এক প্রাণী থেকে অন্য প্রাণীতে ছড়িয়ে পড়বে টিকা, ছড়িয়ে পড়া টিকার গবেষণা

একটি বন্য প্রাণীকে ধরে টিকা দেওয়া হলো। এরপর সেই প্রাণীই হয়ে উঠল টিকার বাহক, তার শরীর থেকে একই প্রজাতির অন্য প্রাণীর মধ্যে ছড়িয়ে পড়তে শুরু করল রোগ প্রতিরোধের উপাদান। একে একে টিকা পৌঁছে গেল এমন প্রাণীদের শরীরেও, যাদের ধরে টিকা দেওয়া প্রায় অসম্ভব।

বিজ্ঞানীরা এমনই এক সম্ভাবনার কথা ভাবছেন, নিজে থেকে ছড়িয়ে পড়তে সক্ষম টিকা।

২০২৪ সালে সায়েন্স সাময়িকীতে প্রকাশিত এক গবেষণায় গবেষকেরা ট্রান্সমিসিবল ভ্যাকসিন বা এক প্রাণী থেকে অন্য প্রাণীতে ছড়িয়ে পড়তে পারে এমন টিকার সম্ভাবনা বিশ্লেষণ করেছেন।

ধারণাটি হলো, তুলনামূলক নিরাপদ একটি বাহক ভাইরাসের মধ্যে নির্দিষ্ট রোগজীবাণুর খুব ছোট একটি অংশ যুক্ত করা। বাহকটি যখন একটি প্রাণী থেকে একই প্রজাতির অন্য প্রাণীর মধ্যে ছড়াবে, তখন সেটি টিকার মতো কাজ করে আক্রান্ত প্রাণীর রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা তৈরিতে সহায়তা করতে পারে।

ধরতে হবে না প্রতিটি প্রাণীকে

বন্য প্রাণীদের টিকা দেওয়ার সবচেয়ে বড় সমস্যা হলো তাদের ধরে আনা। বাদুড়, ইঁদুর বা খরগোশের মতো প্রাণীর বিশাল কোনো জনসংখ্যার প্রতিটি সদস্যকে খুঁজে বের করে টিকা দেওয়া বাস্তবে অত্যন্ত কঠিন।

নতুন ধারণাটির সম্ভাবনা এখানেই।

ধরা যাক, একটি এলাকার কিছু প্রাণীকে প্রথমে টিকা দেওয়া হলো। এরপর টিকার বাহক সেই প্রাণীগুলো থেকে একই প্রজাতির অন্য প্রাণীর মধ্যে ছড়িয়ে পড়তে পারলে, ধীরে ধীরে আরও বড় একটি অংশের মধ্যে রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা তৈরির সুযোগ তৈরি হতে পারে।

অর্থাৎ, যেখানে প্রতিটি প্রাণীর কাছে পৌঁছানো সম্ভব নয়, সেখানে টিকার বিস্তারকে ব্যবহার করেই রোগ প্রতিরোধের একটি বড় পরিসর তৈরি করার চেষ্টা।

মানুষের রোগের ঝুঁকি কমানোর সম্ভাবনা

বন্য প্রাণী অনেক সংক্রামক রোগের প্রাকৃতিক বাহক বা সংক্রমণের গুরুত্বপূর্ণ অংশ হতে পারে। জলাতঙ্ক, লাসা জ্বর বা ইবোলার মতো রোগের ক্ষেত্রে প্রাণী থেকে মানুষের মধ্যে সংক্রমণের ঝুঁকি কমানোর সম্ভাবনাও এ ধরনের গবেষণাকে গুরুত্বপূর্ণ করে তুলেছে।

তবে এটি এখনো মূলত গবেষণার পর্যায়ের ধারণা। প্রকৃতিতে এমন কোনো টিকার বাহক ব্যবহার করা হলে সেটি কোথায় এবং কতদূর ছড়াবে, এ প্রশ্নের উত্তর অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।

সবচেয়ে বড় প্রশ্ন নিয়ন্ত্রণ

টিকার বাহক যদি প্রত্যাশার চেয়ে বেশি ছড়িয়ে পড়ে? যদি অন্য কোনো প্রজাতিতে পৌঁছে যায়? কিংবা সময়ের সঙ্গে তার বৈশিষ্ট্যে অনাকাঙ্ক্ষিত পরিবর্তন ঘটে?

