলাকার কাশিপুর থেকে এলাঙ্গীর দিকে মহাসড়কের দুই পাশে রেইনট্রি, মেহগনি, আকাশমণিসহ বিভিন্ন প্রজাতির গাছ কাটা হচ্ছে। ইতোমধ্যে বেশ কিছু গাছ কেটে নেওয়া হয়েছে। কোথাও গাছের ডালপালা কেটে ফেলা হয়েছে, আবার কোথাও কাটা গাছ রাস্তার পাশে পড়ে আছে। এখনো গাছ কাটার কাজ চলছে।
স্থানীয় বাসিন্দাদের প্রশ্ন, এত বছর ধরে বেড়ে ওঠা তরতাজা গাছগুলো কেন এখন কেটে ফেলা হচ্ছে। এসব গাছ পথচারীদের ছায়া দেওয়ার পাশাপাশি পরিবেশের ভারসাম্য রক্ষায় ভূমিকা রাখছে। তাঁদের অভিযোগ, গাছগুলোর প্রকৃত মূল্য নিয়েও প্রশ্ন রয়েছে।
পুরোনো দরপত্রে গাছ কাটা
বন বিভাগের এক কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করার শর্তে জানান, গাছগুলো কাটার জন্য দরপত্র আহ্বান করা হয়েছিল। তবে ২০২৪ সালের ৫ আগস্টের পর বন ও পরিবেশ মন্ত্রণালয় সারা দেশে সবুজ ও তরতাজা গাছ না কাটার নির্দেশ দেয়। এরপর কোটচাঁদপুর ও শৈলকুপার গাছ কাটা বন্ধ হয়ে যায়।
তাঁর ভাষ্য, এখন পুরোনো দরপত্রের ভিত্তিতে আবার গাছ কাটা হচ্ছে।
সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা জানান, কোটচাঁদপুরে ৪৫টি লটে এবং শৈলকুপায় ছয়টি লটে গাছ বিক্রি করা হয়েছে। বন বিভাগের কার্যাদেশে গাছের সংখ্যা উল্লেখ না করে শুধু লট ও বিক্রয়মূল্য উল্লেখ করা হয়েছে। এসব গাছের বিক্রয়মূল্য নির্ধারণ করা হয়েছে ৩৫ লাখ ৫২ হাজার ২৫ টাকা।
২০২৪ সালের ২৫ এপ্রিল সামাজিক বন বিভাগের যশোর বিভাগীয় বন কর্মকর্তার কার্যালয় থেকে দরপত্র আহ্বান করা হয়। পরে ২০ জুন কার্যাদেশ দেওয়া হয়।
কার্যাদেশ দেওয়া হয় মেসার্স আর কে এন্টারপ্রাইজের নামে। এর মালিক হিসেবে কুষ্টিয়ার মৃত আবুল কাশেমের ছেলে বকুল হোসেনের নাম উল্লেখ রয়েছে। তবে সরেজমিনে গাছ কাটার কাজ তদারক করতে দেখা গেছে কালীগঞ্জের কাঠ ব্যবসায়ী আক্কাচ আলীকে। মূল কার্যাদেশপ্রাপ্ত ব্যবসায়ীকে পাওয়া যায়নি।
‘ঠিকাদারের কাছ থেকে গাছ কিনে কাটছি’
কাঠ ব্যবসায়ী আক্কাচ আলী বলেন, কুষ্টিয়ার এক ঠিকাদার দরপত্রের মাধ্যমে গাছগুলো কিনেছেন। তাঁর কাছ থেকে তিনি গাছ কিনে নিয়ে কাটছেন।
তাঁর দাবি, সরকারি সব নিয়ম মেনেই গাছ কাটা হচ্ছে।
বন বিভাগের একটি সূত্র জানায়, প্রতিটি লটে ২০ থেকে ২৫টি গাছ রয়েছে। সে হিসাবে কোটচাঁদপুরের ৪৫টি লটে হাজারের বেশি গাছ কাটা পড়তে পারে। শৈলকুপা উপজেলায়ও ছয়টি লটে গাছ বিক্রি করা হয়েছে এবং সেখানে গাছ কাটা শুরু হয়েছে।
‘ছায়া-শীতল অবস্থা হারিয়ে গেছে’
কোটচাঁদপুর উপজেলার এলাঙ্গী এলাকার বাসিন্দা রেজাউল ইসলাম বলেন, তরতাজা গাছগুলো কেন কাটা হচ্ছে, তা এলাকাবাসীর বোধগম্য নয়। এগুলো রাস্তায় চলাচলকারী মানুষকে ছায়া দিচ্ছে এবং পরিবেশের জন্যও গুরুত্বপূর্ণ।
তিনি বলেন, গাছগুলোর অনেক মূল্য রয়েছে। কিন্তু সেগুলো নামমাত্র মূল্যে বিক্রি করা হয়েছে বলে মনে হচ্ছে। দুই বছর আগের দরপত্র এত দিন কীভাবে বহাল থাকল এবং সেই দরপত্রের ভিত্তিতে এখন কীভাবে গাছ কাটা হচ্ছে, তা নিয়ে প্রশ্ন রয়েছে।
রেজাউল ইসলামের ভাষ্য, কেউ প্রতিবাদ করার সাহস পাচ্ছেন না। ইতোমধ্যে বিভিন্ন স্থান থেকে গাছ কেটে নেওয়ায় মহাসড়কের অনেক অংশ ফাঁকা হয়ে গেছে। আগের ছায়া-শীতল পরিবেশও আর নেই।
‘সামাজিক বনায়ন প্রকল্পের গাছ’
ঝিনাইদহ জেলা সহকারী বন সংরক্ষক মোছা. জুমুয়া জামান সম্প্রতি এ জেলায় যোগ দিয়েছেন। ফলে গাছগুলোর দরপত্রের বিষয়ে তিনি বিস্তারিত জানাতে পারেননি।
এ বিষয়ে বন বিভাগ কোটচাঁদপুরের ডেপুটি বন রেঞ্জার প্রণব কুমার বিশ্বাস বলেন, গাছগুলো অনেক আগে দরপত্রের মাধ্যমে বিক্রি করা হয়েছে। নানা কারণে মাঝখানে গাছ কাটা সম্ভব হয়নি। এখন সেগুলো কাটা হচ্ছে।
তিনি বলেন, সামাজিক বনায়ন প্রকল্পের আওতায় এসব গাছ লাগানো হয়েছিল। এ ধরনের প্রকল্পের নির্দিষ্ট মেয়াদ থাকে। মেয়াদ শেষে গাছ বিক্রি করার নিয়ম রয়েছে।
প্রকল্পের মেয়াদ কত বছর জানতে চাইলে তিনি বলেন, ১০ বছর থেকে শুরু করে ২৫ থেকে ৩০ বছরও হতে পারে। বর্তমানে যে গাছগুলো কাটা হচ্ছে, সেগুলো ২০ থেকে ২৫ বছর মেয়াদের বলে তাঁদের ধারণা।
তবে স্থানীয়দের প্রশ্ন, গাছ কাটার সিদ্ধান্ত ও কার্যাদেশ পুরোনো হলেও এত দিন পর সেগুলো কাটার ক্ষেত্রে বর্তমান পরিস্থিতি এবং গাছগুলোর পরিবেশগত গুরুত্ব বিবেচনা করা হয়েছে কি না। পুরোনো দরপত্রের ভিত্তিতে এখন গাছ কাটার বৈধতা ও প্রক্রিয়া নিয়েও তাঁরা স্পষ্ট ব্যাখ্যা চান।
সূত্র: প্রথম আলো