এসব ঝুঁকি নিয়ন্ত্রণ করা না গেলে উপকারের বদলে তৈরি হতে পারে নতুন পরিবেশগত ও জনস্বাস্থ্যগত সমস্যা। তাই এমন প্রযুক্তির ক্ষেত্রে নিরাপত্তা, নিয়ন্ত্রণ ও পরিবেশগত প্রভাব নিয়ে কঠোর গবেষণা প্রয়োজন।

এখানে মূল লক্ষ্য রোগ ছড়িয়ে দেওয়া নয়। বরং টিকার বাহককে এমনভাবে ব্যবহার করা, যাতে সেটি সীমিত ও নিয়ন্ত্রিতভাবে ছড়িয়ে পড়ে এবং এমন বন্য প্রাণীদেরও রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা তৈরি করতে সাহায্য করে, যাদের প্রত্যেককে ধরে টিকা দেওয়া সম্ভব নয়।

আজকের দিনে এটি অনেকটা বৈজ্ঞানিক কল্পনার মতো শোনালেও ধারণাটি একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন সামনে আনছে, ভবিষ্যতে কি কোনো কোনো ক্ষেত্রে টিকা মানুষের হাতে হাতে নয়, বরং প্রাণীদের নিজেদের চলাচলের পথ ধরেই ছড়িয়ে দেওয়া সম্ভব হবে?

সূত্র: Science News

আরও পড়ুন

প্রকৃতির নীরব পরিচ্ছন্নতাকর্মী: কাকেরা কি চলে গেছে, নাকি হারিয়েছি আমরাই?

একসময় ভোরের শহর মানেই ছিল কাকের ডাক। ছাদের কার্নিশে, বৈদ্যুতিক তারে কিংবা বাড়ির পাশের ডাস্টবিনে দেখা মিলত তাদের। গ্রীষ্মের অলস দুপুরেও জানালার বাইরে থেকে...
জাতীয়
0
minutes

বন্দিদশা থেকে নতুন ঠিকানায় বেলুগা তিমি, তবু থামেনি মৃত্যুর মিছিল

কানাডার মেরিনল্যান্ড সামুদ্রিক পার্কের অগভীর পানিতে হাঁটু গেড়ে বসেছিলেন তত্ত্বাবধায়কেরা। তাঁদের কাছে একে একে এগিয়ে যাচ্ছিল বেলুগা তিমি টোফিনো। তাঁরা আদর করে হাত বুলিয়ে...
বন্যপ্রাণী ও সংরক্ষণ
0
minutes

জুড়ীতে বিদ্যুৎস্পৃষ্ট হয়ে আরও এক বানরের মৃত্যু, বিদ্যুৎ বিভাগের পদক্ষেপ দাবি

খোরশেদ আলম, জুড়ী (মৌলভীবাজার) মৌলভীবাজারের জুড়ী উপজেলায় বিদ্যুৎস্পৃষ্ট হয়ে আরও একটি লজ্জাবতী বানরের মৃত্যু হয়েছে। শুক্রবার (১৬ অক্টোবর) রাতে উপজেলার কচুরগুল গ্রামে আব্দুস সুবহান মিয়ার...
বন্যপ্রাণী ও সংরক্ষণ
0
minutes

ঝড়-বৃষ্টির মধ্যে ট্রেনের সেফটি নেটে আটকে পড়া ঘুঘু পাখিকে উদ্ধার

ঝুম বৃষ্টি, দমকা হাওয়া আর ঝড়ের তাণ্ডবের মধ্যে ছুটছিল ট্রেন। এরই মধ্যে একটি ঘুঘু পাখি পথ হারিয়ে ট্রেনের ইঞ্জিনের লুকিং গ্লাসের সামনের সেফটি নেটের...
বন্যপ্রাণী ও সংরক্ষণ
0
minutes
spot_imgspot_img